শেখ হাসিনার মৃত্যুদÐ ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ

1

জসিম উদ্দিন মনছুরি

শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গঠিত আওয়ামী লীগ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয়। পরবর্তীতে দলটির নাম হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটানোর উদ্দেশ্যে দলের নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী লীগ’। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের প্রতীকের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সাল থেকে দলটির নির্বাচনি প্রতীক নৌকা।বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়।১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্টে সংঘটিত অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যোষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা দলটির সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করে অদ্যাবধি দায়িত্বরত। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা প্রণয়ন। ১৯৭৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের স্বৈরাশাসক ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসির কারণে অধিকার আদায়ের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আন্দোলন সংগ্রামে নেমে পড়েন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর স্বাধীন বাংলাদেশর অভ্যুদয় হয়।
১৯৭২ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান জয় লাভ করে সরকার গঠন করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রচিত হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়ের। ওইদিন সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পেশকৃত চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন তথা বাকশাল গঠনের পথ উন্মুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিল পাসের সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতিতে পরিণত হন। এক নজিরবিহীন ন্যূনতম সময়ের মধ্যে (মাত্র ১১ মিনিট) চতুর্থ সংশোধনী বিলটি সংসদে গৃহীত হয় এবং তা আইনে পরিণত হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা বা বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়নি। এই বিলের মাধ্যমে প্রশাসন ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন পরিবর্তন সাধন করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান দেশের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধিকারী হন। আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে তিনি এ পদক্ষেপকে তার ‘দ্বিতীয় বিপ্লবে’র সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন। সীমাহীন নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, গুম ও ধর্ষণের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে বিদ্রোহী কিছু সেনা সদস্যের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত বন্ধ হয়ে যায়। উত্থান-পতন পেরিয়ে ১৯৮১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগের একগুঁয়েমি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অর্থপাচার ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সর্বোপরি ক্ষমতাকে এককেন্দ্রিক করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের মাধ্যমে ২০১১ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করেন। দলীয় সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন সম্পন্ন করে বিরোধীদের দমন পীড়নের মধ্য দিয়ে তারা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলকে বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্য ও নিন্দনীয় শাসন ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন হলে তিনি ভারতে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৫০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং মানবতার বিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামীলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে শতশত মামলা হয়। তন্মধ্যে তার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা এসব মামলার মধ্যে ১৩৫টি হত্যার অভিযোগ, ৭টি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংক্রান্ত অভিযোগ, ৬টি হত্যাচেষ্টা এবং ৩টি অপহরণের মামলা রয়েছে।
১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের সাজা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠন করেছিলেন। এই অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম ও স্বচ্ছতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দেয়। আইনের তোয়াক্কা না করে বিচার ব্যবস্থাকে করায়ত্ত করে জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধীদের একের পর এক মৃত্যুদন্ডের রায় দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে সরকারের প্রধান এজেন্ডায় পরিণত হয়: মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার, নির্বাচন ও সংস্কার। বিচার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুর্গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। ৩ সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান করা হয় বিচারপতি গোলাম মর্তজা মজুমদারকে। অবশেষে ১৭ নভেম্বর মানবাধি বিরোধী অপরাধসহ পাঁচটি অভিযোগে অভিযুক্ত করে আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং শেখ হাসিনার বিচারের রায় প্রদান করা হয়। যদিও চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজস্বাক্ষী হওয়ায় তাকে বিচারের রায়ে লঘুদন্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করা হয়। যে পাঁচটি অভিযোগে তাদের বিচার ও সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়: ১. উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান, ২. প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ, ৩. রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা, ৪. রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছয়জনকে গুলি করে হত্যা, ৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা। পাঁচটি অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। যদিও আসাদুজ্জামান খান কামাল ও শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আশ্রয়ে রয়েছেন। এক মাসের মধ্যে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে হবে। অন্যথায় যখনই তারা গ্রেফতার হবেন, গ্রেফতারের পর সাজা কার্যকর করা হবে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসাইন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. খলিলুর রহমান ও ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তা অজিত দোভালের মধ্যে ৩০ মিনিটের আলোচনায় ড.