রক্ষকের ভক্ষক হয়ে ওঠায় মাদকের বিস্তার

7

কাউছার আলম, পটিয়া

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ‘খ’ সার্কেল পটিয়ার সহকারী উপপরিদর্শক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (৪২) ৩০ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক হয়েছেন র‌্যাবের হাতে। গত ৮ নভেম্বর পটিয়া থানা এলাকায় টহলরত র‌্যাব সদস্যরা তাকে আটক করেন। আটক মামুন লক্ষীপুর সদর থানার মো. আবদুল মতিনের ছেলে। র‌্যাব জানায়, কক্সবাজার থেকে দু’টি মাইক্রোবাসে করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা চট্টগ্রামে নেওয়ার খবর পেয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়ার খরনা এলাকায় কাদের ফিলিং স্টেশনের সামনে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। তবে তল্লাশিচৌকি দেখে পালানোর চেষ্টাকালে প্রথমে একটি মাইক্রোবাস আটক করা হয়। পরে অন্য মাইক্রোবাসটিও আটক করা হয়।
এক পর্যায়ে গাড়িতে থাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুনের প্যান্টের পকেট থেকে ১০টি ইয়াবা, ১টি ওয়াকিটকি সেট, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোগোযুক্ত কোটি ও ক্যাপ এবং গাড়ির ভেতর থেকে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৫ টাকা উদ্ধার করা হয়। বাকি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে অপর মাইক্রোবাসটির চালকের আসনের নিচ থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার সহকারী উপপরিদর্শক মামুন তার পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মাদক কারবারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। মাদক পাচারের সময় তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জ্যাকেট, ক্যাপ ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করতেন, যাতে কেউ সন্দেহ না করে।
মাদক উদ্ধারের ঘটনায় গত রবিবার পটিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। তারা ছাড়াও পলাতক আরো একজন চালককে মামলাটিতে আসামি করা হয়েছে। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। মিয়ানমারের সিন্ডিকেট, স্থানীয় চক্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাসহ অধিদপ্তরটির চাকুরেদের সহযোগিতায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাদক আসছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেই অভিযোগের সর্বশেষ উদাহরণ আব্দুল্লাহ আল মামুন। প্রশাসন কঠোর নজরদারির কথা বলে এলেও বাস্তবে ইয়াবার স্রোত থামছে না। বরং বলা হচ্ছে, মাদক পাচার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজন এবং মাদক কারবারি ব্যক্তির সঙ্গে মিলেমিশে মাদক পাচারকারীদের সম্পৃক্ততায় সর্বনাশা মাদককে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ করে তুলেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্বয়ং মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি- এমন সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, মাদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে গডফাদাররা চা-কফি খাচ্ছে।
জানা যায়, কক্সবাজারের অন্তত ২১টি সীমান্ত পথ দিয়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবা। স্থানীয়রা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকজনের সঙ্গে মিলে এসব চালান সরবরাহ করছে। মিয়ানমারের সিন্ডিকেট সীমান্ত পার করে কক্সবাজার থেকে অনায়াসে চট্টগ্রাম হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ইয়াবার চালান পৌঁছে দিচ্ছে। এই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছেন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থারই কিছু অসাধু কর্মকর্তা। মাঝেমধ্যে মাদকের কিছু চালান অন্য বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও পুরো চক্র অক্ষতই থেকে যায়। আটক হয় মূলত চালান বা সাধারণ বাহকেরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কী পরিমাণ ইয়াবা টেকনাফ দিয়ে ঢুকছে, সেটা কল্পনার বাইরে। মাঝখানে কিছুটা কমেছিল। তবে এখন পাচার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। মিয়ানমারের পার্টি এখন শহর পর্যন্ত চালান পৌঁছে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ঠেকাতে পারছে না। ২০টি চালান গেলে সর্বোচ্চ একটা ধরা পড়ে। অনেক সময় সেটাও হয় সমঝোতা না হওয়ার কারণে।
এদিকে, জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি) বলছে, বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে, বাকি ৯০ শতাংশ অদৃশ্য থেকে বাজারে ছড়িয়ে যায়। মাদকের কারবার থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের লাভবান হওয়ার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

