সাংবাদিক সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ স্মরণে কিছু কথা

2

ফজলুর রহমান

কারো চির প্রস্থানে কান্নার রোল স্বাভাবিকই বলা চলে। সাংবাদিক সরওয়ার উদ্দিন আহমেদের জীবনাবসানেও তা দেখা গেল। সদ্য মরহুম এই সাংবাদিকের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান কলেজের পশ্চিম প্রান্তে। সূর্যসেন গেইট লাগোয়া। সেখান থেকে থেমে থেমে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। ১২ অক্টোবর সকালে চিরদিনের মতো বের হওয়ার সময় অনেক মানুষের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার চিত্রটা স্বাভাবিকই ছিল। সিকদারঘাটা ঈদগাহ ময়দানের জানাজাস্থলে মরহুম এই সাংবাদিকের শেষ বিদায়ে আগত বিভিন্ন স্তরের বিপুল মানুষের ঢলও ছিল অনুমিত। কিন্তু কবরগাহে গিয়ে অনেকটা অবরহিত হতে হয়।
সেখানে মাটিতে শুইয়ে দেয়ার পর্বে শামিল হন সহকর্মী সাংবাদিক, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে পাড়া-প্রতিবেশী সকলে। একটু গভীরে গিয়ে দেখতেই চোখ পড়ে গেল ভিন্ন ধর্মের লোকজনও সমাগত। মুসলমানরা যখন মোনাজাতে, তারাও তখন তাদের মতো প্রার্থনায়। চোখে জলের ধারা বইয়ে দিয়ে এই যেমন উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র ফটো সাংবাদিক জনাব প্রদীপ শীল। ভেজা গলায় বললেন, “তিনি ছিলেন আমার বাবার মতোন, হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন, ইংরেজি সাংবাদিকতা শেখা তাঁর কাছে। একজন অসা¤প্রদায়িক ও সব দল, মত, ধর্মের নিকট গ্রহনযোগ্য ছিলেন।” এই বাবারূপ থেকে বন্ধুবেশ দেখতে একটু দূরে যাই। একজন বললেন-“এমন মিশুক মানুষ আর হয় না, অবস্থা এমন যে, তিনি আমারও বন্ধু, আমার ছেলেরও বন্ধু।” ফুঁপিয়ে কাঁদছে রাকিব নামের একটি বাচ্চা ছেলেও। মুরুব্বীর স্নেহের মায়ায় জড়িয়ে ফুট-ফরমায়েশে নিয়োজিত ছিল সে, বিশেষকরে ঔষধপত্র আনয়নে। জড়ানো গলায় রাউজানের সিনিয়র সাংবাদিক জনাব জাহেদুল আলম বললেন,‘তিনি অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন, কিন্তু প্রকাশ করে নিজেকে জাহির করতেন না, অহংকার করতেন না, তাঁর থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতাম।” তাঁরা স্বজন নন, তবুও তাদের চোখে তিনি প্রিয়জন।
গত ১১ অক্টোবর রাত ০৮.৪০ মিনিটে যে জীবনের সমাপ্তি সেই জনাব সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে একটু জানি। তিনি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের আলেপ খান সওদাগর বাড়ী বাড়ীতে ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজুল হক একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। মফিজুল হক মায়ানমারের আকিয়াব শহরে, পরবর্তী চট্টগ্রাম শহরে ও বৃদ্ধকালে রাউজান ফকিরহাটে ব্যবসা করতেন এবং ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মফিজুল হকের প্রথম পুত্র জনাব সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ ১৯৬৩ সালে রাউজান আর.আর.এ.সি উচ্চ বিদ্যালয় মাধ্যমিক পরীক্ষায়, ১৯৬৮ সনে এম.ই.এস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স (১ম পর্ব) পাস করেন। কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি লেখালেখি তথা সৃজনশীলতায় মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি Daily Chronicle এবং Daily Unity পত্রিকায় সম্পাদনা সহকারী হিসেবে ৪ বছর নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৮ সনে তদানিন্তন পাকিস্তান সরকারের পর্যটন অধিদপ্তরে সম্পাদনা সহকারী হিসেবে যোগ দেন এবং স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৮৪ সালে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের চাকরী থেকে পদত্যাগ করে পুনরায় লেখালেখির জগতে ফিরে আসেন। তিনি আবারো সাংবাদিক পেশায় যোগ দেন। ১৯৮৫ সনে চট্টগ্রামের দৈনিক নতুন বাংলাদেশ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে ২ বছর কাজ করার পর Daily Life পত্রিকায় সহ-সম্পাদক পরবর্তী বার্তা সম্পাদক হিসেবে মোট ১৪ বছর কাজ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত Financial Express ও The News Today পত্রিকায় ৬ বছর ব্যুরো প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে সাংবাধিক সরোয়ার উদ্দিন ২০০৯ ইং থেকে ২০২৪ The New Nation পত্রিকায় সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার (বার্তা ব্যুরো ইনচার্জ) পদে কর্মরত ছিলেন এবং তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চট্টগ্রামস্থ Daily Commercial Times এর বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সাংবাদিক সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমবায় সমিতি এবং চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব এর সদস্য। তিনি রাউজান প্রেস ক্লাবের সভাপতি পদে ২০২৩ থেকে মৃত্যু অবধি দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও চট্টগ্রাম রিপোর্টাস ফোরাম এবং রাউজান সাংবাদিক পরিষদ, চট্টগ্রাম এর সাধারণ সদস্য।
জীবনে পর্যটন কর্পোরেশনের মতো লোভাতুর জায়গায় সুনামের সাথে কাজ করেছেন কিন্তু সম্পদের পাহাড় গড়ার সুযোগ নেননি। ছোটবেলা থেকে শহরে ছিলেন। এমনকি বছরের পর বছর সপরিবারেও শহরে কিন্তু স্বল্পদামে পেয়েও শহরে একটি আপন ঠিকানা গড়ার কাজ তাকে টানেনি। স্বনামধন্য শিল্পগ্রæপ এ.কে. খানসহ রাউজানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর সাথে আত্নীয়তা ছিল, কিন্তু এসব দাপটের সাথে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তোলার কাজে কোনদিন মন দেননি। তদানীন্তন পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশেন করেছেন, যখন এমন গ্রাজুয়েটই ছিলেন বিরল, তারপরও সার্টিফিকেটের বাহাদুরি, জ্ঞানের প্রদর্শনী তাঁকে দিয়ে হয়নি। সাদাসিধে, সদালাপী, অজাতশত্রু হয়ে পার করেছেন জীবন।
চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকের আইসিইউ পরিণত হয়েছিল জনাব সরওয়ার উদ্দিন আহমেদ এর শেষ শয্যায়। যেখানে সন্তান-সন্ততি ও নিকট আত্নীয়দের সামনে শেষ নি:শ্বাসটুকু ত্যাগ করেন। চারপাশে দোয়া-দরুদ চলছে আর তিনি শেষবারের মতো চোখ খুলে তাকালেন, এরপর গভীর প্রশান্তিতে চোখ বন্ধ করে যেন বিদায় নিলেন। যদিও তাঁর এই প্রস্থান প্রস্তুতি মাস তিনেক আগে অনেকের অজান্তেই শুরু হয়েছি। যখন তাঁর সহধর্মিনী পড়ে গিয়ে শয্যাবন্দী হন। তবে তার আগেই তিনি নিজের কবরের স্থানটি তৈরি করেন। একটি আধভাঙ্গা গাছের বামপাশে ছিল তাঁর পিতার কবর। গাছটির জন্য একটু দূরে ডানদিকে মাতার কবর। সেই গাছটি শেকড়সহ উপড়ে ফেলে তৈরি করে রেখেছিলেন নিজের স্থান। যেন মা-বাবা দুজনের কোলে, মাঝখানের জায়গাটিতেই শুয়ে আছেন বুকের ধন। আরো কিছু ইঙ্গিতবাহী কাজ করে যান। এরমধ্যে ছিল সবার কাছে কথায় কথায় ক্ষমা চাওয়া, নমিনী কিংবা পাওয়ার অব এটর্নি ঠিক করা, ইন্তেকাল পরবর্তী করণীয় বলে যাওয়া ইত্যাদি।
সবাইকে যেতে হয় একদিন। নক্ষত্রেরও মরে যেতে হয় একদিন। কারণ, এই পৃথিবীতে আসার সিরিয়াল আছে, যাওয়ার কোন সিরিয়াল নেই। কিন্তু এভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কজনইবা যেতে পারেন! আল্লাহ পাক তাঁকে বেহেশতের সুন্দরতম জায়গায় রাখুন।

লেখক: উপ-পরিচালক (জনসংযোগ)
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়