হাটহাজারীতে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল

8

হাটহাজারী প্রতিনিধি

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল চট্টগ্রামে সরাসরি আঘাত করেনি। তবুও এর প্রভাবে রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে হাটহাজারী পৌরসভা ও উপজেলার কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে এবং নিম্নাঞ্চলের ছোট-বড় গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। এতে করে নানা প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া লোকজনকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া পরিবারের অবস্থা খুবই শোচনীয়, তাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
এদিকে, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে উপজেলার আওতাধীন লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে হাজার হাজার গ্রাহকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ের পাশে হাটহাজারী উপজেলা সংলগ্ন পার্বতী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ঘেঁষা সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) এর নির্মাণাধীন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ কমপাউন্ড সড়ক-ড্রেনের পানিতে একাকার হয়ে গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রবিরার (২৬ মে) রাত ১০টার পর থেকে শুরু হওয়া বর্ষণে হাটহাজারী পৌরসভা ও উপজেলা ১৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে এবং নিম্নাঞ্চলের ছোট-বড় ২০/২৫টির মত গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে শুরু করেছে, যা অব্যাহত ভারী বর্ষণে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিতে পারে। পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া পরিবারের অবস্থা খুবই শোচনীয়, তাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী খেটে খাওয়া মানুষরাগুলো জানিয়েছে, টানা বর্ষণে যাতায়াতের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় নিত্য প্রয়োজনে হাট-বাজারে আসা-যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে গ্রামীণ রাস্তাঘাটের। এছাড়া কিছু কিছু স্থানে বিশেষ করে ছিপাতলী, নাঙ্গলমোড়া, গুমানমর্দ্দন, মাদার্শা ও হাটহাজারী পৌরসভা এলাকায় নৌকা দিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে বন্যাকবলিত এসব এলাকার মানুষদের।
পাশাপাশি পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার গ্রাহকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। এ ব্যাপারে পিডিবি হাটহাজারীর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নেওয়াজ আহমেদ খান বলেন, আমরা ভালো নেই। এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক করে আসলে, অন্য দিকে ফের বিদ্যুৎ গোলযোগ দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় রেমাল প্রভাব তথা দমকা হাওয়া ও বর্ষণ না কমা পর্যন্ত আমরা ভালো থাকতে পারবো না।
এদিকে, পুকুরে চাষ করা লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ পানির সাথে ভেসে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। টানা বর্ষণে পাহাড়ী ঢলের চাপে বিভিন্ন খাল ও ছড়ার পানি বেড়ে গিয়ে পৌর এলাকার আদর্শ গ্রাম, আলমপুর, খীল পাড়া, চন্দ্রপুর, মিরের হাট, মীরের খীল, ফটিকা, শায়েস্থা খাঁ পাড়া, সুজানগর, আলীপুর এবং উপজেলার ফরহাদাবাদ, ধলই, মির্জাপুর, মেখল, উত্তর মাদার্শা, দক্ষিণ মাদার্শা, গুমানমর্দ্দন, লাঙ্গলমোড়া ও ছিপাতলী ইউনিয়নের মৌসুমী ফসলী জমির ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তারমধ্যে উপজেলার গড়দুয়ারা ইউনিয়ন এলাকার রাস্তাঘাট পানির নিচে প্রায় তলিয়ে গেছে। উক্ত ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভেঙ্গে যাওয়া স্লুইস গেটটি হালদা নদীর জোয়ারের তীব্র স্রোতে এলাকার বাড়ির আশেপাশে পানি ঢুকে পড়েছে। তাছাড়া গড়দুয়ার ইউনিয়নের অধিকাংশ মৎস্য খামার-পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে।
গড়দুয়ারা ৩নং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন বলেন, আমার ওয়ার্ডসহ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ এখন প্রায় পানিবন্দি হওয়ার উপক্রম। অনেকের বাড়িঘরের পাশে পানি চলে এসেছে। প্রবল বর্ষণে পাহাড়ী ঢলের তীব্র ¯্রােতে হালদা নদীর পানি বেড়ে গেছে। ভেঙ্গে যাওয়া স্লুইস গেটটি দিয়ে হালদা নদীর জোয়ারের পানি লোকালয়সহ বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সহস্রাধিক পরিবারের মানুষ।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ের পাশে হাটহাজারী উপজেলা সংলগ্ন পার্বতী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ঘেঁষা সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) এর নির্মাণাধীন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে উপজেলা পরিষদ কমপাউন্ড সড়ক-ড্রেনের পানিতে একাকার হয়ে গেছে। এতে করে উপজেলা পরিষদ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাসায় পানিবন্দি হয়ে পড়লেও বিকেল নাগাদ উপজেলা পরিষদ কমপান্ডের কয়েকটি স্থানে সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে দেয়ার পর পানি কমতে শুরু করে। পরে, এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহরাজ শারবীন এর নেতৃত্বে পৌরসভার একদল কর্মচারী চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের পাশে উপজেলার পূর্ব পাশে সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন ড্রেনটি এস্কেভেটর দিয়ে পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন।নাম প্রকাশ না করা শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফটিকা এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ওষুধ আর কাঁচা বাজার আনতে বের হয়ে দেখি পানি একহাঁটু। এসব ময়লা পানি মাড়িয়ে অনেক কষ্ট করে দোকানে গেলাম। গিয়ে দেখি দোকান বন্ধ। এছাড়া ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পৌরসভারসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে করে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
এব্যাপারে হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মিত ড্রেন ভেঙ্গে ক্ষনিকের জন্য উপজেলা পরিষদ কমপাউন্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও তা নিরসন করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সচেতনতাই বেশি জরুরি জানিয়ে তিনি বলেন, পার্বতী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ঘেঁষা সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) এর নির্মাণাধীন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাওয়ার বিষয়টি সওজকে অবহিত করা হয়েছে।