শহরের ফুলের দোকানে ‘নতুন অতিথি’-শাপলা কলি

4

আবু মোশাররফ রাসেল

আবহমান বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যে এখন হেমন্তকাল। হেমন্তের সকাল মানেই বাংলার প্রকৃতিতে এক নিঃশব্দ রূপান্তরের দৃশ্যপট। বর্ষার শেষে শরৎ-হেমন্তে দেশের স্থির জলাভূমি, ডোবা, জলাশয়ে ধীরে ধীরে পানি কমতে থাকে আর সেখানে ফুটে থাকা ‘শাপলা’ ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে স্থানীয় শিশু-কিশোররা। তারা আনন্দ-আমোদ করে শাপলার তাজা ডাটা খেয়ে নেয় আর আঁটি বেঁধে বাজারে নিয়ে যায়। মানুষজন সেগুলো কিনে নিয়ে যায়-পুষ্টিকর শাক-সবজি হিসেবে অথবা সালাদ হিসেবে খেতে। শহরের কাঁচাবাজারে কোনো কোনো দোকানে অক্টোবরের শেষের দিকে বা নভেম্বরের শুরুতে শাপলার ডাটা বিক্রি হতে দেখা যেতো। তবে শাপলার ডাটা বা শাপলা কলি কখনোই ফুলের দোকানগুলোতে বিক্রি হতে দেখা যায়নি স্মরণকালের মধ্যে। এবার নতুন দৃশ্যপটের দেখা মিলেছে চট্টগ্রাম মহানগরীতে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ফুলের দোকানগুলোতে স্থান করে নিয়েছে- ‘শাপলা কলি’। বড় ঝুঁড়ি বা বালতিতে পরিপাটি করে রাখা হচ্ছে ডাটাসহ শাপলা ফুল কিংবা শাপলা কলি।
ব্যাপারটি কাকতালীয় হতে পারে কিংবা স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ধারার অংশও হতে পারে। কাকতালীয় বলছি; এ কারণে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা’ ফুল বরাদ্দ চেয়েছিল। কিন্তু জাতীয় প্রতীক হওয়ায় এবং তালিকায় না থাকায় নির্বাচন কমিশন তাদের দাবি অগ্রাহ্য করে আসছিল। এ নিয়ে টানা ৪ মাস টানাপোড়েনের পর গত ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন এনসিপিকে শাপলা ফুলের পরিবর্তে প্রতীক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ বরাদ্দ দেয়। এনসিপির প্রতীক হওয়ার পর শহরের ফুলের দোকানিদের কাছে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা চাহিদার যোগান দিতে সেটির কদর বেড়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ের ফুলের দোকানগুলো সবসময় বিকিকিনিতে জমজমাট থাকে। গত ১০-১৫ দিন ধরে সেখানকার কয়েকটি দোকানের সামনে বিভিন্ন ধরনের তাজা-কাঁচা ফুলের পাশাপাশি একটি বড় বালতিতে পরিপাটি করে ‘শাপলা কলি’ সাজিয়ে রাখতে দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার বিকালে সেখানকার বিক্রয়কর্মীর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘দোকানে বিগত বছরগুলোতে কোনো সময় শাপলা ফুল আনা হয়নি। এবার এনসিপি’র প্রতীক হিসেবে শাপলা আলোচনায় আসার পর মাঝে মাঝে কিছু তরুণ এই ফুল খুঁজতে এসেছিল। সে কারণে দোকানের মালিক পটিয়া থেকে এক লোকের মাধ্যমে শাপলা কলি বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন। এগুলো আমরা শ’ হিসেবে কিনে নিই, পিস হিসেবে বিক্রি করি।’ দাম কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলোর নির্ধারিত কোনো দাম নেই, বিক্রির ওপর হিসাব। কেউ এক পিস নিতে চাইলে ১০ টাকা, এক সাথে বেশি নিতে চাইলে কমিয়ে রাখি।’ চাহিদা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও চাহিদা খুব বেশি নেই, তবুও আমরা নতুন একটি ফুল হিসেবে রাখছি, সামনে হয়তো চাহিদা বাড়বে।’
নগরীর চেরাগী মোড় ছাড়াও চকবাজার তেলিপট্টি মোড়, জিইসি মোড়, নিউ মার্কেট এলাকার ফুলের দোকানগুলোতেও শাপলা কলি দেখা গেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘আলোচনায় উঠে আসায় এবং মৌসুমের ফুল হওয়ায় তারা দোকানে রাখছেন নতুন জিনিস হিসেবে। দোকানে শাপলা কলি রাখার বিষয়টি হয়তো এখনও প্রচারও পায়নি, তাই চাহিদা নেই। সামনের দিনগুলোতে হয়তো বাড়তে পারে।’
