শৈশবের অপূর্ণতা ও মাদকাসক্তির অদৃশ্য যোগসূত্র

3

মো. শাহরিয়ার হোসেন (শিমুল)

শৈশব-জীবনের সেই কোমল অধ্যায়, যেখানে মানুষের অনুভূতি, বিশ্বাস আর আত্মপরিচয়ের বীজ বোনা হয়। এই সময়টিই নির্ধারণ করে, মানুষ কতটা আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল কিংবা ভারসাম্যপূর্ণ হবে। কিন্তু যখন একটি শিশু তার বেড়ে ওঠার সময়ে পর্যাপ্ত ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপত্তা পায় না, তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় এক গভীর মানসিক শূন্যতা। এই অদৃশ্য ব্যথা পরবর্তীকালে নানা রূপে প্রকাশ পায়, যার একটি ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে মাদকাসক্তি।
যেসব শিশুর শৈশব কেটেছে অবহেলা, নির্যাতন, অনিশ্চয়তা বা পারিবারিক অশান্তির মধ্যে, তারা প্রায়ই নিজেদের মূল্য নিয়ে সংশয়ে ভোগে। অনেকের মনে জন্ম নেয় স্থায়ী এক অনুভূতি-‘আমি ভালো নই’, ‘আমাকে কেউ চায় না’। এই আত্মঅবিশ্বাস ও মানসিক অপূর্ণতা থেকে মুক্তি খুঁজতে গিয়ে অনেকেই মাদকের মতো বিপজ্জনক আশ্রয়ে ঝুঁকে পড়ে। মাদক তখন তাদের কাছে হয়ে ওঠে এক প্রকার মানসিক ব্যথানাশক-যা সাময়িক শান্তি দেয়, কিন্তু ধীরে ধীরে ভেতরটা নিঃশেষ করে দেয়।
মনোবিজ্ঞানে এই সম্পর্কটি ব্যাখ্যা করা হয় “Adverse Childhood Experiences” বা সংক্ষেপে ACE তত্ত্বে। অসংখ্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যাদের জীবনে ACE স্কোর বেশি, অর্থাৎ যাদের শৈশবের অভিজ্ঞতা বেশি কষ্টদায়ক ও নেতিবাচক, তাদের মধ্যে মাদকাসক্তি, মানসিক রোগ, আত্মবিনাশী আচরণ এমনকি শারীরিক নানা অসুস্থতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ শৈশবের ট্রমা মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে প্রভাব ফেলে-বিশেষ করে আবেগ, নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রগুলিতে।
তবে আশার কথা হলো, সব ট্রমার গল্পই শেষ হয় না মাদক বা আত্মবিনাশে। অনেকেই সময়মতো সহানুভূতি, স্নেহ ও মানসিক সহায়তা পেলে সেই আঘাতকে শক্তিতে রূপ দিতে পারেন। একটি বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক, একজন শিক্ষক বা থেরাপিস্টের সহায়তা, কিংবা কেবল একজন বোঝাপরার মানুষ-এই ছোট ছোট আশ্রয়ই কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা ও নিরাপত্তা-এই তিনটি শব্দই এক অর্থে মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
আমাদের সমাজে মাদকাসক্তিকে প্রায়ই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, অথচ বাস্তবে এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সমস্যা। শৈশবের ব্যথা, অপূর্ণতা ও অবহেলাকে যদি আমরা গুরুত্ব দিই, তবে অনেক আসক্তির গল্প শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দেওয়া সম্ভব। যে শিশুটি ছোটবেলায় ভালোবাসা পায়, সে বড় হয়ে নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়-আর যে নিজেকে ভালোবাসতে শেখে, সে কখনো নিজের জীবন ধ্বংসের পথে হাঁটে না।
শিশুর শৈশব রক্ষা মানে কেবল একটি জীবন নয়, একটি প্রজন্ম রক্ষা করা। কারণ প্রতিটি পূর্ণ মানুষ একদিন ছিল একটি নিরাপদ, ভালোবাসায় ঘেরা শিশু।

লেখক : প্রজেক্ট অফিসার, নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশ মাদকাসক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (বারাকা)