সাপের বাস্তু সংকট; ঢাকার আবাসিকে সাপ

2

মুশফিক হোসাইন

জীব বৈচিত্র্যের জন্য সকল জীবের কাম্যস্তরের বাসস্থান জরুরি। মানুষের যেমন বাসস্থান প্রয়োজন তেমনি কীটপতঙ্গ, পশুপাখি এবং বৃক্ষরাজিরও নিশ্চিতও কাম্য বাসস্থান জরুরি। তার অভাবে জীব বেঁচে থাকতে পারেনা। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন আবাসিকের বহুতল ভবনে বিষাক্ত প্রজাতির সাপের উপদ্রব লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ঘটনা আনইজিয়েল বা অস্বাভাবিক। তারা এবিষয়ে চিন্তিত এবং আতংকিত। ঘটনাগুলো ঘটে বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার উত্তরা, বনশ্রী, আফতাব নগর, মোহাম্মদপুর, বসিলা, খিলগাঁও, কচুক্ষেত, মিরপুর-২ নিকেতন, উত্তরখান, দিক্ষণখান, প্রভৃতি এলাকায়। এ সকল অঞ্চল এক সময় নি¤œ ও জলাভূমি ছিল। কৃষিকাজে ব্যবহৃত হত। সংবাদে প্রকাশ গত চারমাসে এ সকল এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক সাপ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সংখ্যায় পুর্ণবয়স্ক, বাচ্চা ও ডিম ছিল। উল্লেখ্য যে উত্তরার ১৮নং সেক্টরে রাজউক সরকারি ভাবে ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছিল, সেইসমস্ত ফ্ল্যাটে সবচাইতে বেশি পরিমাণে সাপ উদ্ধার করা হয়। এগারোটি ভবনের সাত, নয় তলা থেকে সবচেয়ে বেশি সাপ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে খিলগাঁওয়ের কয়েকটি ভবন থেকে ৩৮টি সাপ উদ্ধার করা হয়। উল্লেখ্য যে, উদ্ধারকৃত সাপের প্রায় দুইশতটিই ছিল বিষাক্ত পদ্মগোখরা প্রজাতির। আল্লাহর অশেষ রহমত এই যে, স্থানীয়রা আতঙ্কে থাকলেও অদ্যাবধি সাপ দংশনের কোন ঘটনা ঘটেনি। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদল নির্বিঘ্নে সাপগুলো উদ্ধার করে নেয়।
প্রশ্ন হলো যে, হঠাৎ করে এই সকল এলাকায় এই সাপগুলোর দেখা মিললো কেন ? সাধারণতঃ পদ্মগোখরা প্রজাতি বর্ষা মৌসুমে প্রজনন করে থাকে। তারা মূলতঃ পানিপ্রেমী, নদী, জলাশয়, বিলে থাকতে পছন্দ করে। এছাড়াও জলাশয়ের নিকটস্থ ঝোপঝাড়ে ও গর্তে এদের দেখা মেলে। উল্লেখ্য যে, মানুষেরা তাদের বসত এলাকা দখল করে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছে। সাধারণ জনগণ, সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা জলাশয়, খাল-বিল, নদী জবর দকল করে উঁচু উঁচু ভবন তৈরি করছে। তারা নিজেদের আরাম আয়েশের জন্য এই গর্হিত কাজগুলো করছে। ফলে অন্যান্য জীবজন্তু ও প্রাণীদের যে বাঁচতে হতে আরাম আয়েশ করতে হবে, প্রজনন করতে হবে তা মাথায় রাখছে না। ফলে দেশে জীববৈচিত্র্য দিনদিন বিলুপ্তি ও হুমকির মুখে আছে। মানুষ জীবজগতে উদ্ভিদের বসতি এলাকা দখল করেছে। বলা চলে মানব প্রজাতি তাদের এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে। সাপগুলো বরঞ্চ তাদের এলাকায় বসবাস করছে। তাদের বসতির জন্য উঁচু এলাকা, ভবনাদি বেছে নিয়েছে। তাদের কোন দোষ নেই দোষ সম্পূর্ণ মানুষের। এর দায় দায়িত্ব দেশের মানুষতথা সরকারের। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এবং সরকার আজ অবধি ‘ড্যাব’ বাস্তবায়িত করেনি। সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বাসস্থান, শহর নগর গড়ে তুলছে। পৃথিবীতে মানুষ ছাড়াও যে অন্য প্রজাতি বাস করে এটা ভুললে চলবে না। তাই উন্নত বিশ্বে পরিকল্পিতভাতে বাসস্থান নির্মাণ করতে হয়। আমাদের দেশে কোথায় কি স্থাপনা গড়ে উঠবে, এক ব্যক্তির কতটি বাড়ি থাকবে, কতটাকা ট্যাক্স দিতে হবে এ সম্পর্কে পরিকল্পনা যেমন নাই, তেমনি যা আছে তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট পরিমানে কারচুপি লক্ষ্য করা যায়। একটি সমাজ ও দেশ অপরিকল্পিতভাবে চলতে পারে না। সকলের জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকার। অন্নবস্ত্র, বাসস্থান যেমন আমাদের মৌলিক অধিকার। তেমনি অন্যপ্রাণী
জগতের জন্য এই অধিকারগুলো বাস্তবায়িত করা আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানব সমাজকেই নিশ্চিত করতে হবে।
সাপগুলো কিভাবে সাত, নয় তলা ভবনে উঠেছে তা বিবেচ্য বিষয় নয়। বন বিভাগের ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল বিভাগ জানাচ্ছে যে, ইতিপূর্বে ঢাকার এধরনের ঘটনা ঘটার কোন ইতিহাস নেই। এটা আনইজুয়াল ঘটনা। সাধারণের ধারণা সাপ ব্যাঙ ইত্যাদি তো বাস করবে ঝোপঝাড়ে। চিন্তার বিষয় বটে। মানুষ শুধু নিজেদের কথা চিন্তা করলে চলবে না। এতে করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে পারে। হচ্ছেও দেশে দেশে। বিস্ময় প্রকাশ না করে দেশে বসবাসের জন্য পরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক জীবের বসবাসের জন্য জায়গা ছেড়ে দিন। বিশ্বে উষ্ণায়নের প্রভাব পড়ছে। তারপর ও মানব সমাজ বায়োগ্যাস ব্যবহার কমাচ্ছে না, প্রকৃতি তথা বন-বনানী ধ্বংসের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। নিজেদের সুখ ও আয়েশের কথা না ভেবে সকলের জন্য একটি নির্মল বাসস্থানের কথা ভাবুন। আজ সাপের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখোমুখি। হয়ত এমন হতে পারে একদিন প্রকৃতির কষাঘাতে আমাদের বাস্তুতন্ত্র হুমকীর সুখে পড়তে পাড়ে। আসুন সবাই মিলেমিশে বসবাস করতে শিখি।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.)