শুভ হিজরি নববর্ষ

3

আজ ১ মহরম ১৪৪৬, হিজরি নববর্ষের প্রথম দিন। এ উপলক্ষে দৈনিক পূর্বদেশের পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুদ্ধায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, মোবারকবাদ। হিজরি সন আরবি ভাষাভাষি মানুষের প্রধান পঞ্জিকা হিসেবে ধরা হলেও এর সাথে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে। সংগতকারণে হিজরিসনের আগমন মুসলমানদের প্রাণ-মন উদ্বেলিত হয়, আবারও বিষাদে মন ভারাক্রান্তও হয়। হিজরি সন একদিকে স্মরণ করিয়ে দেয় ইসলামের আলোকোজ্জ্বল দিনগুলোর কথা, অপরদিকে ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে আহলে বায়াতের রক্তাক্ত ত্যাগের এক নির্মম অধ্যায়ের কথা। আলো আর আঁধারের এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মুসলমানরা আজকের হিজরি নববর্ষ উদ্যাপন করবে নানা আয়োজনে, ভাবগম্ভীরে ও উৎসব আনন্দে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলায় হিজরি সন উদযাপন পরিষদ বা বিভিন্ন কমিটির ব্যানারে দিনব্যাপী ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিজরি বর্ষকে বরণ করা হবে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মুসলমানদের নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.), শবে মিরাজ, ঈদুর ফিতর, ঈদুল আযহা ও আশুরাসহ ধর্মীয় বিষয়াবলির জন্য হিজরি সনের হিসাব অপরিহার্য। মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর হিজরতের বছরকে ইসলামি সন গণনার প্রথম বছর ধরা হয়েছে বলে এটি হিজরি সন নামে পরিচিত। হিজরি সন চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষ- উভয় হিসেবে গণনা করা হয়। সৌর হিসাবে ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ দিনে মাস ও ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে বছর ধরা হয়। অপরদিকে চান্দ্র হিসাবে ২৯, ৩০ দিনে মাস ও ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে বছর ধরা হয়। এ হিজরি সন এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যার সাথে জড়িত রয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহম্মদ (সা.) এর প্রিয় জন্মভূমি মক্কা নগরী ত্যাগ করে দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মদিনা শরিফ গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। মহানবি (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ২৭ সফর মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনার (ইয়াসরিব) উদ্দেশ্যে হিজরতের নিয়তে যাত্রা শুরু করেন এবং ২৭ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রি. মোতাবেক ১২ রবিউল আউয়াল মদিনা মুনাওরায় পৌঁছেন। এ ঐতিহাসিক হিজরতকে স্মরণীয় করে রাখার স্মৃতি বহন করে চলেছে হিজরি সন।
ঐতিহাসিকদের মতে, হিজরতের ঘটনাকে স্মরণীয় ও তাৎপর্যমন্ডিত করে রাখার জন্য দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন এবং তাঁর খিলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে হিজরি সন গণনা শুরু করেন। ইসলামের আগমনের পূর্বে সর্বশেষ আবরাহার হস্তিবাহিনী পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে এসে আবাবিল পাখির পাথরবৃষ্টির মাধ্যমে নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়। তৎকালীন আরবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সন গণনা শুরু হয়। তাছাড়া মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর সময়ে ইতোমধ্যে নামকৃত মাসসহ একটি আরবীয় চন্দ্র পঞ্জিকা ছিল। সেই সময় পঞ্জিকার বছর সংখ্যা দ্বারা নির্দেশিত করা হতো। পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমতাবস্থায় একদা হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খলিফা উমর (রা.)-এর নিকট এই মর্মে পত্র প্রেরণ করেন যে, হে আমিরুল মু’মিনিন! আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের নিকট পৌঁছে তাতে দিন, তারিখ, মাস, বছর ইত্যাদি উল্লেখ না থাকায় কোন চিঠি কোন সময়ে পাঠানো তা নিরূপণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। এমতাবস্থায় আপনার নির্দেশ রাজ্যে জারি করতে আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। অতএব, সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সাল গণনার ব্যবস্থা করুন।
হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) এর চিঠি পেয়ে হযরত উমর (রা.) জরুরি পরামর্শ সভা (মজলিসে শুরা) আহŸান করেন যে, অনতিবিলম্বে নামভিত্তিক বছর গণনা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একটি নতুন সংখ্যাভিত্তিক বছর গণনা ব্যবস্থার প্রচলন করে একটি ইসলামি সন-তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। উক্ত পরামর্শ সভায় হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.)সহ শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কিরামসহ হযরত উমর (রা.) এর প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সকলের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে এ সভায় হযরত উমর (রা.) ইসলামি সন তথা হিজরি সন প্রবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ প্রস্তাবনা ছিল হযরত আলী (রা.)এর। তিনিই হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বর্ষ গণনার প্রস্তাব দেন। তারপর তাঁরা সবাই হযরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐক্যমত পোষণ করেন, যা বর্তমানে প্রায় ১৭০ কোটি মুসলমানের কাছে হিজরি সন বলে পরিগণিত।
নবী (স.) এর হিজরতের সন থেকে সন গণনা চূড়ান্ত হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো, হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয় ‘আল ফারকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল’ অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার মাধ্যমে ইসলাম প্রসার লাভ করে, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, মুসলিমদের শক্তিমত্তা বাড়তে থাকে, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, ইসলাম বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হয় এবং ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ।
উপমহাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) কর্তৃক হিজরি সন প্রবর্তিত হওয়ার এক বছর পরই আরব বণিকদের আগমনের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে দেশের বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনার গায়ে লেখা খোদিত শিলালিপিতে আরবি হরফে হিজরি সনের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে, তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বঙ্গ বিজয়ের পর থেকে পরবর্তী ৬ শত বছর মুসলমানদের দৈনন্দিন কাজে সন তারিখ গণনায় প্রথমেই হিজরি সন ব্যবহার করা হতো। তার পরে বাংলা ইংরেজিকে উল্লেখ করা হতো।