আলমগীর মোহাম্মদ
গতকাল ২৫ নভেম্বর ছিল সেই ব্যতিক্রমী, দ্রোহী এবং একই সঙ্গে রোমান্টিক কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। যিনি তার অদম্য জীবনবোধ, অকপট স্বীকারোক্তি এবং স্বকীয় কাব্যভাষা দিয়ে বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশের পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের মধ্যে যারা বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার শিখরে নিয়ে গেছেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর কবিতা একদিকে যেমন জীবন ও প্রকৃতির প্রতি তীব্র ভালোবাসা প্রকাশ করে, তেমনই অন্যদিকে সমাজের স্থিতাবস্থা ভাঙার এক তীক্ষণ দ্রোহ বহন করে। তাঁর সাহিত্যসত্ত্বা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি এবং বাংলা সাহিত্যের এক ‘বিদ্রোহী প্রেমিক’।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৫ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের জয়নগরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ার কারণে তাঁর জীবন দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়। এই কঠিন জীবনসংগ্রামই তাঁকে পরবর্তীকালে সমাজের মূল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। জীবনের প্রথাগত ছকে তিনি কখনও নিজেকে বাঁধতে পারেননি। ছাত্রাবস্থায় মার্কসবাদের প্রতি আকর্ষণ এবং অল্প বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া- এ সবই তাঁর মননে দ্রোহের বীজ বপন করেছিল। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শে থিতু হননি, বরং কবিতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর একমাত্র আশ্রয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলা সাহিত্যে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটে তাঁর স্নাতক পাঠ অসমাপ্ত থেকে যায়। এই অসম্পূর্ণতা, অনিশ্চয়তা এবং দারিদ্র্য- এগুলিই যেন তাঁর কবিতায় এক ধরনের ক্ষোভ, অস্থিরতা এবং গভীর আত্মজিজ্ঞাসা হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর প্রথম কবিতা ‘যম’ প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় (১৯৫৬)। এরপর ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় থেকেই তিনি বাংলা কাব্যজগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন। তাঁর কাব্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি প্রচলিত গদ্যশৈলী ও অলঙ্কার ভেঙে দিয়ে এক সরল, অথচ গভীর উপলব্ধির ভাষা নির্মাণ করেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যসত্ত্বার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাঁর ‘বিদ্রোহী’ পরিচয়টি। এই বিদ্রোহ কেবল সমাজের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল কবিতার স্থবিরতা এবং সে সময়ের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-রীতির বিরুদ্ধেও। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে, মলয় রায় চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এই চারজনের হাত ধরে শুরু হয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত আন্দোলন ‘হাংরি আন্দোলন’। এই আন্দোলন শিল্পের প্রচলিত মূল্যবোধ ও নীতিকে আঘাত করে এক চরম নৈরাজ্যবাদী ও জীবনবাদী শিল্পধারা তৈরি করতে চেয়েছিল। শক্তি এই আন্দোলনের প্রথম পর্বের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন। “বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন।” তবে, মতান্তরের কারণে তিনি ১৯৬৩ সালে এই আন্দোলন ত্যাগ করেন এবং ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে ফিরে আসেন। যদিও হাংরি আন্দোলনের উন্মত্ততা তাঁর কবিতায় স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করেছিল, তবু তাঁর সাহিত্যসত্ত্বায় দ্রোহের সেই প্রাথমিক সুরটি আমৃত্যু বজায় ছিল। তাঁর কবিতা যেন এক বাঁধনহারা জীবনযাপনের ভাষ্য, যেখানে ‘যা খুশি করি’-এই মনোভাবটি এক শিল্পিত রূপ পেয়েছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যভাষার মূল বৈশিষ্ট্য হলো-সহজ স্বীকারোক্তি, তীব্র রোমান্টিকতা ও গভীর নৈঃশব্দ্যবোধ। তাঁর কবিতা পাঠ করলে পাঠক যেন