গ্রামীণ জনপদের বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের বর্ণনা মতে, শাপলা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত জলজ ফুলÑএটি স্থির বা ধীরগতির পানিতে জন্মে এবং নির্দিষ্ট ঋতুভেদে পরিপূর্ণতা পায়। বাংলার জলাভূমির প্রকৃতিতে শাপলা ফুলের জীবনচক্র এক অনন্য সৌন্দর্যের গল্প। বর্ষার পানি নেমে এলে বিলঝিল, ডোবা ও পুকুরের শান্ত জলরাশিতে শাপলার জন্ম হয়। কাদামাটির গভীরে শেকড় গেড়ে পানির পৃষ্ঠে ভেসে থাকে সবুজ বড় পাতাগুলো, আর তাদের মাঝেই ক্রমে ফুটে ওঠে রঙিন শাপলা। বর্ষা থেকেই শাপলার প্রকৃত মৌসুম শুরু। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফুল ও কলি দুটোই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পরিপূর্ণ হয়। শরতের খানিকটা মিষ্টি আলো, ভোরের হিমেল হাওয়া আর পানির স্থিরতাÑসব মিলিয়ে এ সময় শাপলা সবচেয়ে সুন্দর ও টাটকা থাকে। হেমন্তের দিকে জলাশয়ের পানি ধীরে ধীরে কমে আসে। বিলঝিলের বুক সংকুচিত হতে থাকে, শাপলার ঝোঁপগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। এই সময়েই গ্রামবাংলার শিশু-কিশোরদের আনাগোনা বাড়ে। ভোরের আলো ফুটতেই তারা দল বেঁধে নেমে পড়ে অগভীর পানিতে। কারো হাতে লম্বা বাঁশ, কারো কোমরে গামছা বাঁধা-তারা একে একে তুলতে থাকে গোলগাল শাপলা কলি। দুপুরের পর তারা স্থানীয় হাটবাজারে গিয়ে টাটকা শাপলা বিক্রি করে-কেউ কিনে নেয় তরকারি-শাক-সবজি হিসেবে, কেউ ভর্তা, কেউবা অতিথি আপ্যায়নের সালাদের জন্যে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানেও শাপলা ডাটার উপকারিতা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শাপলা ডাটা খাওয়ার উপকারিতা অনেক। কারণ এটি ক্যালসিয়াম, আঁশ এবং ভিটামিনের একটি চমৎকার উৎস। এটি হাড় ও দাঁত মজবুত করে, হজমে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। এছাড়াও এতে থাকা গ্যালিক অ্যাসিড ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং অ্যাসিডিটি ও আমাশয়ের মতো রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
শহরের ফুলের দোকানগুলোতে ‘শাপলা কলি’ স্থান করে নিয়েছেÑএ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ইমন সৈয়দ পূর্বদেশকে বলেন, ‘শাপলা ফুল বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের আপামর জনগণের নিজস্ব ঐতিহ্য। বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতীক হিসেবে যে আবেদন সেটির মধ্য দিয়ে শাপলা রাজনৈতিক পরিসরে, সামাজিক পরিসরে আলোচনায় চলে এসেছে। যদিও আমরা নানা কারণে শেষ পর্যন্ত সরাসরি শাপলা প্রতীক পাইনি, পেয়েছি শাপলা কলি; সেটি বরাদ্দের পর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন স্তরের এটা নিয়ে বেশ উচ্চবাচ্য-আশা-আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। ওই জায়গা থেকে সাধারণ মানুষও শাপলা কলির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ-আগ্রহ বোধ করছেন, সে কারণে দোকানিরা হয়তো এটা নিয়ে এসেছেন, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক ব্যাপার। আমাদের দলের প্রতীক মানুষ যে নিজস্ব পরিসরে ব্যবহার করছেন এটা খুব চমৎকার একটি ব্যাপার।’
একই ধরনের প্রশ্নে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত¡াবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফ পূর্বদেশকে বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এ দেশে ভোট এবং দলীয় প্রতীক নিয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা, উচ্চবাচ্য ছিল না। আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী অনেক উপাদান নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অথচ সেসব নিয়ে কোনো আলোচনা ছিল না। এখন যেটি হচ্ছে তাকে আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি ফল হিসেবে দেখি, মানুষ তাদের ঐতিহ্যের দিকে ফিরছে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছে। এনসিপির প্রতীক শাপলা কলির প্রতিও সামাজিক পরিসরে, জনপরিসরে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, এই আগ্রহের একটি প্রতিফলন বা প্রভাব আমরা আগামী নির্বাচনে ব্যালটেও দেখতে পাবো।’