
মিঞা মুহাম্মদ জামশেদ উদ্দীন
সাম্প্রতিক একটি গান বেশ জোর গতিতে দাপিয়ে বেড়ালো বেশকয়েক মাস ধরে। গান বলতে যা বুঝাই, সেইরকম মনে হয়নি। তবুও কিছু উথাল হাওয়া এবং অস্থির সময় স্মরণে থাকে। ‘কে দিলো পিরিতের বেড়া, লিচুরও বাগানে/কে দিল পিরিতের বেড়া, লিচুরও বাগানে- আরে কমলার বাগানে সইগো, কমলার বাগানে- কমলার বাগানে। কে দিল পিরিতের বেড়া, লিচুরও বাগানে?/ কেমন প্রেমিক তুই বন্ধুরে, বেড়া দেখ্যা কাপিস ভয়ে, কেমন প্রেমিক তুই বন্ধুরে…পারলে বেড়া ডিঙায় আসো, পারলে বেড়া ডিঙায়- পারলে বেড়া ডিঙায় আসো, জাগা দিবো এ অন্তরে…’
গানটি লিখেছেন নেত্রকোণা জেলার মারহাট্টার বাসিন্দা সত্তার তালুকদার। তিনি নাকি একজন ভবঘুরে পাগল। যাক, এ ভবঘুরে পাগলের গান সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত হয় ‘তান্ডব’ সিনেমা। এটি হিট করে। এ সময়ের হার্টবিট নায়ক সাকিব খানও নায়েকিয়াকে নিয়ে নেচে নেচে বেশ হয়রান হন। সিনেমাটির টাইটেল সনের এ গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয়। এর ভিউ হয় নাকি আড়াই থেকে তিন লক্ষ বিলিয়ন। অথচ গীতিকার সত্তার তালুকদার একজন ভবঘুরে- পাগল। প্রশ্ন হলো সত্তার তালুকদার একজন ভবঘুরে পাগল হলে এ গান লিখলেন কি করে? একজন পাগল কর্তৃক এমন মনমাতানো গান লেখা আদৌও কি সম্ভব? নাকি তার ন্যায্য পাওনা-রয়েলিটি না দেয়ার এসব ফন্দিফিকির ছড়িয়েছে। আজকাল কিছু ধান্দাবাজ এসব প্রভাকান্ড রটিয়ে নীরবে স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে; হয়তো অনুসন্ধান করে দেখলে সত্তার তালুকদার এমন বৈরী আচরণের শিকার। অনুরূপ আচরণে শিকার হন মির্স ইউনিভার্স, মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগি মিথিলা। তাকে নিয়ে নেট দুনিয়ার নেটিজেনরা বেশ মাতামাতি করে। তাকে নিয়ে আমিও খানিকটা মাতামাতি করতে চাই; তবে আমার মাতামাতির স্বরূপ অন্যকিছু নিয়ে নয়, শুধু তার নাম নিয়ে; তার নেকনাম মিথিলা। পুরো নাম রাফিয়াত রশিদ মিথিলা। পেশা শিক্ষকতা। পাশাপাশি অভিনয়, সঙ্গীত শিল্পী ও ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিয়োজিত। বাংলাদেশের এ প্রতিযোগিতার বিকিনি নিয়ে এমন টল। মুসলিম দেশ হিসেবে অনেকে মনে করেন, এ পোশাক যায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব প্রতিযোগিতার পরিবেশ ও পরিস্থিতি অন্য রকম, এটি মেনে নিতেই হবে নয়তো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে নারীর সৌন্দর্য, স্মার্টন্যার্স, গঠনপাঠন ও অঙ্গভঙ্গি মূল আকর্ষণ। অবশ্য এর মধ্যে আরো কিছু যোগ হয়েছে মানদন্ডে। সৃজনশীল, মনন ও বুদ্ধিমত্তা।
মিথিলা অস্থির এ অবস্থায়ও বাংলাদেশের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। আমার সঙ্গে তার বিষয়ে বলো- আমার একটি উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বা নায়িকা, যার নাম মিথিলা। পুরো নাম সামানতু মিথিলা। ২০১৯ শে করোনাকালিন যেটি লেখা হয়। উপন্যাসের নামকরণ হয়- অনুঘটক। এটি করোনাকালিন প্রেক্ষাপট বা ওই আঙ্গিকে লেখা। যা থ্রি জিরো তত্ত¡। এটি কার্বন নিঃসৃত হওয়া ঘটনা এবং ভূমন্ডলে ছড়িয়ে পড়া। একসময়ে এসে এটি মহামারিরূপে রূপ নেয়। কার্বন মানব দেহে ক্ষতিকারক বস্তু এবং এটি ফুসফুসকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এ অবস্থায় যেকোনো মুহূর্তে থেমে যেতে পারে প্রাণের স্পন্দন। এর সাথে আরো যেসব ট্রাজেডি আছে উপন্যাসে। মিথিলার অপহরণ ঘটনা ও রাজকাহিনী। এটি ভিন্নমাত্রা ও ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করে। এটি করোনাকালিন নেট দুনিয়ায় উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এরপরও দুবার গ্রন্থিক করার উদ্যোগ নেয়া হয়। চট্টগ্রামের দুটি প্রকাশনা সংস্থ এগিয়ে