২৩ জানুয়ারি বাজবে মহামিলনের সুর

1

নিজস্ব প্রতিবেদক

মেলায় ভুভুজেলার তীব্র আওয়াজ, প্রসাধনী কিংবা ব্যবহার সামগ্রী কেনার ধুম, মন্দিরে নানা ঢঙের কাঁসরের আওয়াজ, ঢাক আর সাঁনাই তো থাকে, ঋষি-সন্নাসীদের ফুঁ দেয়া শিঙ্গার সুর। মেলা আর মন্দির লোকে লোকারণ্য। প্রতি তিন বছর অন্তরে বাঁশখালীর কোকদন্ডী গ্রামের ঋষিধামে বসে এমন প্রাণের মেলা। ঋষিধামে আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ মেলা। অশুভ শক্তির বিনাশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে সনাতনী সম্প্রদায়ের এই ঋষিকুম্ভ ঘিরে আনন্দের শেষ থাকে না।
এবারও আগামী বছর ২৩ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঋষিধামে অনুষ্ঠিত হবে ২২তম ঋষিকুম্ভ মেলা। এই মেলা ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ঋষিকুম্ভ মেলায় পৌরহিত্য করবেন ঋষিধামের পঞ্চম মোহন্ত মহারজ শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ।
জানা যায়, ১৯৪৮ সালে ঋষিধাম আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ধর্মীয় সাধক ও মনিষী শ্রী শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ। বাঁশখালী বাণীগ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধক সনাতন ধর্মের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ ও ভারতে এই ঋষির বেশ কয়েকটি মন্দির আছে। বাঁশখালীর জঙ্গল কোকদন্ডী গ্রামে ঋষিধাম আশ্রমটি প্রায় ৪০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রায় ৯ বছর পর ঋষিধামে ঋষিকুম্ভ মেলার প্রবর্তন করেন। এই মেলা প্রবর্তনের পেছনে বিশেষ কারণও ছিল। এটি সনাতনীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রাচীণ তীর্থস্থান।
ঋষিধামে ঋষিকুম্ভ প্রবর্তন সম্পর্কে জানা যায়, ভারতের প্রয়াগরাজ, উজ্জয়িনী, নাসিক ও হরিদ্বারে পৃথক সময়ে বিশে^র সবচেয়ে বড় ঋষিকুম্ভ মেলা হয়। যেখানে সারা বিশে^র প্রচুর ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম হয়। বাংলাদেশ থেকেও অনেক ধর্মপ্রাণ নর-নারী এই চারটি স্থানে সমবেত হয়। কিন্তু সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ছিল দুস্থ ও দরিদ্রগ্রস্ত। যারা ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও ভারতে গিয়ে কুম্ভমেলায় অংশ নিতে পারতো না। সে দিকটি বিবেচনায় নিয়ে শ্রী শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ ১৯৫৭ সালে বাঁশখালী ঋষিধামে ঋষিকুম্ভ মেলা শুরু করেন। সে থেকে প্রতি তিন বছর পরপর এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
এই মেলায় বিশ্বের নামিদামি মঠ-মন্দিরের বড়বড় ঋষি সন্ন্যাসিরা উপস্থিত থাকেন। ১১ দিনব্যাপী আয়োজনে লাখো ভক্ত জনতা, মুনি, গুণী, ধ্যানী-যোগী, জ্ঞানী, সাধু-সন্ত, ঋষিদের সমাবেশ এবং মিলন মেলা ঘটে। বেজে ওঠে মহামিলনের সুর। যেখানে দূরত্ব ঘুচিয়ে নৈকট্য, সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা ঘুচিয়ে অদ্বৈত বা বিরাটত্ব, সীমাহীনতা, সম্প্রসারিতা তথা অসীমের বৃহৎ মহৎ সৎ উদারতা প্রসারতার স্রোতধারায় অবগাহন করে কায়িক, মানসিক, আত্মিক মুক্তির দ্বার উন্মোচন করেন। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে মেলার সূচনা হয়। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে কুম্ভমেলায়। আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন দেশের খ্যাতনামা রাজনৈতিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা।
সরেজমিন ঋষিধামে গিয়ে দেখা যায়, মেলার বাকি মাত্র কয়েক মাস। গাছগাছালি ও সবুজে ভরা ঋষিধামের মাঠ। আশ্রমের চারপাশে আগাছা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। আশ্রম প্রাঙ্গন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় প্রতিদিন সেখানে কাজ করছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। সুন্দর বিকালে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া সূর্যের আলো গেরুয়া রঙের মূল মন্দিরের চূড়ায় পড়তেই জ¦লজ¦ল করছিল। দারুন স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত মন্দিরটি দেখতে নান্দনিক লাগছিল। মন্দিরে যেন সাজসাজ রব। মন্দিরের সন্নাসী, পূজার্থী, ভক্ত সবার মধ্যেই আনন্দ ও উৎসাহ। প্রতিদিনই উপজেলাসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে কুম্ভমেলার সফলতায় সমবেত হচ্ছেন আয়োজকরা। কুম্ভমেলার শুরুর আগেই পুরো আশ্রম প্রাঙ্গণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, স্টাচুগুলো রঙ করা, দুটি পুকুর পরিষ্কার করা সবকাজ দ্রæত শেষ করতে চায় আয়োজকরা। এবারের আয়োজনেও মূল ভূমিকায় থাকছেন শ্রীগুরু সংঘ ও ঋষি অদ্বৈতানন্দ পরিষদ।
শ্রীগুরু সংঘের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকে কাঞ্চন বিশ্বাস বলেন, ‘২২তম ঋষিকুম্ভ মেলাকে বিশ্বময় করতে কাজ শুরু করেছি। প্রতিদিনই ভক্তপ্রাণ মানুষের সাথে বসছি। ঋষিকুম্ভের বার্তা পৌঁছে দিতে ছুটে যাচ্ছি বিভিন্ন মঠ ও মন্দিরে। প্রতিবারের মতো এবারো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যদিয়ে ঋষিকুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ঋষিকুম্ভ মেলা নিয়ে সনাতনী সমাজের মাঝে উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।’

কীভাবে যাবেন ঋষিধাম : চট্টগ্রাম বাস টার্মিনাল অথবা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু এলাকা থেকে যাত্রীবাহী বাস ছাড়ে। এসব বাসে চড়ে গুনাগরী কিংবা রামদাস হাট নেমে অল্প দূরুত্বে ঋষিধামের অবস্থান। বাঁশখালীর আঞ্চলিক মহাসড়কটি কিছুটা সরু হওয়ায় কুম্ভমেলাকালে সড়কে যানজট থাকে। যানজট না থাকলে এক থেকে দেড় ঘণ্টায় ঋষিধামে পৌঁছা সম্ভব।