যে শহরে শিক্ষার্থীদের সম্মানের চোখে দেখা হয়

1

বিপ্লব বড়ুয়া

শিক্ষানগরী খ্যাত ময়মনসিংহ ঐতিহ্য পরম্পরা শান্ত সমৃদ্ধময় দেশের একটি অন্যতম প্রাচীন শহর। আজ থেকে তিন/চার’শ বছর আগে ময়মনসিংহ শহর ও আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলায় একসময় অসংখ্য জমিদার পরিবার বাস করতেন। তার ছাপ এখনো বিদ্যমান। ময়মনসিংহের মূল শহরে প্রবেশ করলে সেই ইতিহাসের টের পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাস যে কতো সমৃদ্ধ ময়মনসিংহ তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই শহরে শিক্ষার জন্য রয়েছে অসংখ্য খ্যাতনামা স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। খোলামেলা পরিবেশে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে ময়মনসিংহের রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। এই শহরে বসাবাসকৃত সমাজের উঁচু শ্রেণী ও নিচু শ্রেণী সকলের কাছে শিক্ষার্থীদেরকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। চলতে ফিরতে যত মানুষের সাথে কথা হয়েছে, অনেকের কথামালায় তা স্পষ্ট ফুটে ওঠেছে। যে বিষয়টি দেশের অন্যকোন অঞ্চলে দেখতে পায়নি। এ এক অভাবনীয় দৃষ্টিভঙ্গি। অটো চালক, টং দোকানের মালিক এবং সরকারি চাকরিজীবির মুখ থেকে সে কথার সত্যতা খুঁজে পেয়েছি। ময়মনসিংহ শহরে অটোই একমাত্র ভরসা। অটো দিয়ে সবখানে যাওয়া যায়। একটি শহরকে শিক্ষাবান্ধব করতে হলে শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে দায়বদ্ধ থাকবে তা কিন্তু সঠিক নয়, এলাকার মানুষদেরও এগিয়ে আসা নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একেকটি জনপদকে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে উন্নত করার প্রধান সূতিকাগার।
২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তি ইউনিটের অধীনে এই শহরের প্রকৌশল বিদ্যার উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় জাঁকজমকপূর্ণ চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ ও অভিভাবক সমাবেশ। কলেজ কর্তৃপক্ষ নবাগত শিক্ষার্থীদের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে বরণ করতে দেখে সত্যিই প্রীতি অনুভব করেছি। এরি সাথে চোখে পড়লো অসংখ্য অভিভাবকের সরব উপস্থিতি। সেদিন ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের আনন্দঘন উপস্থিতি পর্যবেক্ষণে মনেহলো এটি অন্যরকম এক মিলনমেলা। এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর তিন বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। বিষয়গুলো হলো- ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (সিই)। প্রতিটি বিভাগে ৬০জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে পুরনো বিভাগ হচ্ছে ইইই বিভাগ। সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানাযায়, অত্র প্রতিষ্ঠানের ইইই বিভাগ থেকে এই পর্যন্ত ৫০০ জন শিক্ষার্থী ডিগ্রী অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে একশ’রও বেশি শিক্ষার্থী ইউরোপের বিভিন্ন নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশীপের পেয়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেছে। বাকীরা উচ্চ শিক্ষা সমাপনান্তে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। ইইই বিভাগের এলামনাই এসোসিয়েশনের সিনিয়র নেতৃবৃন্দরা জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সামগ্রীক পরামর্শ, সাহায্য-সহযোগিতা করে চলেছেন যা প্রশংসার দাবী রাখে।
শিক্ষার্থী-অভিভাবক এই নতুন সবুজ সমৃদ্ধ ক্যাম্পাস পেয়ে একে অপরের পরিচয় নিতে নিতে আলিঙ্গনে মেতে উঠেন। শিক্ষার্থীরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন শিক্ষা অর্জনের জন্য। আমি নিজেও এই ক্যাম্পাসে প্রথম। তুলনামূলক ছোট পরিসর হলেও একাডেমিক ভবন, বিভাগ ভবন, লাইব্রেরি ভবন, ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা হোষ্টেলের ডিজাইন ও বিল্ডিং কন্সট্রাকশন নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে। ক্যাম্পাসের অপরপার্শ্বে বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা। ক্যাম্পাস জুড়ে বর্ণিল আলপনা, সবুজের সমারোহ সেইসাথে নানা প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ অন্যরকম সৌন্দর্য্যে পরিণত করেছে। অনেককে এই চোখের সৌন্দর্য্যকে ছবির ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে দেখা যায়। সন্তানের কারণে এমন একটি কোলাহলমুক্ত সবুজময় ক্যাম্পাস দর্শন করতে পেরে নিজেকে গর্ব অনুভব করছি।
এই স্বল্প সময়ে কত অজানা-অচেনা মানুষদের সাথে পরিচয়ে মনেহলো তারা আমার কতকালের চিরচেনা! সে এক অন্যরকম অনুভূতি! অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে নবীন বরণের মঞ্চে কথা বলার পর পরবর্তি ঘণ্টাদুয়েক নাম না জানা অসংখ্য অভিভাবকদের সাথে জমিয়ে আড্ডা মারার দৃশ্যপট বহু বছর স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই আড্ডার মধ্যে দিয়ে মনে পড়ে গেল সেই ত্রিশ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুখময় স্মৃতির কথা।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানের পর অধ্যক্ষ মহোদয় তাঁর একান্ত ইচ্ছায় অভিভাবকদের সাথে গোলটেবিল বৈঠকে পুনরায় সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়ে অভিভাবকদের কথা শোনেন এবং প্রতিটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান স্যার ও ইইই বিভাগের প্রধান প্রফেসর এস. এম. আনোয়ারুল হক স্যারের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ে মিলিত হয়ে ক্ষণিক গল্প-কথোপকথনে অনেক কিছু জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সবশেষে, যে কথা বলতে হয় ময়মনসিংহ আমার কাছে অপরিচিত একটি শহর। জীবনের ৫৫টি বছর পার করে দিয়েছি কিন্তু ময়মনসিংহকে এক নজরে দেখার সেই সৌভাগ্য হয়নি। চট্টগ্রাম থেকে এই প্রথম আমার ময়মনসিংহ যাত্রা। এই অজানা অচেনা শহরের প্রকৌশল বিদ্যার উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করানো থেকে শুরু করে, যাতায়ত, খাবার-দাবার ও আবাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থেকে টেনশন ফ্রি রেখেছেন স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অফ ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ চট্টগ্রামের সভাপতি প্রতিষ্ঠানের শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র স্বপ্নিল চৌধুরী ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বিশাল হালদার। তাদের উভয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক