সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়

1

আকতার কামাল চৌধুরী

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স এমবিএস(মোহাম্মদ বিন সালমান)-এর সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কটা একটু অন্যরকম। বলতে গেলে একে অন্যের খয়ের খাঁ,পরম এবং চরম হিতাকাক্সক্ষী। এ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মূলত ইরানবিরোধীতা দিয়ে। তখন সৌদি আরবে ক্ষমতার ভারকেন্দ্রে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি-ইরান সম্পর্কও তিক্ততার চরমে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের শিয়া আধ্যাত্মিক নেতা শেখ নিমর আল নিমরের মৃত্যুদন্ড কার্যকরকে কেন্দ্র করে ইরান সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করে। ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প হিলারি ক্লিন্টনকে হারিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবামার উপর এমবিএস-এর ক্ষোভ-অভিমান কম ছিল না। প্রেসিডেন্ট ওবামার ইচ্ছায় ইরানের সাথে জাতিসংঘ ও ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হলে এমবিএস খুব নাখোশ হন। তিনি চেয়েছিলেন সরাসরি বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিতে। কিন্তু রাজি হননি প্রেসিডেন্ট ওবামা।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে আসলে কপাল খুলে যায় ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের। সফর করেন ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউসের একান্ত ও দীর্ঘ বৈঠকে উর্ধতন কর্মকর্তাদেরও ডেকে নেন ট্রাম্প। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যে ইরানের ‘পারমাণবিক প্রকল্প’ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেথানিয়াহুর সাথে এককাট্টা হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন। শেষপর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ছয় জাতি চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। আর অমনি অকার্যকর হয়ে পড়ে বহুল আলোচিত এ আন্তর্জাতিক চুক্তি। এভাবেই সখ্যতা দুই প্রধান ক্ষমতাবানের। এরমধ্যে ২০১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি ইন্স্যুলেট অফিসে খুন হন সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচক হিসেবে পরিচিত কলাসিষ্ট জামাল খাশোগী। সৌদি কন্স্যুলেটে ঢুকার পর খাশোগীকে হত্যা করে পুরো দেহ টুকরো টুকরো করে ভ্যানিস করে ফেলা হয়। সকল আলামত প্রমাণ করে, মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে সৌদি আরব থেকে ঘাতক দল তুরস্কে গিয়ে খাশোগীকে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ড নিয়ে সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হলে বেকায়দায় পড়েন এমবিএস। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে এবং তত্ত্বাবধানে এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। এ অবস্থায় এমবিএসের পক্ষে ত্রাতা হয়ে আসেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সিআইয়ের প্রতিবেদনকে পাত্তা না দিয়ে এমবিএসকে বন্ধুত্বের বাহুডোরে বেঁধে নেন।
জো বাইডেনের সময়কালে এমবিএস একদম নির্ভার ছিলেন না। বিশেষ করে তাঁর ইয়েমেনে হুতী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানকে সরাসরি নাকচ করে দেন জো বাইডেন। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ক্রাউন প্রিন্সের জন্য সেটি হয় সোনায়-সোহাগা। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসে ট্রাম্প তাঁর এশিয়া সফর শুরু করেন সৌদি আরব-কাতারকে দিয়ে। সৌদি সফরকালে ট্রাম্পকে অভাবনীয় সম্মান প্রদান করা হয়। অভিভ‚ত ট্রাম্প তাঁর বক্তৃতায় ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনি সারাদিন দেশের জন্য কাজ করেন। জানি না, ঘুমানোর সময় কখন পান”। ট্রাম্পের এমন প্রসংশাধ্বনিতে কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত প্রিন্স বুকে হাত রেখে মাথা নুয়ে সভাসদদের সামনে দাঁড়িয়ে যান। এভাবেই দুজনের বন্ধুত্ব ডানা মেলে উড়তে থাকে। খাশোগী হত্যা ইস্যুটিও আস্তে আস্তে বিবর্ণ হতে থাকে। এতদিনে চীনের দূতিয়ালিতে ইরান-সৌদি কুটনৈতিক সম্পর্কও আবার জোড়া লাগে। এ নভেম্বরের ১৮ তারিখ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটন সফর করেন। বলতে গেলে সাংবাদিক জামাল খাশোগী হত্যাকান্ডের দায় আসার পর এটাই তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে এক রাজকীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন।ম্যারিন ব্যান্ডের সংগীত, অশ্বারোহী বাহিনীর কুচকাওয়াজ, সামরিক বিমান প্রদর্শনী, ২১ বার তোপধ্বনী- এভাবে কী ছিল না তালিকায়। এমবিএসের সৌজন্যে হোয়াইট হাউসে নৈশভোজের আয়োজন করেন ট্রাম্প। সেখানে দেওয়া বক্তৃতায় ট্রাম্প সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে সহযোগী) ঘোষণা করেন। এ ঘোষণাতেই বোঝা যায় দুজনের সম্পর্কের গভীরতা। এবং এধরণের ঘোষণা বিরল-ই বটে।
এমবিএস যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা বললেও এ সফরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে রুপ নেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের এত বিশাল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে সৌদি আরবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন নেতৃত্বকে নিশ্চয়ই ভাবাবে। অর্থাৎ এ বিনিয়োগ সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিরাট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার কথা হয়েছে। এফ-৩৫ মানে অত্যন্ত সংবেদনশীল যুদ্ধবিমান। এ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরায়েলের-ই আছে। অথচ, মার্কিন আইনে মুসলিম দেশগুলোতে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির আগে নিশ্চিত হতে হয় তা ইসরায়েলের জন্য হুমকি কি না। এ সফরে এমবিএসের আরও উল্লেখযোগ্য অর্জন, বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি। এ চুক্তির অধিনে মার্কিন প্রযুক্তির সহায়তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা কাজে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক প্রকল্প স্থাপন করতে পারবে।
শুধু তাই নয়, মোহাম্মদ বিন সালমান ও ট্রাম্পের আমলে এ চুক্তিগুলোর পরিধি ও কলেবর আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা নাকচ করার মত নয়।তখন দুদেশ অনেককিছু বিনিময় করতে পারে, যা আগে কেউ ভাবেইনি। এমনকি ইরানের মত পারমাণবিক অস্ত্রের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প থাকার আলামতও ওড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমানে পারমাণবিক বোমা মানে শৌর্যবীর্যের প্রতীক। এর মালিক কে না হতে চায়।অর্থপ্রাচুর্যে ভরপুর, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মাখামাখি সম্পর্কের কারণে সৌদি আরব এ উচ্চাশা করতেই পারে।
দুনেতার সম্পর্ক কী পর্যায়ে তার একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। হোয়াইট হাউসে বৈঠককালে এবিসি নিউজের সাংবাদিক মেরি ক্রস ২০১৮ সালের অক্টোবরে কলামিস্ট জামাল খাশোগীর হত্যাকান্ড নিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রশ্ন করলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘এধরনের প্রশ্ন করে আমাদের অতিথিকে অস্বস্তিতে ফেলবেন না’।
ট্রাম্প আরও আগ বাড়িয়ে বলেন,’অনেকেই ওই ভদ্রলোককে পছন্দ করতো না। আপনি তাঁকে পছন্দ করুন কিংবা না করুন, মাঝে মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে’। এছাড়া ট্রাম্প এবিসি নিউজের উদ্দেশে বলেন, ‘এটি একটি বাজে কোম্পানি, এর সম্প্রচার লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া উচিত’। এ ই যখন অবস্থা, এ সম্পর্কের গভীরতা আপনি কী দিয়ে মাপবেন। অর্থাৎ সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক এখন অন্যন্য উচ্চতায় দাঁড়িয়ে।
লেখক : প্রাবন্ধিক