কবির ভেতরের দ্বিধাগ্রস্ত, অস্থির অথচ প্রেমিক মানুষটিকে অনুভব করতে পারে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ (১৯৬১) থেকেই এই দ্বিবিধ সুরটি সুস্পষ্ট। একদিকে প্রেমের তীব্র আর্তি, অন্যদিকে সেই প্রেম না পাওয়ার হাহাকার এবং তার থেকে সৃষ্ট নৈঃশব্দ্য। প্রকৃতি তাঁর কবিতায় এসেছে ছায়া ও আশ্রয় হয়ে। জীবনের রুক্ষতা থেকে মুক্তি পেতে কবি বারবার প্রকৃতির কোলে ফিরে গেছেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’ (১৯৬৯) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রকৃতির নিসর্গের মধ্যে তিনি জীবনের জটিলতার উত্তর খুঁজেছেন।
শক্তির কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর তীব্র আত্মজিজ্ঞাসা। এই জিজ্ঞাসা যেন প্রতিটি পাঠকের ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসায় রূপান্তরিত হয়। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ (১৯৮২) কবিতাটি এই আত্মজিজ্ঞাসারই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এখানে গন্তব্যের চেয়ে থমকে দাঁড়ানোর কারণটিই প্রধান। কবিতাটি যেন এক অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন-জীবনের পথে হাঁটার চেয়ে, থেমে গিয়ে নিজের ভেতরের শূন্যতা ও আকাক্সক্ষাকে অনুভব করাই কবির কাছে বেশি জরুরি। পাশাপাশি, তাঁর কবিতায় রয়েছে এক ধরনের আত্মসমর্পণের সুরও, যা দ্রোহের বিপরীতধর্মী। ‘প্রভু, নষ্ট হয়ে যাই’ কাব্যগ্রন্থের এই পঙ্ক্তিটি যেন তাঁর ভেতরের অসহায়, অস্থির মানুষটির মুক্তি খোঁজার আকুতি। প্রচলিত নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং জীবনের সমস্ত ত্রæটি ও নষ্টামি নিয়ে এক মহাজাগতিক শক্তির কাছে নিজের ভুলগুলো সঁপে দেওয়া-এটাই যেন কবির আকুতি। তাঁর কাব্যভাষা কৃত্রিমতা বিবর্জিত। সহজ, প্রাত্যহিক জীবনের শব্দ ও বাক্যবন্ধকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে তা পাঠককে সরাসরি স্পর্শ করে। যেমন: “অবনী, বাড়ি আছো?” এই সরল বাক্যটি একটি সাধারণ আহŸান হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর শূন্যতা, এক তীব্র অপেক্ষার যন্ত্রণা। এক অনিশ্চিত ঠিকানায় পৌঁছানোর চেষ্টা, যা পাঠককে এক মুহূর্তে নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে দেয়।
কবি হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায় যতটা পরিচিত, ঔপন্যাসিক হিসেবেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কবিতায় যেমন তিনি নিজেকে মেলে ধরেছেন, তেমনি উপন্যাসগুলোতেও ফুটিয়ে তুলেছেন মধ্যবিত্ত জীবনের জটিলতা, হতাশা এবং সমাজের অসঙ্গতি। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কুয়োতলা’ (১৯৬১)। এছাড়াও ‘দাঁড়াবার জায়গা’ এবং ‘রূপচাঁদ পক্ষী’ ছদ্মনামে লেখা ফিচার ও কলামগুলো পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তাঁর উপন্যাসগুলি সাধারণত এক অস্থির জীবনের গল্প বলে, যেখানে চরিত্রেরা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ এবং সর্বদা এক নতুন গন্তব্যের খোঁজে। তিনি ফরাসি সাহিত্য থেকেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন স্বাদ এনেছে। উল্লেখ্য, তিনি পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত ‘ছেঁড়া তমসুক’ (১৯৭৪) চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’-এর জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকার বাংলা কবিতায় এক নতুন কণ্ঠস্বর হিসেবে চিরকাল বিদ্যমান থাকবে। তাঁর কবিতা আমাদের শেখায়- জীবন কেবল নিয়ম মেনে চলার নাম নয়, বরং জীবনের সব দ্বিধা, প্রেম, বিদ্রোহ ও নৈঃশব্দ্যকে অকপটে মেনে নেওয়ার সাহস। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন জীবনানন্দ দাশের পথ ধরেই হেঁটেছেন, কিন্তু পথ চলার সময় নিজের মতো করে এক নতুন ভাষা তৈরি করেছেন- যে ভাষা একইসঙ্গে গভীর, সরল এবং স্বকীয় শক্তিতে ভরপুর। বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজ আজও তাঁকে স্মরণ করে এক ‘শক্তিমান কবি’ হিসেবে, যিনি জীবনের সমস্ত ভুল, নষ্টামি ও ব্যর্থতাকে কবিতার মহৎ শিল্পে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন।