আসে। নন্দন প্রকাশনা ও খড়িমাটি, ২০২৩ ও ২০২১ সালের দিকে। কেন যেন আর হয়ে ওঠেনি। এরকম না হওয়ার অনেক কাহিনী আছে। মিথিলার এ মাতামাতি লক্ষ্যণিয় ছিল চলতি মাসের ১৬ নভেম্বর থেকে। নেট দুনিয়ায় তাকে নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। আবাল বৃদ্ধ বণিতা, সবার দৃষ্টি ছিল সেদিকে। সেও আহবান জানান দেশবাসীকে তাকে ভোট দেয়ার জন্য। এভাবে সরগরম ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর একদিন পরে অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর ২০২৫ইং ছিল আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়। দিনটি ইতিহাসের এক মাহিন্দ্রক্ষণও বলা যেতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে এ গুরুতর অভিযোগে রায় ঘোষিত হবে। এমনটি আশায় উৎসুক ছিল পক্ষের বিপক্ষের জনগণও। আর ওই রায় দেয়ার দিনকে সামনে রেখেই ঘটে গেল অনেকগুলো অঘটন, যা কিনা কখনো জাতির কাছে প্রত্যাশিত ছিল না; কেন জাতির সাথে এ লোকচুরি খেলা খেলতে হবে; খোদ বিবাদীর প্রাজ্ঞ কৌশলীর হাসি-ঠাট্টায় ভিন্ন মর্মার্থ প্রকাশ পায়। অবশ্য তিনি বুঝাতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। সচরাচর যা দেখা যায়, রায়ের আদেশ বিপক্ষে গেলে সংশ্লিষ্ট কৌশলী বিমর্ষ মর্মাহত এবং লজ্জিত হন। হয়তো তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বা তাঁর মক্কেলকে আইনের সুপ্রতিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে এধরণের মনোভাব যথাযথ হয়নি। মক্কেল, মক্কেলের সমর্থক ও স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণ হত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ফাঁসির রায় হয় এবং সাবেক পুলিশের আইজিপি রাজসাক্ষী হওয়ায় লঘুদন্ড হয় ৫ বছর জেল হয়। গত এক বছরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা ১০টি। আর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যালের তদন্ত সংস্থায় জুলাই গণ- অভ্যুত্থানে অন্তত ৩৭টি মামলা তদন্ত রয়েছে।
জাতিকে ঘুমে রেখে দেশের সমুদ্র বন্দর বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় নির্বাক। এবং বলা হচ্ছে অপারেটর নিয়োগ কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের অনুমতি দেয়া হচ্ছে শুধু মাত্র। ডেনমার্কের কনসেশন কোম্পানির সাথে ৩৩ বছরের চুক্তি হয়। চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের এপিএম টার্মিনাল কোম্পানি এ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করবে। নারায়ণগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত পানগাঁও সমুদ্র বন্দরটিও বিদেশীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সাথে চুক্তি হয়। এটি ২৫ বছরের জন্য হস্তগত করে। এভাবে একের পর এক দেশের সব বন্দর বিদেশীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল আগামী ডিসেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া চলছে। আর প্রক্রিয়া অংশ হিসেবে গত ১৬ নভেম্বর প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের জন্য ৭ সদস্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এই কমিটি অনুমোদনের জন্য চিঠি দেন বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক। প্রস্তাবিত কমিটির আহব্বায়ক করা হয়েছে বন্দর পর্ষদে সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব।
