যুগের নাকি মানুষের পরিবর্তন

1

অ্যাড. সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

যুগের পরিবর্তন বলতে সময়ের সাথে মানুষের জীবনধারা, আচরণ এবং সামাজিক রীতিনীতির ব্যাপক পরিবর্তনকে বুঝায়। ঐতিহাসিকরা যুগকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন-প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। যে কোনো বিষয়ে আমরা যুগকে দোষারোপ করি। আমরা কথায় কথায় যুগের পরিবর্তন হয়েছে বলি। যুগের নাকি মানুষের পরিবর্তন এই নিয়ে চলে বিতর্ক। তাই এ বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। প্রস্তুর যুগে মানুষ পাথর ব্যবহার করতো। প্রগিতিহাসিক যুগে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। আদিম যুগে মানূষ বিবস্ত্র ও বর্বর ছিল, সভ্য ছিল না। পরবর্তীতে মানুষ শিক্ষার আলো পেয়ে সভ্য হলো। ইতিহাসে দেখা যায়, কালের বিবর্তনে মানুষের সভ্যতা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে।
অতীত মানুষে মানুষে সৌহাদ্য, সম্প্রীতি, মমত্ববোধ ছিল। এখন মানুষ পশুত্ব ও হিংস্র রূপ ধারণ করেছে। পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া প্রতিবেশির মাঝে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি ভাব বজায় ছিল। এখন কেউ কারো সাহায্যে এগিয়ে আসে না। এখন মানুষ ভীষণ স্বার্থপর হয়ে উঠায় হানাহানি, জিঘাংসা, হিংসায় মেতে উঠেছে। পত্রিকা পাতা খুললে দেখা যায়, স্বার্থের দ্বন্দ্বে অন্ধ হয়ে পুত্র পিতা বা মাতাকে, পিতা বা মাতা পুত্র বা কন্যাকে, ভাই ভাই বা বোনকে, স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে খুন করতে দ্বিধা করছে না। প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন হচ্ছে। আজ মানবতা বিপন্ন। দিন দিন আমরা বর্বর হয়ে উঠছি। এখন আন্তরিকতার চেয়ে লৌকিকতা বেশি। তখন দাম্পত্যজীবন সুখ আর শান্তির। এখন পারিবারিক কলহ, সন্দেহ ও অশান্তির কারণে দাম্পত্যজীবনে ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ, পরকীয়া, মামলা, হামলা, খুনের ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। অতীতে প্রেম, ভালোবাসা ছিল অনুভূতিপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ। এখন স্বার্থ ছাড়া প্রকৃত প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা হয় না। তখন সকলের চাহিদা ছিল সীমিত বর্তমানে মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের মাঝে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সবাই এখন দৌড়ের ওপর আছে, যেন দম ফেলার সময় নেই। আমরা ক্রমে অধৈর্য্য হয়ে পড়েছি। যেকোনো উপায়ে সোনার হরিণ পেতে চাই। সন্তান বাড়ি, গাড়ির মালিক হলেও সেখানে পিতামাতার স্থান হয় না। তাদের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। আদব, কায়দা, সন্মান, শ্রদ্ধাবোধ, বিনয়, কৃতজ্ঞতা এখন নির্বাসনে। সৎ উপদেশ, পরামর্শ কেউ শুনতে চায় না। সমাজে সৎ লোকের চেয়ে অসৎ লোকের মূল্য বেশি। অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও কালোটাকার মালিকরা সমাজে বা রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সমাজের সৎ ও গুণীজনরা নীরব থাকে।
একদা গ্রাম বাংলায় শীতের জোৎস্না রাতে বাড়ির উঠানে সকলে মিলে হাডুডু, কানামাছি, কাবাড়ি গ্রামীণ খেলাধূলা হতো। স্কুল, কলেজ বন্ধের দিনে ভাইবোন, সহপাঠি, বন্ধুবান্ধব মিলে ক্যারাম, লুডু, দাবা ও তাস ইত্যাদি ঘরোয়া খেলাগুলো হতো। শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ ছুটির পর বিকেলে মাঠে বা বিলে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন খেলতো। পুকুরে বা খালে সাতার কাটতো। পুকুরে জাল ফেলে মৎস্য আহরণ, বর্ষাকালে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা হতো। কিন্ত এসব এখন যেন সোনালী অতীত। শিশু কিশোরদের মাঝে আগের মতো দুরন্তপনা বলতে নেই। শারীরিক কসরত নেই। তারা এখন অলস প্রকৃতির হয়ে ইন্টারনেটের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। একেক শিশু কিশোর রোবটে পরিণত হয়েছে। অতীতে দেখেছি প্রতিটি মুসলিম পরিবারে প্রতিদিন প্রত্যুষে পবিত্র কুরআনের বাণী শুনা যেত। সনাতন ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বাড়িতে বা মন্দিরে পূজা অর্চনা করলেও ফেসবুক, ইউটিউব, ডিশ ও টুইটারের ব্যাপক প্রবাহে এখন সে চিত্র আর দেখা যায় না। শহরে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও কারো সাথে পরিচয় নেই।
