স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে ২৫ জনের সিন্ডিকেট

192

স্বর্ণ চোরাচালানের ‘স্বর্গরাজ্য’ চট্টগ্রাম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সোনা চট্টগ্রামে আনার পর ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ সর্বোপরি ভারতে পাচার হয়ে যায়।
জানা গেছে, স্বর্ণ চোরাচালানে রিয়াজউদ্দিন বাজার, নিউ মার্কেট, হাজারী লেন ভিত্তিক ২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট এতে জড়িত। বছরে হাজারা কোটি টাকার স্বর্ণ পাচার করে এ সিন্ডিকেট। মাঝে মধ্যে দুয়েকজন চুনোপুটি ধরা পড়লেও রাঘব বোয়ালরা আড়ালেই রয়ে যায়। তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারে না কেউ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যের সাথে তাদের রয়েছে গোপন আঁতাত। এ কারণে তারা কখনো ধরা পড়ে না। অবশ্য কখনো কখনো ছোট চালান ধরা পড়লেও বৃহৎ চালান পার হয়ে যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাধীনতার পর হয়নি স্বর্ণ আমদানি নীতিমালা। একারণে চোরাই পথে আনা স্বর্ণ দিয়েই দেশের চাহিদা মিটে। গত বছরের শেষ দিকে সরকার একটি আমদানি নীতিমালা করলেও সে অনুযায়ী এখনো আমদানি শুরু হয়নি। নির্দিষ্ট ডিলার ছাড়া কেউ এ আইনে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবে না।
জানা যায়, চট্টগ্রামে ২৫ জনের সিন্ডিকেটের এজেন্ট রয়েছে শতাধিক। এজেন্টদের মাধ্যমেই স্বর্ণ পাচার করে তারা। তাদের সাথে রয়েছেন কাস্টমস ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তারও যোগসাজশ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ সিন্ডিকেটের লোক রয়েছে দুবাই, আবুধাবি, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। আরেকটি গ্রুপ অবস্থান করে ভারতে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা বলছে, চোরাই পথে আনা বেশিরভাগ স্বর্ণই ভারতে পাচার হয়ে যায়। দুবাই থেকে এক কেজি স্বর্ণ বাংলাদেশে আনার পর মুনাফা মিলে চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা। আর ভারতে পাচার করতে পারলে মিলে সাড়ে ১০ লাখ টাকা বা তার চাইতেও বেশি। একারণে ভারতের প্রতি ঝোঁকই বেশি চোরাচালানিদের।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার এস এম মোস্তাইন হোসাইন বলেন, চোরাচালানিরা নানা কৌশলে স্বর্ণ এনে তা আবারো পাচার করার চেষ্টা করে। দুবাই থেকেই বেশিরভাগ স্বর্ণ আনা হচ্ছে। গত রবিবার সিআরবিতে ধরা পড়া স্বণের্র বারের গায়েও ইউএই লেখা রয়েছে। এতেই বুঝা যায় এগুলো দুবাই থেকে আনা। তিনি বলেন, চোরাচালানের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমরা সব রকম চেষ্টাই করে যাচ্ছি।
জানা যায়, স্বর্ণ চোরাচালানিরা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। আমিরাতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে শ্রমিক হিসেবে যারা কাজ করছেন, চোরাচালান চক্রটি মূলত তাদের ব্যবহার করে থাকে। তারা দেশে আসার সময় স্বর্ণের বার নিয়ে আসে। বিনিময়ে তারা টাকা পেয়ে থাকে। এগুলো দেশে পৌঁছার পর কোনোটি ধরা পড়ে, আবারো কোনোটি ধরা পড়ে না।
এছাড়া কিছু বাহক রয়েছে তাদের কাজই হল স্বর্ণ বহন করা। তারা মাসে বা দুমাসে একবার করে দুবাই যায়। আসার সময় স্বর্ণের বার নিয়ে আসে তারা। বাহক চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেমে যায়। তার সিটের পাশে স্বর্ণের বার থেকে যায়। পরে সেখানে আরেক জন বসে সেগুলো ঢাকা নিয়ে যায়। আবার চট্টগ্রামে সিভিল এভিয়েশন বা পরিচ্ছন্ন কর্মীরা ব্যাগ নিয়ে নেমে আসে। তারপর পার করে দেয়।
সূত্র জানায়, বাহকরা প্রতি পিসের বিপরীতে ৫০০ টাকা করে পায়। যত পিস আনতে পারে তত টাকাই তাদের পরিশোধ করা হয়। দুই মাসে একবার করে গেলেও তাদের আয় হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রবিবার আটক করা দুই চালানের ৭০০ কেজি স্বর্ণই আনা হয়েছে দুবাই থেকে। স্বর্ণের বারগুলোর গায়ে ইউএই লেখা রয়েছে। রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকেই নেয়া হচ্ছিল এগুলো।
জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, আটক স্বর্ণ কোথা থেকে আসছে এবং গন্তব্য কোথায় তা বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারা এর সাথে জড়িত তাদেরও খুঁজে বের করা হবে। হোতাদের খোঁজে তৎপর রয়েছে পুলিশ।
তিনি বলেন, ‘স্বর্ণগুলোর উপর ইউএই লেখা রয়েছে। এর মানে এসব স্বর্ণ দুবাই থেকে বাংলাদেশে এসেছে। তবে কীভাবে বা কোন মাধ্যমে এসব স্বর্ণ বাংলাদেশে এসেছে তা আমরা বলতে পারবো না। তদন্ত সাপেক্ষে তা বের করা হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার গ্রেপ্তার হওয়া চার জনই বাহক। তারা স্বর্ণগুলো কাদের বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে এসব কিছুই বলতে পারছে না। মূল হোতাদেরও তারা চিনে না। তারা শুধু ঢাকায় পৌঁছে দেবে-এটুকুই জানে।
মাঝে মধ্যেই ধরা পড়ে স্বর্ণ। বিমানবন্দর, স্থল বন্দর, সড়ক পথে স্বর্ণ ধরা পড়ে। তবে তা সামান্যই বলে অনেকের ধারণা। তার শতগুণ বেশি পাচার হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, ভারতে পাচার হওয়া স্বর্ণের দাম মেটানো হয় গরু দিয়ে। দেশ থেকে স্বর্ণ যায়, সেখান থেকে পাঠানো হয় গরু। আবার হুন্ডির মাধ্যমেও টাকা লেনদেন করা হয়।
স্বর্ণ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়। বাহক আর চুনোপুঁটিরাই জেলে যায়। আবার হোতারা তাদের ছাড়িয়েও নেয়। স্বর্ণ আটকের মামলায়ও হোতারা আসামি হয় না। একারণে মামলার তদন্তও বেশিদুর এগুয় না।
এর আগে রবিবার দুপুরে একটি পাজারো মিতসুবিশি জিপগাড়িতে করে পাচারের সময় জোরারগঞ্জের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকা থেকে ৬০০ পিস স্বর্ণের বারসহ করিম খান কালু ও রাকিব নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ। একই দিন সিআরবি এলাকা থেকে প্রাইভেট কারে করে পাচারের সময় ১০০ পিস স্বর্ণের বারসহ লাভু শাহা প্রকাশ প্রলয় কুমার শাহা ও বিলাল হোসেন প্রকাশ কাদেরকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম।