পটিয়া প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের বিতর্কিত সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে পরিচালিত দীর্ঘ অনুসন্ধানের চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কমিশনে জমা দিয়েছে।
দুদক জানায়, সামশুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে ওঠা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ভিত্তিতেই এই অনুসন্ধান। তদন্তে বড় অগ্রগতি জানিয়ে দুদক সূত্রটি বলছে, পরিবারের নামে ৩০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১২ কোটি টাকা। বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রে ১ কোটির বেশি টাকা এবং প্রায় ২ কোটি টাকার জমি অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছিল আরো আগেই। এছাড়াও জমি কেনাবেচা ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র জব্দ করেছে দুদক।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সামশুল হক চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অনুসন্ধানের চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন আমরা সম্প্রতি কমিশনে জমা দিয়েছি। এখন কমিশন পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না।
দুদক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো- বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, নামে-বেনামে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থপাচার, ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, ক্ষমতার অপব্যবহারে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম এবং মাদক-অস্ত্র সিন্ডিকেটে প্রভাব খাটানো।
২০১৯ সালের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় সামশুল হক চৌধুরীর নাম আলোচনায় আসে। চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবে র্যাবের অভিযানে উদ্ধার হওয়া জুয়ার কার্ডসহ বিভিন্ন তথ্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে আরও জোরদার করে।
মামলার অনুসন্ধানে শুধু সামশুল হক নয়, তার পরিবারের আরও ৬ সদস্যকে যুক্ত করা হয় তদন্তে। স্ত্রী কামরুন নাহার চৌধুরী, ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন, মেয়ে তাকলিমা নাছরিন, তাহমিনা নাসরিন, ছোট ভাই ফজলুল হক চৌধুরী মহব্বত ও মজিবুল হক চৌধুরী নবাব। শারুনের একাধিক কেলেঙ্কারি, ফাঁস হওয়া ফোনকল, একে- ৪৭ হাতে ভিডিও ভাইরাল তদন্তকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর সামশুল হক ও তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য আত্মগোপনে চলে যায়। ছেলে শারুন পালিয়েছেন দুবাই, অন্যান্য সদস্যরা দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় বদলাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ ১৬ বছর পটিয়া উপজেলায় প্রশাসন, জমি-খাল-বালুমহাল, পরিবহন, মাদক ও অস্ত্র সিন্ডিকেট- সবকিছুতেই প্রভাব বিস্তার করেছিল সামশুল হক ও তার পরিবার। বিএনপি-জামায়াতের শত শত নেতাকর্মী গায়েবি ও সাজানো মামলার শিকার হয়েছেন তাদের ইশারায়- এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। ঢাকা-চট্টগ্রামজুড়ে অসংখ্য ফ্ল্যাট, জমি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কেনেন সামশু পরিবার, যা দুদকের অনুসন্ধানে বড় আকারে উঠে আসে।
২০১৯ সালে দুদকের তৎকালীন সিদ্ধান্তে সামশুল হক অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। তবে বছর না ঘুরতেই নতুন প্রমাণ, গোয়েন্দা তথ্য ও অভিযোগের আলোকে আবারও অনুসন্ধান শুরু হয়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয়পত্র, লকার, বিদেশ যাত্রা- সবকিছুর তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায় দুদক।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দুদক কমিশন এখন অবৈধ সম্পদ মামলা, মানিলন্ডারিং মামলা এবং অর্থপাচারের অভিযোগে বিশেষ আইনের মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রমাণ শক্তিশালী হলে মামলার সিদ্ধান্ত দ্রুতই আসবে। এ বিষয়ে কমিশন গণমাধ্যমকে জানাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সিস্টেমিক দুর্নীতির প্রতীক, সংস্কারের দাবি বাড়বে।
দুদকের এই প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘বাংলাদেশের দুর্নীতির গভীরতর চিত্র’ হিসেবে দেখছেন। এটি কেবল একজন নেতার গল্প নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
তারা আরও বলছেন, সামশুল হকের মতো নেতাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে জড়িত। দুদককে সাংবিধানিক স্বাধীনতা দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কীভাবে তদন্তগুলোকে ‘অব্যাহতি’ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এটি হাজারো কোটি টাকার লুটের শুরু মাত্র। পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হলে রাজনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে।
অপরদিকে, পটিয়ায় সামশুর পরিবারের আধিপত্য ছিল এক ‘মাফিয়া রাজ’। বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের মিথ্যা মামলায় কারাবাস, স্থানীয় প্রশাসনের দলীয়করণ। দুদকের সম্প্রতি সময়ে কমিশনে দাখিল করা এই প্রতিবেদনটি ন্যায়বিচারের পথ খুলেছে, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে যাতে পলাতকরা শাস্তির আওতায় আসে। এটি দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কারেরও সংকেত।
পটিয়ার স্থানীয়রা বলছেন, সামশুল হক চৌধুরী এমপি থাকাকালীন তার দাপটে আমরা সবাই ভয়ে থাকতাম। চাঁদাবাজি, দখলবাজি সবকিছু হতো তার ইশারায়। এখন দুদকের পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের ফল পাচ্ছি। আমরা চাই দুদক যেন দ্রæত সময়ে চার্জশিট দাখিল বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।










