৭ ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল সড়ক

12

মনিরুল ইসলাম মুন্না

নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেট থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত রাজপথ কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের দখলে ছিল প্রায় ৭ ঘণ্টা। এতে ওই সড়কে বন্ধ ছিল যান চলাচল। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবীসহ সকল স্তরের মানুষ। আর সড়কের এসব অংশ বন্ধ থাকায় প্রভাব পড়ে আশেপাশের পুরো এলাকায়। কারণ প্রত্যেক যানবাহনকে বিকল্প পথ ধরে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। গতকাল বুধবার নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সড়কের এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, রেলপথ অবরোধের পর টাইগারপাস মোড় ‘ব্লকড’ করেছে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। এতে প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে নিউমার্কেট, দেওয়ানহাট মোড়, আমবাগান, পাহাড়তলীর পথে যানচলাচল বন্ধ ছিল। একইসাথে ষোলশহর রেলস্টেশন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, অক্সিজেন এলাকায় ছিল যানজট। মূল সড়ক দিয়ে যান চলাচল করতে না পারায় চালকরা বিকল্প পথে যেতে গিয়ে জটলা তৈরি করে ফেলেন। তাছাড়া নিউমার্কেট থেকে ছেড়ে আসা যানবাহন সিআরবি-রেডিসন ব্লু হয়ে লালখান বাজার গিয়ে ঘুরে জিইসি অভিমুখে গেছে।
এদিকে ষোলোশহর দুই নম্বর গেট থেকে আন্দোলন শুরু করে টাইগারপাস পর্যন্ত মিছিল সহকারে যায় শিক্ষার্থীরা। তখন তাদের মুখে স্লোগান ছিলো ‘সারা বাংলা খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘মেধা না কোটা? মেধা-মেধা’, ‘মেধাবীদের কান্না, আর না, আর না,‘কোটার বিরুদ্ধে-লড়াই হবে একসাথে’সহ প্রভৃতি।
আবার পাহাড়তলীর পথ থেকে আসা যানবাহন সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনের পথ ধরে বের হয় লালখান বাজারে। এদিকে টাইগারপাসের পথে আটকা পড়ে শত শত গাড়ি। এসব যানবাহনের যাত্রীরা বেশিরভাগ হেঁটে গন্তব্যে যান। নগরের প্রবেশমুখ সিটি গেট, দুই নম্বর গেট, একে খান, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, অলংকার পর্যন্ত যানবাহনের সংখ্যা বেশ কিছুটা কম দেখা গেছে। সিএনজি ট্যাক্সি ও ব্যক্তিগত পরিবহনের সংখ্যাও ছিল কম।
তবে যান চলাচল কম থাকায় কর্মজীবী মানুষের দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া গুণতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মূল সড়কে অবরোধের কারণে চালকরা অন্য পথ দিয়ে ঘুরে নিয়ে যাচ্ছে বলে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। একটা অজুহাত পেলেই চালকরা সকলে এক জোট হয়ে যায়। ছোট সিএনজি ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারের চালকরাও অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। এটা মগের মুল্লুক নাকি?
আজাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ যাবো। সিএনজি ট্যাক্সি বলছে ৩০০ টাকা লাগবে, এ কেমন কথা ভাই? ৮০/১০০ টাকার ভাড়া, ১৫০ টাকা চাইতে পারে, কিন্তু এভাবে গলাকাটা ভাড়া আদায় করবে ভাবতে পারছি না।’
বিকেলে টাইগারপাস মোড়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের অবস্থানের কারণে গাড়ি ঘুরিয়ে সিআরবি হয়ে আসতে থাকে। সেখানে ব্যাপক যানজট হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সেগুলো চলাচল শুরু করে।
আন্দোলনে অংশ নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু শরীফ বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিলো সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সরকারি চাকরিতে কোটার ফলে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেধা থাকার পরও যোগ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মূলত আমরা বৈষম্যমূলক কোটা প্রত্যাহার করার জন্য এই আন্দোলন করে যাচ্ছি, আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে।’
পাঁচলাইশ এলাকার ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) মো. মাসুদুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘দুপুর ১২টা থেকে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। তখন থেকে সাতটা পর্যন্ত আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবি হয়। এখন (রাত ৮টা) রাস্তা পুরোটায় স্বাভাবিক। বর্তমানে কোনো যানজট নেই।
পূর্বদেশের চবি প্রতিনিধি জানান, নগরীর দেওয়ানহাটে রেলপথ এবং টাইগারপাসে সড়কপথ অবরোধ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রামের সাথে সারাদেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজের পাশাপাশি চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। এ সময় চট্টগ্রামের সাথে প্রায় ৮ ঘণ্টা বন্ধ ছিল সারাদেশের রেল যোগাযোগ।
গতকাল দেওয়ানহাটে শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে রাখে। শিক্ষার্থীদের এ অবরোধের ফলে চট্টগ্রামের সাথে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর দুপুর ১ টায় শিক্ষার্থীরা ২ ভাগ হয়ে একটি অংশ দেওয়ানহাটে রেলপথ ও সড়কপথ অবরোধ করে রাখে ও অপর একটি অংশ নগরীর টাইগারপাস এসে সড়ক অবরোধ করে। এদিন সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সড়কপথ অবরোধ করে রাখার ফলে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
প্রসঙ্গত, কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে গত পাঁচদিন ধরে টানা আন্দোলন করে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে দুদিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলন করলেও নগরে এর প্রভাব ছিল না। কিন্তু শুক্রবার থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আন্দোলন করেছে নগরীর দুই নম্বর গেইট ও ষোলশহর এলাকায়। এ আন্দোলনে তারা চার দফা দাবি জানিয়ে আসছে।
দাবিগুলো হলো- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখতে হবে, ২০১৮ এর পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সব গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে; সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।