শহরের জীবনযাত্রা থেকে গ্রামীণ জীবনযাত্রা ছিল অনেক সুখের। বিশেষ করে গ্রাম বাংলায় শীতকালে প্রতিদিন প্রভাতে মেয়েরা শিউলি ফুল কুড়িয়ে মালা গাথতো। গ্রামে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু ছিল। প্রতিটি ঘরে ছিল আমন ধানের মৌ মৌ গন্ধ। শীতের সকালে বাড়ির আঙ্গিনায় গাছের খেজুর রস দিয়ে ভাপা পিঠা, চিতল পিঠা, পুলি পিঠার আয়োজন। হালে আধুনিকতার ছোয়ায় এসব কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। পিঠা পুলি এখন ব্যাক ডেটেড, তাই তার পরিবতে ফাস্টফুড, পিৎজা, হটডগ, দোসা, বার্গারে তৃপ্তির টেকুর তুলি। মধুমাসে বাড়ির আঙ্গিনায় আম কুড়ানো ছিল মধুর আনন্দ। ভোরবেলায় কৃষকরা লাঙ্গল আর গরু নিয়ে মাঠে চাষ করতো। বিজ্ঞানের সুবাধে আজ লাঙ্গল আর গরুর স্থান দখল করেছে ট্রাকটর। অতীতে কাস্তে দিয়ে ধান কাটা হলেও এখন ধান কাটা হচ্ছে মেশিনে। পালকি, হারিকেন, চেরাগ, কুপি এসবকিছু যাদুঘরে স্থান নিয়েছে অনেক আগে। ভাওয়াইয়া, লোকগীতি, পল্লীগীতি, আঞ্চলিক গান, পালা গান, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি বিলুপ্ত হয়ে দখল করেছে ডিজে, র‌্যাপ, ডিসকো ইত্যাদি গান। পালা, পার্বন, উৎসব আগের মতো দেখা যায় না। বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মাসে প্রতিটি গ্রামে বৈশাখী মেলা, লোক কাহিনী, যাত্রা অনুষ্ঠান হলেও কালের গহবরে তা হারিয়ে গিয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে বিদেশী অপসংস্কৃতি আমদানি করছি। আধুনিকতার নামে চলছে অশ্লীলতা। আধুনিকতার ছোয়ায় আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি বিলুপ্তে পথে। কিচ্ছা, গল্প, কাহিনী এখন আর রাতের বেলায় হয় না। আগের জামানায় মায়েরা শিশুদের দুধ খাওয়াতে ছড়া বা রূপকথার গল্প শুনানো হতো, কিন্তু ডিজিটাল জামানায় শিশুদের এখন ছড়া বা রূপকথার পরিবর্তে কার্টুন লাগে। নারীদের শাড়ি বিলুপ্ত হয়ে এখন সেলোয়ার, কামিজ, ম্যক্সি, শার্ট, প্যান্ট। আমরা এখন পাশ্চাত্য ঢঙে চলতে চাই। পরিবার পরিজন সবাই রাতে বিটিভিতে নাটক, সিনেমা, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতো। অনলাইনের যুগে এখন নতুন প্রজন্ম পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাময়িকী, বই, পুস্তক আগ্রহী নয়। এখনকার মতো দামিদামি খেলনা তখনকারদিনে ছিল না। রেডিও, গ্রামোফোন, টেপরেকোর্ডার এখন যাদুঘরে স্থান হয়েছে সেই কবে। সেল ফোন গিলেছে ক্যামরা, ঘড়ি, টর্চলাইট, ক্যালকুলেটার, নোটবুক, ক্যালেন্ডার। ছাটা, পাটি, মাদুরের পরিবর্তে খাট, লেপ, তোষক। কুড়েঘর, মাটির ঘর বিলুপ্ত হয়ে এখন সেখানে গড়ে উঠেছে ইট, পাথরের সুরম্য অট্টালিকা, দালান, পাকাঘর। দস্তরখানা থেকে খাবার উঠেছে ডাইনিং টেবিলে।
অতীতকালে শিশু কিশোর, যুবকরা ভোরে ঘুম থেকে উঠতো। এখন নতুন প্রজন্ম হয়েছে রাতাজাগা পাখি, তারা সারারাত ব্যাপী ইন্টারনেটে ব্যস্ত সময় পার করে আর দিনে নিদ্রা যায়। পাঠশালায় এখন আর বিদ্যা অর্জন হয় না, সেখানে এখন রাজনীতি আর অস্ত্রের ঝনঝনানির চর্চা হয়। ছাত্র নমঃ অধ্যয়ন তপ হলেও এখন শিক্ষার্থীরা অধ্যয়নের পরিবর্তে রাজনীতি বা বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত। যুব সমাজ মাদকের করাল গ্রাসে পতিত। তখন মানুষ অপরাধ করতো গোপনে বা রাতের আধারে আর এখন তা হয় প্রকাশ্যে দিবালোকে। আগের যুগের মানুষ নিয়ম মাফিক খাওয়া দাওয়া, নিদ্রা যেতো ফলে তারা নিরোগ ও দীর্ঘজীবী ছিল। এখন হাল যুগে অধিকাংশ মানুষ হৃদরোগ, ডায়াবেটিক, রক্তচাপ, কিডনী, ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে। তখন মানুষ বিশুদ্ধ খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করেছে। এখন ভেজাল, নকল খাবার খেয়ে কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কবিরাজি বা ঔষধি গাছের চিকিৎসা, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিদায় নিয়ে আধুনিক চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা চলছে। এক সময় পুকুর চুরি হলেও এখন সাগর, মহাসাগর চুরি হয়। আগে দুর্নীতি হলেও এখন মেগা দুর্নীতি হয়। নারী ধর্ষণ শিশু বলৎকার হচ্ছে অহরহ। তথাকথিত ইসলামিক স্কলার বা বক্তাদের বিভিন্ন লাগমহীন কথাবার্তায় মুসলিম স¤প্রদায়ে হানাহানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা ফেসবুক, ইউটিউবে সবসময় সরব। আসলে প্রকৃত অর্থে যুগের পরিবর্তন হয়নি, মানুষের পরিবর্তন হয়েছে। যুগ কখনো পরিবর্তন হয় না।

লেখক : কলামিস্ট, গবেষক