শীতের আগেই বিষাক্ত চট্টগ্রামের বাতাস

15

আসাদুজ্জামান রিপন

সন্ধ্যা নামলে শহরকে আলতো করে ঢেকে দেয় কুয়াশার নরম চাদর। শীতল পরশে ¯িœগ্ধ হাওয়ায় শহর দেখা, রাজপথ মাড়িয়ে সৌন্দর্য্য উপভোগ করা। নগরজীবনে যন্ত্রের চলা জীবনে একটু স্বস্তি ফেরে শীতে। শীতের ¯িœগ্ধ বাতাস প্রবাহের আগে শহরের বায়ুতে বিষাক্ত কণার প্রবাহ বেড়েছে।
চট্টগ্রামের বাতাসে দূষিত বস্তুকণার মাত্রা এতটাই বেড়েছে যে তা এখন খুবই অস্বাস্থ্যকর এমনি উদ্বেগজনক। শীতের সৌন্দর্যের উপভোগের বদলে বেড়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিবেশবিদরা বলছেন, নভেম্বরের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়া, আবহাওয়া শুষ্ক থাকা আর জলবায়ু পরির্বতনের কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে। শীতের মাত্রা যত বাড়বে দূষিত বায়ুর মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দৈনিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) এর মতে, নভেম্বর মাসের প্রথম ১০ দিনের ৬ দিনই খুবই অস্বাস্থ্যকর ছিল চট্টগ্রামের বায়ু। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সবচেয়ে খারাপ ছিল চট্টগ্রামের বায়ু।
পরিবেশ অধিদপ্তর বিএআরএম ক্যামসের তথ্যমতে, গত শুক্রবার আইকিউএয়ারে চট্টগ্রামের গড় বায়ুমান ছিল ২১৩। যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডে খুবই অস্বাস্থ্যকর। এর আগের দিন, বৃহস্পতিবার আইকিউএয়ারে বায়ুর মান ২১৩, এরপরের তিনদিনও বাতাসের মান ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, একিউআই স্কোর ১০০ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য। একইভাবে একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে খুবই অস্বাস্থ্যকর। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। ৩০১ থেকে ৪০০ একিউআই স্কোরকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বাসিন্দাদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণে তাৎক্ষণিক শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ দেখা দেয়। যেমন যাদের হাঁচি-কাশি-হাঁপানি আছে, তা বেড়ে যায়। অ্যালার্জি, ফাঙ্গাল ইনফেকশন জাতীয় রোগ, ফুসফুসের প্রদাহ, নিউমোনিয়া ও য²া বাড়ে। অতিক্ষুদ্র কণা সহজেই মানুষের চোখ-নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশ করে রক্তের সাথে মিশে যায়, যা ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনি লিভারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জটিল অঙ্গকে আক্রান্ত করে থাকে। বায়ু দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য। গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি, শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বায়ু দূষণের কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যৌন ও চর্ম রোগ বিভাগের ডা. ইসরাত জাহান বলেন, শীতকালে বায়ু দ‚ষণের পরিমাণ যখন বেশি থাকে তখন নিউমোনিয়া ও সিওপিডি রোগী অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এ সময় মানুষের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। অ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্টও বেড়ে যায়। এছাড়াও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গর্ভবতী মায়েরা অক্সিজেন কম পান, ফলে কম ওজনের শিশু জন্ম নেয়। বায়ু দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ফুসফুসে ক্যান্সারও হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক সোনিয়া সোলতানা বলেন, শীতের শুরুতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে। এসময় বৃষ্টির পরিমাণ কমে যায়। ফলে বায়ু দূষণের পরিমাণ বেড়ে যায়। এছাড়া, সিটি কর্পোরেশন উন্মুক্তভাবে ময়লা স্তুপ করে। আবার, শীতে নির্মাণ কাজ বেড়ে যায়। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া তো রয়েছে। এসব কারণে বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ছে।
তিনি আরো বলেন, বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মনিটরিং রয়েছে। প্রকল্প ছাড়পত্রের সময় শর্ত দিয়েছে। দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করছি। শিল্প এলাকায় সব প্রতিষ্ঠান মনিটরিংয়ের আওতায় রয়েছে। স্বল্প জনবল দিয়ে দূষণ মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছি। যেসব এলাকায় বায়ুদূষণ বাড়ছে সেখানে এলাকা ভিত্তিক ভাগ করে মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, এবার শীত আসার আগেই বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ বৃষ্টি না হওয়া। গতবছর নভেম্বরের শুরুতেও কিন্তু বৃষ্টি হয়েছিল, এবার তা হয়নি। এছাড়া, ফিটনেসবিহীন যানাবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা, ছোট ছোট নির্মাণ কাজের জন্য বায়ুদূষণ বাড়ছে। এ বছর শহরের মধ্যে বড় কোনো নির্মাণ প্রকল্প না থাকা সত্তে¡ও বায়ু দূষণ বৃদ্ধি পাওয়াও চিন্তার বিষয়।
তিনি আরো বলেন, বায়ুদূষণ কমাতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ডিজেল চালিত যানবাহনের পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত যানবাহন নিয়ে আসলে শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। এ বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।