মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ‘জীবন নদীর উজানে’

1

গোলাম কিবরিয়া ভূইয়া

শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের পরিচয় দেবার প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি ছিলেন পল্লীগীতি,ভাটিয়ালী গানের সম্রাট। তার সন্তানদের মধ্যে বিচারপতি মুস্তাফা কামাল,সঙ্গীত শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও ফেরদৌসী রহমান দেশের বিশিষ্টজন ও শিল্পী হিসেবে পরিচিত। মোস্তফা জামান আব্বাসী আজীবন ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতি সহ লোকগানের একনিষ্ঠ একজন শিল্পী ছিলেন। বাঙলাদেশের বিভিন্ন ছায়াছবিতে কন্ঠ দিয়েছেন। তার ছোট বোন ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন বহুবার।
তার আত্মজীবনী ‘জীবন নদীর উজানে’ ইতোমধ্যেই কয়েকবার মুদ্রিত হয়েছে। গ্রন্থটির শেষে সংযোজিত হয়েছে বেশ কিছু আলোকচিত্র যা তার শিল্পী জীবনের নানা পর্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করেছে। কুচবিহারের বলরামে জন্ম গ্রহণ করা এই শিল্পী শৈশব কৈশোরকে কখনো ভুলেননি। গ্রন্হের শুরুতে লিখেছেন- সবাই আঁকতে চায় একটিবার তার জীবনের একটি ছবি। সব মানুষ ই তাই চায়।…নদীর সব বাক ই যেমন মনরোম নয় তেমনি জীবন ও নয় শুধু ফুল ফুটানো। এই গ্রহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রয়েছে সঙ্গীত সাধনার নানা অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের বর্ণনা। ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন আব্বাসী। তাই স্মৃতি বলতে গিয়ে বারবার ইতিহাস থেকে উদাহরণ টেনেছেন। সাহিত্যের প্রতি ছিল দুর্বলতা। ভাষা ও বর্ণনার কুশলতার ছাপ রয়েছে প্রতিটি উপাখ্যানে।
মোস্তফা জামান আব্বাসী ছিলেন মনেপ্রাণে সুফিবাদে নিবিষ্ট একজন শিল্পী। জালাল উদ্দীন রুমীর সুফী দর্শন তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে বারবার। দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা দরগাহ গুলোর প্রতি তার ব্যাক্তিগত শ্রদ্ধা প্রকাশ করে নানা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। সূফীবাদে এই শিল্পী এতটাই নিবিষ্ট ছিলেন যে তার জীবনের বহু ঘটনাকে তিনি সূফীতত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। দেশ বিদেশের বহু সঙ্গীত সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন আব্বাসী। আমেরিকার এক মসজিদে জুম্মা পড়ার অভিজ্ঞতা লিখেছেন – অনেক মসজিদে খোৎবা শুনেছি।প্রতি শুক্রবার এদের দেওয়া যে খুৎবা শুনেছি তা মনে থাকবে।
জীবনের সাথে সম্পৃক্ত, জীবনের ওঠানামা, জীবনের লোভ লালসা কাটিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সত্যিকার সম্পর্ক স্থাপনের খুৎবা। মুসলমান হিসেবে জীবনাচারণ করার খুৎবা। (পৃ-২৪২) একই ভাবে তিনি সঙ্গীত সম্পর্কিত নানা অভিজ্ঞতা লিখেছেন। তার অভিজ্ঞতা লিখেছেন- মহীসুরে, মাদ্রাজে, বানগালোরে, ১৯৮০ সালে কোলকাতায় রবীন্দ্র সদন ১৯৮০ যে ভারতীয় শিলপমেলায় আমার সঙ্গে ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানীতে ১৯৮৮,পাকিস্তানে ১৯৯০-৯১ সনে, বোস্টনে নজরুল গীতি সম্মেলনে, ওয়াইহো বিশববিদ্যালয়ে ১৯৯৩ সালে ারংরঃরহম ংপযড়ষধৎ। ম্যারিল্যান্ড স্টেটে অনারারী সিটিজেন শীপ। পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভূট্টো তার গানের বিমুগ্ধ শ্রোতা। এই কথাগুলো তিনি লিখেছেন শিল্পী নিয়াজ মুহাম্মদ চৌধুরী সম্পর্কে (৩০৪ পৃ)। অর্থাৎ আব্বাসী দেশের বিশিষ্টদের এভাবেই মূল্যায়ন করেছেন তার গ্রন্থে।
শিল্পী মুস্তাফা জামান লিখিত এই আত্মজীবনীতে তিনি ১৯৪৭ পূর্ব কুচবিহার স্মৃতি ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা জীবন অত্যন্ত সাবলীল গদ্যে বর্ণনা করেছেন। বাঙলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনুধাবনে এই আত্মজীবনীটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলা যায়।