নিজস্ব প্রতিবেদক
রাউজানে টার্গেট কিলিংয়ে জড়িত ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপকে শনাক্ত করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। এ অভিযানের অংশ হিসেবে বিএনপি সমর্থক ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম হত্যা মামলার ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাউজান থানা থেকে লুট হওয়া একটি চায়নিজ রাইফেলসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গত এক সপ্তাহের ধারাবাহিক অভিযানে আবদুল হাকিম হত্যা মামলার ছয় আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুজনের স্বীকারোক্তি ও দেখানো স্থানের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার দুপুরে রাউজান থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি বিদেশি পিস্তল, একটি রিভলবার, ৪২ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, একটি চায়নিজ রাইফেল ও ৪৯ রাউন্ড চায়নিজ রাইফেলের গুলি, একটি শটগান ও ১৭ রাউন্ড শটগানের কার্তুজ, ১৬ রাউন্ড ৭.৬৫ বোরের গুলি, সাতটি খালি ম্যাগাজিন, একটি রকেট ফ্লেয়ার ও দুটি রামদা। এ ছাড়া ৫০টি ইয়াবা, ২৫০ গ্রাম গাঁজা এবং ৯৬ হাজার টাকা জব্দ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ছয়জন হলেন আবদুল্লাহ খোকন, মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান, মুহাম্মদ মারুফ, মুহাম্মদ সাকলাইন, মো. সাকিব ও মো. শাহেদ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, সাকিব ও শাহেদের তথ্যের ভিত্তিতে রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরীহাট বাজারসংলগ্ন আইয়ুব আলী সওদাগরের বাড়ির পেছনের একটি পুকুর সেচে চায়নিজ রাইফেল, শটগান ও সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, সাকিব ও শাহেদ স্বীকার করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাউজান থানা থেকে লুট হওয়া চায়নিজ রাইফেল ও চায়নিজ রাইফেলের ৭ রাউন্ড গুলি তারা সেখানে লুকিয়ে রাখে। শটগানটিও থানা থেকে লুট হওয়া- এমন ধারণা আমাদের রয়েছে, তবে বিষয়টি আরও যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৭ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাউজান সীমান্তবর্তী হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে প্রাইভেট কার থামিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় মো. আব্দুল হাকিমকে (৬০)। তিনি রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের পাঁচখাইন গ্রামের বাসিন্দা এবং নিজ এলাকায় ‘হামিম এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার পরিচালনা করতেন।
নিহত হাকিম রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, আব্দুল হাকিম সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তিনি দলের সমর্থক ছিলেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু গতকাল সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এই হত্যাকাÐের ঘটনায় ১৫ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নেয়, একজন মোটরসাইকেলে করে গাড়ি অনুসরণ করে এবং কয়েকজন মদুনাঘাট সেতুর অন্যপ্রান্তে থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে। তিনি আরো জানান, আব্দুল হাকিম হত্যা মামলার আসামি আব্দুল্লাহ খোকন ওরফে ল্যাংড়া খোকনকে গত ৩১ অক্টোবর রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের গরীব উল্লাহ পাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতে জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২ নভেম্বর নোয়াপাড়া এলাকা থেকে মারুফকে গ্রেপ্তার করা হয়। মারুফ জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাÐে ব্যবহৃত অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য দেয় এবং জানায়, অস্ত্রগুলো সাকলায়েনের কাছে আছে। পরে সাকলায়েনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে গত রবিবার রাতে নোয়াপাড়া চৌধুরীহাট এলাকায় আইয়ুব আলী সওদাগরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে চারটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর আরও অনুসন্ধানে ওই বাড়ির পেছনের পুকুর সেচে পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া চায়নিজ রাইফেল ও শটগান উদ্ধার হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, যে চারটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো ব্যবসায়ী হাকিম হত্যাকান্ডের সময় সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করেছিল। তবে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর কোনোটি ওই হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজান উপজেলায় একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মাসে রাউজানে অন্তত ১৭ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জন খুন হয়েছেন বিএনপির দুই গ্রুপের অন্তর্দ্বন্দ্বে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু জানান, রাউজানে ছয়টি গ্রুপ ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম হত্যায় এর মধ্যে একটি গ্রুপ সরাসরি জড়িত ছিল। তিনি বলেন, রাউজানে যেসব হত্যাকান্ড হয়েছে, তার মধ্যে সাতটি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে; অন্যগুলো পারিবারিক, পরকীয়া ও মাদক-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।










