চাপের বাজেটে ‘প্রত্যাশার চাপ’

5

পূর্বদেশ ডেস্ক

অর্থনীতি চাকা সচল রাখতে রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়ার আভাস, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, করমুক্ত সীমা কমিয়ে আনার আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণের চাপ সামলে নতুন বাজেটে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাকে কতটা গুরুত্ব দিতে পারবে সরকার, তা নিয় চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে রাজস্ব আদায়েও চাপ বাড়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা ধরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট সাজানো হচ্ছে। এর বড় অংশ ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করার দায়িত্ব বর্তাবে এনবিআরের ওপর। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন অর্থবছরে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে রাজস্ব আদায়ে জোর দিলে তার প্রভাব পড়বে দেশীয় শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থায়।
চাপে থাকা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে উদ্যোক্তা ও শিল্প মালিকরা নতুন বেশ কিছু দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করছেন, যার প্রতিফলন বাজেটে দেখতে চান তারা।
এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন, ব্যবসায়ীদের দাবির চাপে সরকার মধ্যবর্তী কৌশলেও হাঁটতে পারে। তবে তা কেমন হবে, তা জানতে বাজেট ঘোষণার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
আগামি ৬ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন, যা হবে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এরই মধ্যে ধারণা দিয়েছেন, আগামি বাজেট ৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার জন্য রাজস্ব বাড়াতে কর ছাড় সুবিধা যৌক্তিক করার পাশাপাশি একাধিক শর্তে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তি কর আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের মাধ্যমে।
লক্ষ্য পূরণে রাজস্ব বাড়াতে কর ছাড় ও কর অবকাশ সুবিধা উঠিয়ে দেওয়া, কিছু খাতে কর ছাড় যৌক্তিক পর্যায় নামিয়ে আনারও পরিকল্পনা করছে সরকার।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যেসব খাত কর অবকাশ সুবিধা পেয়ে আসছে, সেগুলোকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা দরকার। এনবিআর সেই পথে এগোচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আর তা বাস্তবায়ন হলে কর ছাড় সুবিধা পেয়ে আসা স্থানীয় শিল্প ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে, সেটি খতিয়ে দেখছে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো। সুবিধাগুলো বহাল রাখতে দৌড়ঝাঁপ করছেন ব্যবসায়ীরা।
এর ধারবাহিকতায় কর হার না বাড়ানো ও কর ছাড় সুবিধা বহাল রাখাসহ বেশ কিছু দাবি নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন ব্যবসায়ী নেতাদের একটি পক্ষ। তারা ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। খবর বিডিনিউজের
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ঋণের সুদ হারে ৯ শতাংশের সীমা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন সুদহার কত হবে, তা ব্যাংক ও গ্রাহক ঠিক করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কিন্তু তাতে সুদের খরচ বাড়বে জানিয়ে নিট পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন-বিকেএমইএ এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘অনেক সমস্যা আছে। বর্তমান বাস্তবতায় গ্রাহকের সে অবস্থা নেই যে, ব্যাংকের সাথে বারগেইনিং (দরকষাকষি) করে তারা সুদহার নির্ধারণ করবে। ফলে ব্যাংক থেকে যে হার নির্ধারণ করা হবে, সেটিই মেনে নিতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনি ধারণা দিয়েছেন এটি ১৪ শতাংশের মধ্যেই থাকবে’।

এআইটি বাতিলসহ ৩৮১ প্রস্তাব এফবিসিআই এর :
কৃষিজাত ভোগ্যপণ্য থেকে উৎসে কর না কাটা, রপ্তানি বাজার বড় করতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বাদ দেওয়া, স্থানীয় শিল্পের বিকাশে কর্পোরেট কর কমানো, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত করা, রাজস্ব আদায়ে অটোমেশন চালু, এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাসহ সরকারের কাছে ৩৮১টি প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআই।
বর্তমানে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা তালিকাভুক্তদের বেলায় ২০ শতাংশ।
এফবিসিসিআই এর সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। সে সময় যেসব প্রস্তাব আমরা দিয়েছি, সেগুলো পজিটিভলি দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি’।
ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্পবান্ধব একটি বাজেটের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে মাহবুবুল আলম জানালেন, হার কমিয়ে সব ক্ষেত্রে অটোমেশন চালুর বিষয়ে বাজেটে দিক নির্দেশনা চেয়েছেন তারা। বিষয়টি তারা প্রধানমন্ত্রীকেও বলেছেন।
এর আগেও তিনি বলেছিলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যেন না বাড়ে, সেদিকে জোর দিতে হবে। কারণ, সুদের হার বাড়লে দেশে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

