মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

3

গত শুক্রবার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর শনিবারও কয়েকদফা মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এরমধ্যে শুক্রবার সকালে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পন বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে গেছে আমাদের। মাঝারি আকারের ভূমিকম্প ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ভয়াবহ তান্ডব সৃষ্টি করেছে তাতে পুরো দেশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এ ভূমিকম্পে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের বহুতল ভবনে থাকা মানুষজন চরম ঝুঁকি অনুভব করছেন। ঢাকা ও নরসিংদীর ক্ষয়ক্ষতিতে অনুমান করা যায়, ৬-৭ স্কেলে ভূমিকম্প নিয়ে এতোদিন বিশেষজ্ঞরা যে ভবিষ্যৎ বাণী করে আসছিলেন ক্ষতি তার চেয়ে আরো বেমি হতে পারে। যেখানে সামান্য কম্পনে অনেক ভবন হেলে পড়েছে, মাটির ফাটল ধরেছে, ১০ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, সেখানে আরো বড় ভূমিকম্পে কি ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। ইতোমধ্যে ভূমিকম্পের আতঙ্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে আগমী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জগন্নাথও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বিশেষজ্ঞরা আগামী ২০ দিনের মধ্যে আরো বেশ কয়েকটি ভু-কম্পন হতে পারে বলে অনুমাস করছেন। এ অবস্থায় সরকার, সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষ ও জনগণের প্রস্তুতি কী, করণীয় কী? এ নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হলে উদ্ধার তৎপরতার প্রথম সারিতে থাকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসন বা উপজেলা প্রশাসন। প্রশ্ন উঠছে সম্ভাব্য বিপর্যয় মোকাবিলায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কতটুকু? শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছেন, এই বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। ভূমিকম্প-সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি জয়েন্ট মিটিং করা হবে এবং করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হবে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সর্বোচ্চ কাজ করার কথা জানিয়েছে রাজউক।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, তাদের অভিজ্ঞ জনবল এবং যন্ত্রপাতি রয়েছে। তবে সক্ষমতা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে তারা। তবে ভূমিকম্পে বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি হলে বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। সম্মিলিতভাবে সব প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।
জানা গেছে, রাজধানীতে সাড়ে ২১ লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজ একত্রে করতে হবে ফায়ার সার্ভিসকে। কেননা, ভবনে থাকা গ্যাসের লাইন ফেটে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। রাজধানীতে ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন রয়েছে মাত্র ১৮টি। এসব স্টেশনে যে জনবল ও যন্ত্রপাতি রয়েছে তা দিয়ে একযোগে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি ধসে পড়া ভবনে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে। আর ভবন ধসে সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে ফায়ার সার্ভিসের চলাচলের সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে দেশবাসীর মাঝে মহা এক বিপর্যয়ের মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামেও ঠিক একই অবস্থা। কিন্তু দুর্যোগের যে আভাস তাতে দ্রæত উদ্ধার প্রস্তুতি না থাকলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া নাগরিক সচেতনতা, ধর্মীয় অনুশাসন পারে এ জাতীয় দুর্যোগ থেকে মুক্তি দিতে। কারণ আমরা জানি, কমবেশি সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে একটু আধটু পূর্বভাস দেয়ার সুযোগ থাকলেও একমাত্র ভূমিকম্প নিয়ে কোন পূর্বাভাস এ যাবৎ কোন দেশ দিতে পারেনি, বিজ্ঞানও এক্ষেত্রে ব্যর্থ বলা যায়। মহান সৃষ্টিকর্তায় একমাত্র জানেন কখন কোথায় কোন দেশে ভূমিকম্প হবে। পবিত্র কুরআনে অবশ্যই মানুষের কর্মফলের পরিণতি হিসেবে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ রয়েছে। মূলত, মানুষ যখন পাপাচার, অসত্য, অন্যায় ও জুলুম-নির্যাতনে লিপ্ত হয়ে পড়ে তখন তাদের সতর্ক করার জন্য মহান আল্লাহ নিদর্শন স্বরূপ ভূমিকম্পের মাধ্যমে করুণ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আমাদের দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম দেশ। এখানে ধর্ম চর্চা হয় বেশি, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্মের অনুশাসন মানা হয় খুব কম। মুখে ধর্মের জিকির চললেও বাস্তব জীবনে তার কোন প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। এ অবস্থায় ¯্রষ্টার অসন্তোষ প্রকাশ পায় ভূমিকম্পের মত নানা দুর্যোগের মাধ্যমে। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী? এককথায় আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা। ধর্মের অনুশাসনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভালোবাস, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতা। প্রকৃতির বিনাশে নিরাকার স্রষ্টা রাগান্বিত হবেন-এটিই বাস্তব। আল্লাহ জমিন দিয়েছেন ফসল ফলানোর জন্য, শস্যদানা দিয়েছেন মানুষের জীবন নির্বাহের জন্য, সবুজ বৃক্ষ দিয়েছেন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য আর পাহাড় দিয়েছেন পৃথিবীর স্থায়িত্বের জন্য। আর এ সবকিছুই শুধু মানব জাতির জন্যই সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা এসব কিছুই সুরক্ষা করছিনা। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের পিছু ছাড়ছেনা। আমরা মনে করি, ভূমিকম্পের মত দুর্যোগ মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। এছাড়া সরকারকে যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফায়ার সার্ভিস ডিফেন্সকে আরো শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগত উন্নত করতে হবে। বাড়াতে হবে জনবল ও স্টেশনের সংখ্যা।