খলিলুর রহমান শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার কথা জানান। যদিও ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত দিবে কিনা তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ভারতের বিরোধীদের মধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য মোদি সরকারের উপর চাপ বাড়ছে। ভারতীয় সংসদে ব্যাপক বাকবিতন্ডার সৃষ্টি হয় শেখ হাসিনাকে নিয়ে। ভারত সরকার ইতোপূর্বে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে অন্যায় ভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছিলো। বলা হয়ে থাকে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে শেখ হাসিনা এতদিন ধরে অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। শেখ হাসিনার মাধ্যমে ভারত ব্যাপক সুবিধা আদায় করেছিলো। ভারত এতদিন ধরে শেখ হাসিনার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নিলেও হাসিনার মৃত্যুদন্ডের পর তাদের সুর কিছুটা হলেও পাল্টেছে। ভারতের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাক গলানোটা তাদের পুরানো স্বভাব।কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারত সরকারের আস্থা রয়েছে। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারত সরকার উভয় সংকটে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের বন্দী বিনিময় চুক্তি থাকলেও শেখ হাসিনাকে বন্দী বিনিময়ের আওতায় তারা ফেরত দিচ্ছে না। এটা চুক্তির সম্পূর্ণ লংঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদি শেখ হাসিনাকেই ফেরত না দেন তবে ইন্টারপোলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার জন্য চেষ্টা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছেন। এখন কথা হচ্ছে হাসিনা বিহীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় দেখার বিষয়। যদিও শেখ পরিবারে শেখ হাসিনা ছাড়া রাজনীতিতে তেমন কেউ উল্লেখযোগ্য নেই। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা এতদিন ধরে রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার সর্বোচ্চ সাজা হওয়ায় এখন আর সে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণও আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন কোন নেতাও নেই যিনি শেখ হাসিনার স্থলাভিষিক্ত হবেন। শেখ পরিবারের শেখ সেলিম, শেখ তাপস গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পালিয়ে রয়েছেন।
এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ সিদ্দিকী যুক্তরাজ্যে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছেন। তাছাড়া সজীব ওয়াজেদ জয় আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করে আমেরিকায় অবস্থান করছে এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও বিদেশের নাগরিক। তাছাড়া শেখ রেহেনা কখনো রাজনীতিতে সরব হননি। আওয়ামী লীগের মধ্যে এমন কোন নেতা নেই যিনি আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করবেন। কিংবা তার নেতৃত্বকে তৃণমূল থেকে শুরু করে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ মেনে নিবেন। তাহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কি বাংলাদেশে এখানেই শেষ? হয়তো সেটা সময়ই বলে দেবে। কারণ রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা কিংবা প্রত্যাবর্তনের তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। ইতোপূর্বে ২০২৫ সালের ১০ মে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে তাদের বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সর্বশেষ ১২ মে ২০২৫ ইসির তালিকা থেকে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। ইসির তালিকা থেকে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারছে না এটা প্রায় নিশ্চিত। অদূর ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা বিহীন আওয়ামী লীগ সংগঠিত হতে পারবে কিনা এটা দেখার বিষয়। যদিও শেখ পরিবারের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়া তেমন কেউ উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো নেই । এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শেখ হাসিনা বিহীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমাপ্তি হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে পরিবারতন্ত্র বাদ দিয়ে যদি নতুন নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে কেউ সুসংগঠিত করে তাহলে সেটা ভিন্ন বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের আগামী দুই যুগের মধ্যে ফিরে আসার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।
২০ নভেম্বর বিচারপতি এবিএম খাইরুল হকের মাধ্যমে বাতিল করা তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমদের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সর্বসম্মতিক্রমে পুনর্বহাল করা হয়েছে। যদিও সেটা আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে কার্যকর হবে। জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল বলেছেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হতে পারে। গণভোটের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় হয়তো আমূল পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দলটির এমন দুর্দশা হবে কেউ ভাবতেও পারেনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন এবং আওয়ামী লীগের কবর রচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। এবার আওয়ামী লীগ বিহীন বাংলাদেশে আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণ কাকে বেছে নেয় সেটা দেখার বিষয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ত্রয়দশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে। ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির ডাকসু থেকে রাকসু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগামী সংসদ নির্বাচনেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে পারে। সেইদিক বিবেচনায় স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫৪ বছরের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অত্যন্ত সুসংগঠিত। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মূলত লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এবার দেখার বিষয় কোন দল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে।
লেখক: গবেষক, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক