হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি পণ্য

2

মো. শাহাদাত হোসেন, চন্দনাইশ

হাজার বছর গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে তারা তৈরি করছেন ঝুড়ি, ডালা, পলো, কুলা, ডুলা, চালুনি, ওড়া, চাঙ্গারি, খলুই ও হাতপাখাসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র। প্লাস্টিক সামগ্রীর ভিড়ে অনেকেই উদ্ভাবিত বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের পেশা পাল্টে ঝুঁকে পড়ছেন অন্য পেশায়। তবে, এখনো গ্রামীণ এসব ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র হাটে-বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেকে। প্রায় প্রতিটি হাট-বাজারে বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের বিক্রি কমে গেলেও এখনো পেশাদার বিক্রেতারা গ্রামাঞ্চল থেকে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র কিনে বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করে তৃপ্তি অনুভব করেন।
তাদের মধ্যে দোহাজারী দেওয়ানহাট এলাকার গোলাম নবীর ছেলে নাজিম উদ্দীন (২৫)। ছোট বয়সে পিতার সাথে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার জীবনে হাল ধরেছিলেন নাজিম। তিনি বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের নানা আদ্যোপান্ত জানাতে গিয়ে বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে এ সকল সামগ্রী সংগ্রহ করে দোহাজারী সদরে বিক্রি করছি ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে। এই ব্যবসা করে আমার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার পাশাপাশি সংসার চালাচ্ছি। তবে বর্তমানে প্লাস্টিকের সামগ্রী বাজারে আসায় বাঁশের তৈরি অনেক পণ্য তৈরি করা হচ্ছে না। বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্র বিক্রি করা ছিল আমার বাপ-দাদার পেশা। কোনো ভারী কাজ করতে না পারায় এই পেশাটি এখনো আঁকড়ে ধরে আছি। টিকে থাকার চেষ্টা করছি। বাঁশের তৈরি পলো, কুলা, ডুলা, চালুনি, ওড়া ও চাঙ্গারিসহ নানা ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছি। তাঁর মতে, বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্র গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য।
দোহাজারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, দোহাজারী সদরে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব সামগ্রী বিক্রি করেন নাজিমসহ কয়েকজন। এখনো বাঁশের তৈরি মাছ ধরার পলো ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, কুলা ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা, ডুলা ১’শ টাকা থেকে দেড়’শ টাকা, ধান চালনি ২’শ থেকে ৩’শ টাকা, চাল চালনি ৩’শ থেকে ৪’শ টাকা, ওড়া ১’শ থেকে দেড়’শ টাকা, চাঙ্গারি ২’শ থেকে ৩’শ টাকা, হারাং ২’শ থেকে আড়াইশ, লায় ৪’শ থেকে ৫’শ টাকা, উইজ্জা ১১০ থেকে ১২০ টাকা, পেরগা ৩৫০ থেকে ৪৫০, বাইর ১০০ থেকে ১৫০, গরুর কোপা জোড়া ১’শ টাকা, মাছ ধরার ছাঁই ৮’শ থেকে ১ হাজার, ছাঁইয়ের পতর জোড়া ১’শ টাকায় বিক্রি করছেন। তিনি বিভিন্ন হাট বাজার ও গ্রাম থেকে এসব জিনিসপত্র সংগ্রহ করে দোহাজারী সদরে বিক্রি করছেন। বাজারবারে নাজিমের ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা, অন্যান্য দিন দৈনিক দেড় থেকে ২ হাজার টাকার সামগ্রী বিক্রি হয়। বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে চলে নাজিমের সংসার।
দোহাজারীর বাসিন্দা হাজী শহিদ উদ্দীন বলেন, এক সময় সাংসারিক কাজকর্মে গ্রাম-বাংলার তৈরি ঐতিহ্যবাহী এসব জিনিসপত্রের চাহিদা ছিল প্রচুর। তখন চন্দনাইশের বিভিন্ন হাট-বাজারে অসংখ্য বিক্রেতা এসব জিনিসপত্র নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসতেন। গ্রাম-বাংলার ঐত্যিবাহী এসব জিনিসপত্র আধুনিক যুগের প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের কাছে হার মানছে। কারণ প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্রের দাম কিছুটা কম হওয়ায় দিন দিন এগুলোর কদর কমছে এবং বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এক সময়ে হাট-বাজারে এসব জিনিসপত্র নিয়ে গেলে অবিক্রীত থাকত না। এখন হাট শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এসব জিনিসপত্র আগের মতো আর বিক্রি হয় না। তাই আবারও বিক্রি না হওয়া জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে যেতে হয় বিক্রেতাকে।