সাতকানিয়ায় ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী, খাবার সংকট নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে মানুষ

62

সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। নতুন করে পানিবৃদ্ধি পাওয়ায় পানিবন্দি লাখো মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বন্যার প্রথম দিন ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী ছিল বলে ধারণা করা হলেও এখন এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ। তারা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাজালিয়া মীরের পাড়ায় শঙ্খনদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধ দিয়ে ঢোকা পানির তীব্রতা কমার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ঘরছাড়া হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু কেরানীহাটের বিভিন্ন ভবন ও আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মাঝে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চালালেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। এ নিয়ে বানভাসি মানুষের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, বর্তমানে সাতকানিয়ার কেওচিয়া, ঢেমশা, বাজালিয়া পুরানগড়, ছদাহা, ঢেমশা, পশ্চিম ঢেমশা, কাঞ্চনা,মাদার্শা, সোনাকানিয়া, নলুয়া, কালিয়াইশ, আমিলাইশ, চরতী ইউনিয়ন ও সাতকানিয়া পৌরসভায় চার লক্ষাধিক মানুষের বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার সব সড়কের উপর দিয়ে কোমর সমান পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বন্ধ হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়া পুরো সাতকানিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল ভোর ছয়টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বাজালিয়া, পুরানগড়, ধর্মপুর, ছাদাহা, কেওচিয়া ও কালিয়াইশ ইউনিয়নের শিশু-নারীসহ অসংখ্য মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কেরানীহাটে ভিড় করছে। কেরানীহাটের বেশ কয়েকটি ভবনে অবস্থান নিয়েছে তারা। তাদের সাথে রয়েছে গবাদি পশুও।
কেওচিয়া ইউনিয়নের সামিয়ার পাড়ার বাসিন্দা নুরুল কবির জানান, ১৯৬১ সালে একবার, ১৯৯৭ সালে ১ বার ও সর্বশেষ ২০১৯ সালে বন্যার এ রূপ দেখা গেছে।
কেরানীহাট মা-শিশু জেনারেল হসপিটালের নির্বাহী চেয়ারম্যান ওসমান আলী জানান, কেওচিয়ার সবকটি গ্রামেই পানি উঠেছে। বাসিন্দারা কোন উপায় না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন। কেওচিয়ার তেমুহনী, কেওচিয়া, খুট্টা পাড়া, বরমিয়ারপাড়া, মুহুরীপাড়া, বাইন্যা পাড়া, মাস্টার বাড়ি, মাইজ পাড়া, সামিয়ার পাড়া, চেয়ারম্যান পাড়া, আব্বাস’র বাড়ি, বুচির পাড়া ও নন্দির বাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের খুবই নাজুক অবস্থা।
কেরানীহাট ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক পরিচালক হামিদুল ইসলাম জানান, কেরানীহাটের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক দোকান খোলা যায়নি। এতে ৩ শতাধিক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাজালিয়া মোটর স্টেশন ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জানান, কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বাজালিয়ার মাহালিয়া রাস্তার মাথায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সড়কের বুড়ির দোকান, দস্তিদারহাট এলাকাতেও সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। সর্বশেষ গত রবিবার বিকাল থেকে কেরানীহাট থেকে শুরু করে অন্তত ৫ কিলোমিটার এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়ে।
চরতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ডা. রেজাউল করিম জানান, চরতীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনিত হয়েছে। বিশেষ করে শঙ্খতীরে বসবাসরত অধিবাসীদের অবস্থা খুবই করুণ। তাদের খাবার নেই, নেই বিশুদ্ধ পানিও।
দ্বীপ চরতীর বাসিন্দা আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন জানান, দ্বীপ চরতীতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক ঘরে পানি উঠায় বাসিন্দারাা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
নলুয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দিদারুল আলম জানান, নলুয়া, মরফলা, মরিচ্যা পাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম বন্যায় তলিয়ে গেছে। বাসিন্দারা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে।
সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ জোবায়ের জানান, ডলুনদীর পানি বাঁধ উপছে লোকালয়ে প্রবেশ করায় পৌরসভার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বন্যা কবলিত হয়েছে। তাদের জন্য চাল ও শুকনো খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, প্রথম পর্যায়ে সাতকানিয়ায় বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি তরফে বরাদ্দ ছিল ১০ মে. টন চাল ও ৪শ প্যাকেট শুকনো খাবার।
গতকাল এ বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ৪৫ মে. টন চাল ও ৩ হাজার ৫শ প্যাকেট শুকনো খাবার। তিনি বলেন, আমরা খবর নিচ্ছি, যেখানে বেশি মানুষ আশ্রয় নিবে, সেখানে তাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
সাতকানিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা সোমবার বানভাসি মানুষদের জন্য রান্না করা খাবার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বার্বুচি আর জালানি সংকটের কারণে হয়নি। তবে নলুয়া, এওচিয়া, কেওচিয়া ও ঢেমশায় শুকনো খাবার বিতরণ করেছি।