মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য

2

মালয়েশিয়ার সরকার প্রধান আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফরে সবচেয়ে অর্জন দেশটির শ্রমবাজারে আবারও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার ঘোষণা। মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি শ্রম বিনিয়োগ করে আসছে মালয়েশিয়ায়। কিন্তু নানা কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অনেকটা রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের জন্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এজেন্সিগুলোর অনিয়ম ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দিতে পারেন নি প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক। যা দুদেশের জন্য ভাবমুর্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসে ওই ১৮ হাজার শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত শুক্রবার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তিনি। গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এটি ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দ্বিতীয় বড় ক‚টনৈতিক সাফল্য। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কোন দেশের প্রধানমন্ত্রীর এটিই প্রথম সফর। কথিত আছে, আনোয়ার ইব্রাহিম নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা তুলে ধরে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, ‘যখন আপনারা আমাদের কাছে আহŸান জানিয়েছেন, সাত হাজার বা তার বেশিদের বিষয় বিবেচনার জন্য, যারা নিবন্ধন করেও রাজনৈতিক অবস্থা, এখানকার অভ্যুত্থানের কারণে যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে, আমি তাৎক্ষণিকভাবে সেটা বিবেচনা করেছি।’ এ সংখ্যা ১৮ হাজার হওয়ার কথা অধ্যাপক ইউনূস মনে করিয়ে দিলে ইব্রাহিম বলেছেন, প্রথম ধাপে সাত হাজার জনের যাওয়ার উদ্যোগ দ্রæত নেওয়া হবে। সব সন্তোষজনক হলে বাকিদেরও ক্রমান্বয়ে নেওয়া হবে। চলতি বছর নতুন-পুরাতন বিদেশি কর্মীদের কাজে যোগ দেওয়ার জন্য ৩১ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিমানের টিকিট স্বল্পতাসহ বিভিন্ন কারণে ওই সময়ের মধ্যে যেতে পারেননি প্রায় ১৮ হাজার বাংলাদেশি। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে যেতে না পারা এই কর্মীদের নিতে মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসে সরকারের আহŸানে সাড়া দেওয়ার কথাই জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
আমরা মনে করি, ড. ইউনূসের সবচেয়ে বড় ক‚টনৈতিক সাফল্য বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে আরব আমিরাতে আটক ৫৭ বাংলাদেশিকে মুক্তির ব্যবস্থা করা। গত ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, শারজাহ ও আজমানের বিভিন্ন এলাকার সড়কে বিক্ষোভের সময় ৫৭ বাংলাদেশিকে আটক করে আমিরাতের পুলিশ। দুদিন পর দাঙ্গা, যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং সম্পদহানির মতো অভিযোগে তাদের তিনজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ১১ বছর এবং ৫৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদÐ দেন দেশটির আদালত। এরপর বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সুবিধা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার ঘোষণা দেয় আমিরাত সরকার। ইউএইর রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এমিরেটস নিউজ এজেন্সি (ওয়াম) তখন জানিয়েছিল, আটক বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, তারা ‘বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন রাস্তায় বড় আকারের মিছিল সংঘটিত করেছিল’। এর ফলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং জননিরাপত্তা বিঘিœত হয়। সেইসঙ্গে, আইন প্রয়োগের কাজে বাধা এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি হুমকির মুখে ফেলার অভিযোগও তোলা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছিলেন যে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করেছিল এবং সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্তরা পুলিশের আহŸানে সাড়া দেননি। তৎকালীন সরকার এ দুটি ঘটনার সমাধানের উদ্যোগ নিয়েও শেষ করতে পাওে নি। অন্তবর্তীকালীন সরকার সেই কাটি সমাধান করতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক বিবেচনায় দুটি উদ্যোগ সরকারের বড় সফলতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমরা মনে করি, এ দুটি উদ্যোগ সরকারের জন্যও ইতিবাচক জায়গা তৈরি করবে। মানুষের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবমূর্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। মানুষ আশাবাদী সরকারের যেকোন ভালো উদ্যোগ সফল হবে। সেইসাথে আশা করা যায়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার আরো সম্প্রসারণসহ রেমিটেন্স যোদ্ধাদের জন্য দেশে বিভিন্ন সুবিধাদি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ নজর দিবেন।