মিরসরাইয়ে ডাকাতি ‘ঠেকাতে’ রাত জেগে পাহারা

1

এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই

বিয়ে বাড়ি। কনে বিদায়ের রাত। সময় রাত ৩টা। প্রবাসী আবদুল মান্নানের বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে মান্নানের বাড়িতে আসা বেশিরভাগ অতিথি সন্ধ্যার পর বিদায় নিলেও কয়েকজন রাতে ছিলেন। পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন কয়েকরাত ঠিকমতো ঘুমাতে না পারায় ঘটনার রাতে সবাই ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে পুরুষরা সামনের বাড়িতে ছিলেন। ঘরে নারীরা অবস্থান করেন। এরই মধ্যেই মান্নানের দ্বিতল ঘরের সদর দরজার তালা ভেঙে ৮-১০ জনের সংঘবদ্ধ ডাকাতদল ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর পরিবারের সদস্য ও অতিথিদের বেঁধে রেখে তাদের সঙ্গে থাকা ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার ও ঘরে থাকা ১ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। গত ২২ নভেম্বর উপজেলার ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীশ্বরাই গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।
শুধু ওই দিনই নয়, এভাবে উপজেলায় গত ৪ মাসে ১২টি ডাকাতি ও ৩০ টিরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতদল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাতের আঁধারে কোথাও না কোথাও হানা দিয়ে চলছে। তবে ডাকাতি ও চুরির শিকার বেশির ভাগই প্রবাসী পরিবার। একের পর এক এমন ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার প্রায় ৬ লক্ষাধিক মানুষ।
জানা যায়, রাত নামলেই আতঙ্কে থাকেন মিরসরাইবাসী। উপজেলায় ব্যাপকহারে চুরি ও ডাকাতির এমন বাড়ন্ত পরিস্থিতিতে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে উপজেলাবাসীর। কখনো কখনো দিনের বেলায়ও চুরির ঘটনার খবর পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে। চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চক্রগুলো আইনের আওতায় না আসায় এসব বাড়ছে। গত কয়েক মাস ধরে অপরাধের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কোনোভাবেই চুরি, ডাকাতি থামানো যাচ্ছে না। রাতের আঁধারে কোথাও না কোথাও চুরি বা ডাকাতির খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।
এদিকে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ বাজারে বাজারে, গ্রামে গ্রামে চুরি, ডাকাতি বন্ধে জনসচেতনতামূলক সভাও করেছেন; তাতেও সুফল মিলছে না। কিছু কিছু গ্রামে গ্রামবাসী রাত জেগে পাহারা বসিয়েছেন, বিভিন্ন ইউনিয়নে সড়ক বাতি লাগানো হয়েছে স্থানীয় ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। উপজেলার হিঙ্গুলী, খৈয়াছড়া, ইছাখালী, জোরারগঞ্জ, দুর্গাপুর ইউনিয়ন, মিরসরাই সদর ও মিরসরাই পৌরসভায় বেশি চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। চোর ও ডাকাতের দল বসতঘরে ডাকাতি, সিঁদেল চুরি, গরু চুরি, মসজিদের দানবক্স চুরি, দোকানপাটে চুরি, পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি, প্রাইভেটকারে করে গরু চুরি, মোটরসাইকেল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে বাঁধা দিলে আহত করছে ডাকাতদল। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এসব ঘটনায় গত ৪ মাসে জোরারগঞ্জ থানায় ৪টি ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার ও কিছু ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপরদিকে মিরসরাই থানায় মামলা হয়েছে ১টি।
