সেরে উঠুন দেশ ও জাতির অনুপম অভিভাবক ও গণতন্ত্রের মা’ মজলুম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া

1

আলমগীর নূর

বৈশ্বিক গণতন্ত্রের আইকন, মজলুম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির অভিভাবকই নন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌামত্বের স্বর্ণোজ্জ্বল প্রতীক। তিনি দেশ ও জাতির অনুপম অবিকল্পনীয় কান্ডারি। রক্তস্নাত জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের জগদ্দল পাথর সরিয়ে জাতির সামনে এক মুক্ত আকাশ উন্মোচিত করেছে। আজ প্রায় দেড় বছর হতে চলল, দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থার অধীনে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই বিজয়ের আনন্দ, এই নতুন স্বাধীনতার স্বাদ যেন অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। কারণ, যে মানুষটি এই দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ছিলেন, যার ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিত্তি রচিত হয়েছে, সেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজও গুরুতর অসুস্থ।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে তিনি আজ মুক্ত বটে, তবে দীর্ঘ কারাভোগ আর বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে পার করা বছরগুলো তাঁর শরীরে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তা আজও আমাদের সামনে এক যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি আবারও হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি বিএনপির থাকলেও বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির জেরে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নেত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক দল। যা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আবারও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তাঁর সুস্ততার জন্য সারা বাংলাদেশের আপামর জনগণ দোয়া প্রার্থণা করছেন ইদমধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দোয়া কামনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১ ডিসেম্বর ২০২৫, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া কামনা করেছেন। নরেন্দ্র মোদী অত্র বার্তায় জানান, “ বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে জানতে পেরে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের সামগ্রিক জনজীবনের উন্নয়নে তিনি বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। তাঁর দ্রæত আরোগ্যের জন্য আমরা আন্তরিক প্রার্থনা করছি। যেকোনো প্রয়োজনে ভারত সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত”।

জুলাই বিপ্লব ও দেশনেত্রীর আদর্শিক বিজয় :
২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, বেগম খালেদা জিয়া যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করেছেন, তা ছিল সত্য ও ন্যায়ের লড়াই। বিগত স্বৈরাচারী সরকার তাঁকে মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করেছে, বছরের পর বছর নির্জন কারাগারে আটকে রেখেছে, এমনকি উন্নত চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত করেছে। তবুও তিনি মাথা নত করেননি, দেশ ছেড়ে পালাননি। ‘গণতন্ত্রের মা’ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশেই থেকেছেন, যা চব্বিশের তরুণ প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শক্তি যুগিয়েছে। আজ যখন স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, তখন তা বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শিক বিজয় হিসেবেই গণ্য হচ্ছে সারা দুনিয়ায়। আজকের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের পথে হাঁটছে, তার মূলে রয়েছে মূলত তাঁরই দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতিফলন। আজকের তরুণরা যে ‘আপসহীন’ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, তার মূর্ত প্রতীক তিনি নিজেই।

ফ্যাসিবাদের দগদগে ক্ষত ও বর্তমান বাস্তবতা :
আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশে দেশনেত্রীর অসুস্থতা কেবল ‘বার্ধক্যজনিত’ কোনো বিষয় নয়; এটি পতিত ও পলাতক শেখ হাসিনার বিগত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলের নিষ্ঠুরতার এক জীবন্ত দলিল। তাঁকে তিলে তিলে নিঃশেষ করার যে নীল নকশা আঁকা হয়েছিল, আজকের এই শারীরিক সংকট তারই ফলাফল। ডিসেম্বর ২০২৫-এর এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের ক্ষত মেরামতের কাজ করছে, তখন দেশনেত্রীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ জাতি হিসেবে আমাদের বিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অধিকার তিনি ফিরে পেয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠাটা এখন জাতীয় অপরিহার্যতা। কারণ, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে মেরামত করতে এবং আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতিতে একটি সুস্থ ও ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বপরি অন্তর্ভূক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা একান্ত প্রয়োজন।

নতুন বাংলাদেশ ও ঐক্যের অপরিহার্যতা :
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে যজ্ঞ শুরু হয়েছে, সেখানে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আর এই ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মজলুম দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কেবল বিএনপির নেত্রী নন, তিনি এখন দল-মত নির্বিশেষে নির্যাতিত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন নব্বইয়ের স্বৈরাচার হটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি আজকের এই ক্রান্তিকালেও তাঁর উপস্থিতি অপরিহার্য। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে তাঁর ‘মাদারলি ফিগার’ বা অভিভাবকসুলভ ছায়া আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, দেশ ও জাতির অবিকল্পনীয় কাÐারি বেগম খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকার আদায়ই শহীদ জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল লক্ষ্য। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসেছেন, জেল খেটেছেন, কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। চব্বিশের বিপ্লবীরা যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে, বেগম খালেদা জিয়া তাঁর শাসনামলে নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন। আজ সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে তাঁকে আমাদের মাঝে সুস্থভাবে প্রয়োজন।

প্রার্থনা ও প্রতীক্ষা :
হাসপাতালের চার দেয়ালে বন্দী থেকেও তিনি যেন কোটি মানুষের হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছেন। জাতি আজ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁর জন্য প্রার্থনারত। চব্বিশের বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত এই স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমাদের ‘গণতন্ত্রের মা’ সুস্থ হয়ে হাসিমুখে জনতার সামনে দাঁড়াবেন। তাঁর সুস্থতা কেবল একটি পরিবারের চাওয়া নয়, এটি এখন জাতীয় আকাক্সক্ষা।
আমরা বিশ্বাস করি, সকলের দোয়ায় তিনি ফিরে আসবেনÑএটাই এখন একমাত্র প্রত্যাশা ও মহান আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা।
পরিশেষে আমরা আশা করি, যিনি আজীবন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, মৃত্যুঞ্জয়ী সেই নেত্রী এই শারীরিক অসুস্থতার যুদ্ধেও জয়ী হবেন। চব্বিশের তারুণ্যদীপ্ত বাংলাদেশ আজ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ, এই নতুন যাত্রাপথে তাঁর আশীর্বাদ ও উপস্থিতি আমাদের সাহস যোগাবে। দেশনেত্রীর আরোগ্য লাভ আর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন-আজ একই সূত্রে গাঁথা। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলায় আমরা আপনাকে সুস্থ ও সবলভাবে আমাদের মাঝে ফিরে পেতে চাই।
সেরে উঠুন দেশনেত্রী, আপনার প্রতীক্ষায় ‘নতুন বাংলাদেশ’।

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক,
ব্যুরো প্রধান, দৈনিক মানবকণ্ঠ, চট্টগ্রাম