নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১৮ সালে ভয়াবহ দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা-গ্রেপ্তারের ‘রক্তচক্ষু উপেক্ষা’ করে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) সংসদীয় আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন সিকদার। রাজনৈতিক চরম ‘সংকটকালে’ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি দলের প্রার্থী হয়ে রাউজানে দলের সাংগঠনিক ‘অস্তিত্ব রক্ষা’র চেষ্টা করেন, দলের রাজনীতি সচল রাখেন। সেই নির্বাচনে দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে জসিম সিকদারের জন্য কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে তৈরি হয়েছে আরেক ‘সংকট’। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলের বিবদমান দুটি পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত-খুনোখুনি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দেড় বছরে রাউজানে অন্তত ১৮টি খুন হয়েছেন, যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক কারণে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন নানমুখী বিরোধ তুঙ্গে। স্থানীয়দের ভাষায় ‘রউজান এখন রাজনীতির নামে যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে।
ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ১০টিতে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও রাউজানে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হয়নি। দলীয় সূত্র বলছে, দলীয় বিরোধের কারণেই এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় নতুন করে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন ‘সংকটকালের প্রার্থী’ জসিম উদ্দিন সিকদার।
দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের বিবদমান বিরোধ মিটিয়ে ধানের শীষের জয় নিশ্চিত করতে হলে ‘নির্ঝঞ্ঝাট নেতাকে’ প্রার্থী করা দরকার। তাহলে তার নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। সেই আলোচনায় আবারও সংকটকালের প্রার্থী জসিম সিকদারকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা।
জসিম উদ্দিন সিকদার ইতোমধ্যে রাউজানে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে আমাকে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ আছে। সাধারণ মানুষ দলের মধ্যে কোনো বিরোধ চায় না, তারা এলাকায় সংঘাত-সংঘর্ষ চায় না, তারা শান্তি চায়। সে জন্য তারা আমাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইছেন। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আমি দলের কথা ভেবে প্রার্থী হয়েছিলাম। এখনো দলের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে মাঠে নামতে প্রস্তুত আছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, ‘২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তৎকালীন সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নের কারণে বিএনপি থেকে যখন রাউজান আসনে কেউ প্রার্থী হতে চাইছিল না, তখনই দলের সিদ্ধান্তে এগিয়ে এসে নির্বাচনে অংশ নেন মো. জসিম উদ্দিন সিকদার। চারদিকে তখন নীরব আতঙ্ক, গ্রেপ্তারের ভয়, মামলার বোঝা-সবকিছু উপেক্ষা করে তিনি দলের সংকটময় সেই মুহূর্তে রাজপথে দাঁড়ান, প্রার্থী হন এবং দীর্ঘদিন ধরে রাউজানের বিএনপির রাজনীতিকে সচল রাখেন। আমি মনে করি বর্তমানে রাউজানে দলের মধ্যে যে বিভেদ-বিভাজন তৈরি হয়েছে তা থেকে মুক্ত হতে চাইলে জসিম সিকদারকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত।’
বর্তমানে আসনে দুইজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে ঘিরে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাদের সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই কোনো না কোনো দ্ব›দ্ব, হামলা-সংঘর্ষ, খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ পরিস্থিতি দিনে দিনে অশান্ত এলাকায় পরিণত করছে রাউজানকে। এই প্রেক্ষাপটে শান্তিপূর্ণ ও পরিশীলিত নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবারও সামনে আসছেন মো. জসিম উদ্দিন সিকদার।
রাউজানের নোয়াজিষপুরের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম পূর্বদেশকে বলেন, ‘রাউজানে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ঝামেলায় প্রতিদিনই নতুন দাঙ্গা বাঁধছে। আমরা সাধারণ মানুষ আতঙ্কে আছি। জসিম সিকদার শান্ত স্বভাবের মানুষ, সবার সঙ্গে মিশে থাকেন। তাকে চাই কারণ তিনি এসব ঝামেলায় নেই।’
রাউজানের নোয়াপাড়া এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব জাহেদুল হক বলেন, ‘রাজনীতি মানে মারামারি না। জসিম উদ্দিন সিকদার বহু কষ্টের সময় দলকে আগলে রেখেছেন। তার মতো শান্ত স্বভাবের প্রার্থী হলে রাউজানে স্থিতি ফিরবে।’
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মতে, সংগঠনের ভেতরেও বর্তমানে ‘নির্ঝঞ্ঝাট প্রার্থী’ হিসেবে জসিম সিকদারের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
জসিম সিকদারের চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা : জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে মো. জসিম উদ্দিন সিকদারের পথচলা শুরু হয়েছিল আশির দশকের গোড়ায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেই সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব, ত্যাগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ রেখে তিনি রাউজান থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে জায়গা করে নেন।
১৯৮১ সালে রাউজান থানা (বর্তমান উপজেলা) ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। একই সময়ে তিনি থানার গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য হন; যা তার রাজনৈতিক সূচনার প্রথম আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব। এর পরের বছর ১৯৮২ সালে রাউজান কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতিকে আরও সুসংগঠিত করেন।
সংগঠনের প্রতি তার নিষ্ঠা ও সক্ষমতা তাকে দ্রুতই জেলা পর্যায়ে তুলে আনে। ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হন তিনি। এরপর দীর্ঘদিনের মাঠের কাজ, নেতৃত্ব আর সাংগঠনিক শক্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালের সম্মেলনে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি রাউজানসহ পুরো উত্তর জেলায় জাতীয়তাবাদী ছাত্ররাজনীতিকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করে তোলেন।
রাজনৈতিক পরিসরে তার বিস্তৃতি আরও বড় হয় ১৯৯৬ সালে, যখন তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন (শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি-সোহেল কমিটি)। ছাত্ররাজনীতিতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি মূল দল বিএনপির নেতৃত্বে যুক্ত হন।
১৯৯৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে সংগঠনকে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মাঠের রাজনীতিতে তার ধারাবাহিক সক্রিয়তা তাকে তৃণমূলে সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য নেতায় পরিণত করেছে।
দলের মনোনয়নে ২০০৮ সালে তিনি উপজেলা নির্বাচনে এবং ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির জাতীয় সংসদ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। বিশেষত ২০১৮ সালে রাজনৈতিক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যখন কেউ প্রার্থী হতে সাহস করেনি, তখন দলের প্রতি আনুগত্য থেকে তিনি মনোনয়ন নিয়ে রাস্তায় নামেন-যা তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
এরই মধ্যে তিনি বহু রাজনৈতিক নির্যাতন, হয়রানি ও মামলার মুখোমুখি হন। তার বিরুদ্ধে অনেক রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয়।
মনোনয়ন প্রত্যাশার বিষয়ে জসিম উদ্দিন সিকদার পূর্বদেশকে বলেন, ‘দল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে তবে অবশ্যই আমি নির্বাচন করব কিন্তু আমার প্রধান লক্ষ্য হলো রাউজানের মানুষকে শান্তি ফিরিয়ে দেওয়া। এখানে প্রতিদিন যেভাবে সংঘর্ষ হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আমি রাজনীতি করি মানুষের কল্যাণের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আমি দলের কথা ভেবে প্রার্থী হয়েছিলাম। এখনো দলের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে মাঠে নামতে প্রস্তুত আছি।’