বসতঘরে চুরি, ডাকাতির পাশাপাশি বেড়েছে পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরিও। উপজেলায় এপর্যন্ত ৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েকটি ট্রান্সফরমার চুরির চেষ্টা করে চোরের দল। এতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, দুশ্চিন্তায় রয়েছেন গ্রাহকরা। সর্বশেষ ২৪ নভেম্বর ভোরে জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মস্তাননগর শাহকালা (রহ.) মাজার সংলগ্ন শহিদ স’মিলে ৩টি ট্রান্সফরমার বিদ্যুতের খুঁটি থেকে খুলে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনসাধারণের ধাওয়ায় পালিয়ে যায় চোরের দল।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম আদনান আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘রাতের আঁধারে উপজেলা সদরের আমবাড়িয়া গ্রাম থেকে ১টি এবং দুর্গাপুর ইউনিয়ন থেকে দুইটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। প্রতিটি ট্রান্সফরমারের মূল্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ টাকা। এসব ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পর গ্রাহকরাই এর টাকা তুলে দিতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রতিটি এলাকায় ট্রান্সফরমারগুলো পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে’।
তিনি আরো বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও মিরসরাই থানার ওসিকে এবিষয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন’।
চুরি, ডাকাতি বন্ধে উপজেলার ১৬ নম্বর সাহেরখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ডোমখালী গ্রামের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিলফুল ফুজুল যুব সংঘ ও স্থানীয় জনসাধারনের উদ্যোগে মাস্টার কবির আহমেদ সড়ক ও আরকাঠি বাড়ি সড়কে ১০টি সোলার স্ট্রিট লাইট লাগানো হয়েছে। অপরদিকে ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শিকারপুর গ্রামে শিকারপুর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিকারপুর যুব সংঘের উদ্যোগে চুরি, ডাকাতিরোধে সড়কে ১৬টি লাইট লাগানোর পাশাপাশি রাতজেগে পাহারা দিচ্ছেন। এছাড়াও ১২ নম্বর খৈয়াছড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নিজতালুক কানু ফকির সড়কে যুবসমাজের উদ্যোগে ৫০টি সড়কবাতি লাগানো হয়েছে। এভাবে উপজেলার বিভিন্ন সড়কে সড়ক বাতি লাগানো হচ্ছে।
এবিষয়ে হিলফুল ফুজুল যুব সংঘের সাধারণ সম্পাদক মুসলিম উদ্দীন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মিরসরাইয়ে চুরি, ডাকাতি বেড়ে গেছে। তাই স্থানীয় জনসাধারণ ও আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে চুরি, ডাকাতি বন্ধে মাস্টার কবির আহমেদ সড়ক ও আরকাঠি বাড়ি সড়কে ১০টি সোলার স্ট্রিট লাইট লাগিয়েছি। এখন কিছুটা হলেও শঙ্কা মুক্ত হয়েছি বলে মনে করছি’।
চুরি, ডাকাতি বন্ধে শিকারপুর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং শিকারপুর যুব সংঘের উদ্যোগে সড়কে ১৬টি লাইট লাগানো হয়েছে। সংগঠনগুলোর সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ বাদশা বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমাদের ইউনিয়নের একটি বিয়ে বাড়িতেও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। চুরি, ডাকাতি থেকে রক্ষা পেতে দুইটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে সড়কে লাইট লাগানোর পাশাপাশি আমরা রাতজেগে পাহারার ব্যবস্থাও করেছি। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরো লাইট লাগানো হবে’।
গ্রামে একের পর এক চুরি, ডাকাতির ঘটনায় গ্রামের যুবসমাজের উদ্যোগে বিভিন্ন গ্রামে রাত জেগে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। তেমনই একটি উপজেলার হিঙ্গুলী ইউনিয়নের আজমনগর। প্রতিরাতে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে লাঠি হাতে পাহারায় বসেন যুবকরা। গ্রামটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যুবকরা অংশ নেন। মাঝেমধ্যে পুলিশের টহলদলের সদস্যরাও তাদের সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন।