২০০৭ সালে বন্দরের বৃহৎ এ টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এ পর্যন্ত এ টার্মিনালের যন্ত্রপাতি সংযোগ হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের, ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। বর্তমানে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রইডক লিমিটেড। এ বন্দরকে ঘিরে দেশের বেশ কয়েকটি কন্টেইনার টার্মিনাল ও ডিপো গড়ে ওঠে। তাদের অধিকাংশ সীতাকুÐসহ বন্দরের আশেপাশে লাগোয়ায় অবস্থিত। এসব কন্টেইনার ডিপোতে কয়েক হাজার লোক কর্মরত রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি অপারেটর ও বিদেশি কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ হলো এসব ছোট ছোট কন্টেইনার ডিপো বন্ধ হয়ে যাওয়ার শতভাগ আশংকা রয়েছে। সঙ্গে দুই হাজারো অধিক সিএনএফ ফার্ম রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। ওই সকল সিএনএফ ফার্মের উপরও সরাসরি প্রভাব পড়বে। যার ফলে অধিকাংশ সিএনএফ ফার্মগুলো লসের বোঝা দিনদিন ভারি হবে এবং মুখথুবড়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ করে দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে।
এদিকে বন্দর রক্ষা কমিটি তাদের প্রতিবাদ সভা অব্যহত রেখেছে। তারা ২২ নভেম্বর শ্রমিক কনভেনশন আহবান করেছে। সম্মিলিত ও সর্বদলীয় শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে এ প্রতিবাদ চলছে। শ্রমিক নেতা তপন দত্ত, সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ, হুমায়ুন কবির চৌধুরী, মো. আজিজ, গাজী আইয়ূব, আবু বকর সিদ্দিকী, শেখ সানুয়ার মিয়া, মো. নাছির উদ্দীন, মোশাররফ হোসেন, দিদারুল আলম, আনোয়ার হোসেন, আকতার হোসেন, মোস্তফা চৌধুরী, গোলাম সরওয়ার, মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন।
রাজনৈতিক দলের নেতা ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলেন, বন্দর আগে চেয়ে ২১ ভাগ বেশি আয় হচ্ছে। এরপরও কেন বন্দর বিদেশি কোম্পানি হাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে! অথচ দেখাযায়, এনসিটি টার্মিনাল থেকে বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনার বন্দর ১৬৫ ডলার আয় করে। যার মধ্যে অপারেটর খরচ ও অন্যান্য ব্যয় বাদে আয় থাকে প্রায় ১১৫ ডলার। যদি ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল পরিচালনা করে, এ কোম্পানি বাংলাদেশকে দেবে মাত্র ৫০ ডলার। তার বিপরীতে বিদেশি কোম্পানি নিবে ৬৫ ডলার। তারা তার সাথে ট্যারিফ বাড়াবে এবং বাড়লে এর দ্বিগুণ হতে পারে তাদের আয়। বন্দর বিদেশি কোম্পানি হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত আছে, তাদের নাম কালো তালিকা অন্তর্ভুক্ত করাও দাবি ওঠে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বন্দর নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, অস্বচ্ছতা আর গোপনীয়তা ও মাত্রাতিরিক্ত তাড়াহুড়োর মধ্যে দিয়ে বিদেশি কোম্পানি আর তাদের দেশি হিউমানদের স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়মবহির্ভ‚তভাবে চুক্তি করছে, তাতে ইতিহাসের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।
দেশের সার্বিক ব্যবস্থা বড়োই নাজুক। এর প্রভাব পড়ে পরিবেশ ও প্রাণি জগতের উপরও। মনে হচ্ছে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। খাদ্যাভাবে বনের ক্ষুধার্ত প্রাণি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) উখিয়ায় একটি বন্যা হাতি লোকালয়ে নেমে আসলে বিদ্যুৎ তারে জড়িয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। কর্ণফুলী টানেল লাগোয়া দক্ষিণ কোরিয়া ইপিজেড এলাকায়ও একসময়ে ১৩টি বন্য হাতির অবস্থান নিশ্চিত করা হয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও বনবিভাগ। এরমধ্যে কয়েকটি হাতিকে হত্যা করা হয়েছে গোপনে দূর্বৃত্তরা। অবশিষ্ট কিছু হাতিকে ভয়ভীতি ও নানা কৌশলে খেদানো হয়েছে। এভাবে প্রাণি হত্যার মত জঘন্যতম অপরাধেরও জড়িয়ে পড়েছে দেশীয় ও বিদেশি দুর্বৃত্তরা।
লেখক : কবি, গবেষক ও কলামিস্ট