উৎসে কর আগের মত চায় পোশাক খাতের সংগঠনগুলো :
কর অবকাশ সুবিধা সবচেয়ে বেশি পেয়ে আসছে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত, যারা রপ্তানি আয়ে ৮৩ শতাংশ অবদান রাখে। এ খাতে গত অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক খাতে এক সময়ে উৎসে কর ছিল দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা এক শতাংশ করা হয়। বিজিএমইএ এর দাবি, নতুন বাজেটে আগের মত উৎসে কর দশমিক ৫০ শতাংশ করা হোক।
কর অবকাশ তুলে নেওয়াসহ কর্পোরেট কর বাড়লে তৈরি পোশাক খাতে কেমন প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এ খাতে আসলে বর্তমানে কন্টিনিউয়াসলি নেগেটিভ ব্যবস্থা আসছে। বিদ্যুতের দাম বাড়া, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া সবই আছে। এর মধ্যে যারা কর অবকাশ পায়, সেটি যদি তুলে নেওয়া হয়, তাহলে তো এ খাত মুখ থুবড়ে পড়বে’।
বাজেট প্রস্তাব নিয়ে বিজিএমইএ এর সভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, ‘পোশাক খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতাগুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে। কাস্টমস, বন্ড, ও শুল্কায়ন বিশেষ করে এইচএস কোড ও ওভেন কাপড়ের ওজন সংক্রান্ত জটিলতা নিরসণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’।

বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিজিএমইএ দাবির মধ্যে রয়েছে :
নগদ সহায়তার ওপরে আয়কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামানো, কাঁচামালের ওপর ভ্যাট তুলে নেওয়া, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত অগ্নি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানিতে কর ছাড়, এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটার ওপর আয়কর ২০ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশ করা।
এসব দাবির পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মান্নান কচি বলেন, ‘২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রচলিত সব প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ২০২৯ সালের পর বিকল্প ও সময়োপযোগী নীতি সহায়তা প্রবর্তনের দাবি আমরা আগে থেকেই জানিয়ে আসছি। বিশেষ করে নতুন বাজার, নতুন পণ্য ও নন-কটন টেক্সটাইলে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ নীতি সহায়তা দেওয়ার দাবি করেছি। কারণ, আগামিতে এসব নতুন খাত থেকেই আমাদের প্রবৃদ্ধি আসবে’।
বর্তমানে অর্থনীতিতে ১০ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতির যে চাপ রয়েছে, তা থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ফুড রেশনিং চালু করতে সরকারকে অনুরোধ করেছেন বলে জানান এ ব্যবসায়ী সমিতির নেতা।

আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ চায় রিহ্যাব :
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল অ্যাস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ রিহ্যাব কোনো প্রশ্ন ছাড়াই অপ্রদর্শিত আয় আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ চায়। এ সুযোগ রাখার পাশাপাশি নতুন বাজেটে আরও কিছু সুবিধা চাওয়ার কথা জানিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান।

রিহ্যাবের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে :
ফ্ল্যাট ও প্লট রেজিস্ট্রেশন ও সংশ্লিষ্ট ফি কমানো এবং ১২ শতাংশ থেকে কর কমিয়ে তা ৭ শতাংশ নামিয়ে আনা, দ্বিতীয়বার ফ্ল্যাট-প্লট কেনাবেচার ক্ষেত্রে কর হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা, জমির মালিকের জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৪ শতাংশ করা, রাজউক ও সিডিএ এর আওতাধীন ও বহিভর্‚ত এলাকায় জমির ক্ষেত্রে আরোপ করা ৪ শতাংশ ও ৩ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা, আবাসন খাতে মেট্রোপলিটন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে পাঁচ বছর এবং পৌরসভার বাইরে ১০ বছরের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ চালু করা।

বারভিডার যেসব প্রস্তাব :
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন ‘স্মার্ট শুল্ক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সময় এসেছে, একটা স্মার্ট শুল্ক নীতিমালা করার। সেটার আলোকে বাজেটের একটা ধারাবাহিকতা থাকা উচিত। এতে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই স্বস্তির মধ্যে থাকবে’।

বারভিডা বাজেটে যেসব বিষয় দেখতে চায়, তার মধ্যে রয়েছে :
হাইব্রিড গাড়ির সিসি স্ল্যাব ও সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্বিন্যাস করা, দুই হাজার সিসির হাইব্রিড কার ও মাইক্রোবাসের আমদানি শুল্ক কমানো। বর্তমানে এসব গাড়ির সাপ্লিমেন্টারি শুল্ক আছে ২০ শতাংশ, যা শূন্যের কোটায় আনা, হাইব্রিড কার ও জিপ (১৮০১ সিসি থেকে ৪০০০ সিসি পর্যন্ত) আমদানিতে শুল্ক কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলচালিত গাড়ির সিসি স্ল্যাব ও সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্বিন্যাস, বৈদ্যুতিক গাড়ির সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার। বর্তমানে এটি ২০ শতাংশ, গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত ১০-১৫ আসন বিশিষ্ট মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার। বর্তমানে এ শুল্কের হারও ২০ শতাংশ, পরিবেশ সারচার্জ বা কার্বন করের বিষয়ে বক্তব্য স্পষ্ট করা।