এই উদ্যোগের অন্যতম সাজ্জাদুল হক সোহাগ বলেন, ‘চুরি, ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় রাত জেগে প্রতি রাতে ৩০-৪০ জনের ৫-৭ টি গ্রæপ করে গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ আগস্ট ও অক্টোবর মাসে আমাদের এলাকায় একে একে ৪ টি বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও পাহারা শুরুর পর থেকে আর ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি’।
উপজেলার বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি হলেও মিঠানালা ও মঘাদিয়া ইউনিয়নের মধ্যস্থলের সাধুরবাজারের আশপাশের কয়েকটি গ্রামে এখনো কোনো চুরি, ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ভবিষ্যতেও যেন না ঘটে সেজন্য দলমত নির্বিশেষে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসীর উদ্যোগে মতবিনিময় সভা ২৪ নভেম্বর রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এবিষয়ে আদর্শ গ্রাম শেখটোলা সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জামশেদ আলম চৌধুরী তপু বলেন, ‘সম্প্রতি মিরসরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় আশঙ্কাজনকহারে চুরি, ডাকাতি বেড়েই চলছে। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ঘটছে এসব ঘটনা। চরম আতঙ্কে রাত পার করছে এখানকার সাধারণ মানুষ। তাই আমরা দলমত নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি। এতে রাতে পাহারা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। আমরা সাধুরবাজার কেন্দ্রীক পার্শ্ববর্তী ৫টি ওয়ার্ডে কয়েকটি টিম করে পাহারা দিবো’।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী, বাংলাদেশ সরকারের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাড. সাইফুর রহমান গত ২০ নভেম্বর মিরসরাই থানা পুলিশের সাথে জামায়াতের নেতৃস্থানীয় নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এবিষয়ে তিনি বলেন, ‘ পুলিশের যদি জনবল সংকট থাকে পুলিশকে সহযোগিতার জন্য যদি জনবল লাগে প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের সংগঠনের ভাইয়েরা সহযোগিতা করতে রাজি আছে। আমরা বর্তমানে যেভাবে অপরাধ কর্মকান্ড চলছে এভাবে মিরসরাইয়ে আর কোনো অপরাধ দেখতে চাই না। পুলিশ অনেক কাজ করেছে তা সত্য কিন্তু ক্রমবর্ধমান যে চুরি, ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে এটা বন্ধের কার্যকর পদক্ষেপ তাদের নিতে হবে। প্রশাসন আন্তরিক হলে এসব বন্ধ করা সম্ভব। মিরসরাইবাসী আজ উদ্বিগ্ন। তাই মিরসরাইকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চুরি ও ডাকাতি মুক্ত করতে হবে। চোর, ডাকাতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স শো করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন আন্তরিক হলে আমি আশা করছি আগামি ১ সপ্তাহের মধ্যে মিরসরাইয়ে শান্তি ফিরে আসবে’।
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম আবদুল হালিম বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে টহল আরো বাড়িয়েছি। এলাকার মানুষকে আরো সচেতন করার চেষ্টা করতেছি। বিভিন্ন এলাকায় পাহারা চলছে’।
তিনি আরো বলেন, ‘ডাকাত দল শহর থেকে এসে ডাকাতির পর আবার সরে পড়েন। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে চুরি, ডাকাতি ও মহাসড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে’।
মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘আমাদের আগে ৩-৪টি টিম ছিল বর্তমানে ১০টি টিম কাজ করছে। সরকারি দুইটি গাড়ির মধ্যে ১টি নষ্ট সেটি মেরামতে উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা রাতে ঘুমাই না। সারারাত কাজ করছি। কয়েকজন পুলিশ থানায় থাকে বাকিরা থানা এলাকায় মানুষের জানমাল রক্ষায় নেমে পড়েন। ইতোপূর্বে আমি পাড়া মহল্লায়, বাজারে বাজারে গিয়ে মানুষজনকে সচেতন করেছি, মতবিনিময় করেছি। আমাদের কিছু জনবল সংকট রয়েছে সেক্ষেত্রে আমরা ২০ জন চেয়েছিলাম ৫ জন পেয়েছি। আমরা কাজ করছি, আশা করছি ভালো কিছু হবে’।