রক্ষক যখন ভক্ষক!
ইয়াবার চালান জব্দ করে টাকার ভাগাভাগিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কক্সবাজারের সাবেক পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০ কোটি টাকার আটক ইয়াবা বিক্রি করে অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক ওসি জাহাঙ্গীর আলমসহ সাতজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে তাঁদের পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। গত বছরের আগস্টে রামুতে ৭০ হাজার ইয়াবাসহ বিজিবির হাতে ধরা পড়েন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক আমজাদ হোসাইন। তিনি টেকনাফ অফিসে চাকরির সময় ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এবং নিজেই চালান বহন করে দিতেন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে অধিদপ্তরের ভেতরে থাকা সিন্ডিকেটের তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা কক্সবাজারে দীর্ঘদিনের পদায়নকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ইয়াবার চালান পৌঁছে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হলেও তাঁকে আজও সরানো হয়নি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া মাদক কারবারিদের এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোগসাজশ থাকায় এটি দিন দিন আরও সহজ হচ্ছে।
অপরদিকে, ২০১৮ সালের মে মাসে র‌্যাব দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল। পরে পুলিশ, বিজিবি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও মাঠে নামে। মাদক ঠেকানোর ‘বন্দুকযুদ্ধেথ বহু লোক নিহত হলেও কাঙ্খিত ফল আসেনি। টানা ক্রসফায়ারের মুখে ২০১৯ সালে টেকনাফে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু কিছুতেই মাদক সিন্ডিকেটের কার্যক্রম থামেনি। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অন্তর্বর্তী সরকার এসে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ১৫ সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। কিন্তু সা¤প্রতিক অভিযানের ফলও বলছে, ইয়াবা প্রবাহের গতি কমেনি।
গত কয়েক মাস পর্যন্ত অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ২০ লাখেরও বেশি ইয়াবা। শুধু এক দিনেই নাফ নদী থেকে ধরা পড়ে ২ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা। কখনো মাটির নিচে, কখনো মাছ ধরার ট্রলার আবার কখনো বসতবাড়ি থেকে ইয়াবার চালান পাওয়া যাচ্ছে।
‘মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৫’- এ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্বীকার করে বলেছিলেন- মাদককে এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। শুধু বহনকারীরা ধরা পড়ে, গডফাদাররা অদৃশ্য থেকে যায়। তারা বড় বড় হোটেল-রেস্তোরাঁয় মাদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসে চা-কফি খাচ্ছে। গডফাদারদের ধরতে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন উপদেষ্টা।
অন্যদিকে, সা¤প্রতিক অভিযান ও উদ্ধার হওয়া চালানের পরিমাণই বলছে, ইয়াবাসহ মাদকের স্রোতের সামনে প্রশাসন এখনো কার্যত অসহায়। যেদিন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে গডফাদারদের সঙ্গে সখ্য কমবে, সেদিন থেকেই ইয়াবার প্রবাহ কমতে শুরু করবে। আগে বাহিনীগুলোর ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানো দরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চক্র একসময় বাংলাদেশকে মাদকের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করলেও এই ব্যবসায় বাণিজ্যিক লাভের যে সুযোগ আছে তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারও তৈরি হয়েছে। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান চললেও থামছে না মাদক পাচারের ঘটনা।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এএসআই আবদুল্লাহ আল মামুনকে মামলায় প্রধান আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কাজ চলছে। অভিযানে জব্দ হওয়া দুটি মাইক্রোবাসের মধ্যে একটির মালিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুনের মালিকানাধীন। পলাতক আসামি সেই মাইক্রোবাসের চালক। গ্রেপ্তার আসামিদের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহিদ হোসেন মোল্লাকে তার সরকারি মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।