মোঃ আবদুল কাদের রাজু
যাদের হাতে ভবিষ্যৎ, যাদের স্বপ্নে রচিত হয় জাতির অগ্রযাত্রা তারা আজ এক ভয়ংকর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। মাদক নামের এক শয়তানী শক্তি নিঃশব্দে গ্রাস করছে তাদের প্রাণ, মন, ও সম্ভাবনা। এটি আর কেবল এক অভ্যাস নয়, এটি এক জাতীয় সংকট, এক নীরব মহামারী, যা সমাজের ভিত ধ্বংস করে দিচ্ছে প্রতিদিন।
বাংলাদেশে এই অন্ধকারের গভীরতা কল্পনারও বাইরে। Department of Narcotics Control (DNC)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায় দেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন তরুণ আজ মাদকাসক্ত। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অর্থাৎ যে বয়সে তারা জাতি গঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। ঢাকার অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, কোচিং সেন্টার, এমনকি গ্রামের স্কুলপাড়াও এখন মাদকের ছোবলে আক্রান্ত। ইয়াবা, আইস, গাঁজা, হেরোইন যেন নতুন প্রজন্মের নিঃশব্দ মৃত্যুর অস্ত্র।
কেন এমন হচ্ছে? উত্তরটা বেদনাদায়ক।
বেকারত্বের যন্ত্রণা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অবহেলা, মানসিক চাপ, একাকীত্ব এই সব মিলেই তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে গভীর হতাশায়। কেউ বন্ধুর প্রলোভনে, কেউ কৌতূহলে, কেউ আবার ব্যর্থতার যন্ত্রণায়, একবার ট্রাই করি ভাবনায় পড়ে আজ চিরদিনের মতো হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা বোঝে না মাদক একবার শরীরে প্রবেশ করলে তা কেবল দেহ নয়, মন, আত্মা ও নৈতিকতা সব কিছু পুড়িয়ে দেয় ছাইয়ে।
ফলাফল ভয়াবহ।
একজন মাদকাসক্ত তরুণ হারিয়ে ফেলে নিজের চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক ভারসাম্য। সে হয়ে ওঠে পরিবারের বোঝা, সমাজের হুমকি। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা সব কিছুর মূলেই এখন মাদক নামের এই দানব। একসময় যে তরুণের চোখে ছিল স্বপ্ন, আজ সেই চোখে কেবল ভয়, হতাশা আর শূন্যতা।
বিশ্বও এখন এই নেশার আগুনে জ্বলছে।
United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC)-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট বলছে বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মাদকের কবলে, যা গত ১০ বছরে ২৫% বেড়েছে।
তবুও অন্ধকারের ভেতর আলো আছে যদি আমরা একসাথে দাঁড়াই।
প্রথম দায়িত্ব পরিবার ও সমাজের। বাবা-মাকে হতে হবে সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভালোবাসা, সময় দেওয়া, বোঝা ও শুনে নেওয়া এটাই প্রথম প্রতিরোধ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গড়ে তুলতে হবে Anti-Drug Awareness Club, আয়োজন করতে হবে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কাউন্সেলিং সেশন। তরুণদের মনকে বিকাশের সঠিক দিক দেখাতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, জীবনের আসল আনন্দ আসে উন্নতি, অর্জন আর আত্মসম্মান থেকে, মাদক থেকে নয়।
সরকারের দায়িত্বও অপরিসীম।
সীমান্তে মাদক চোরাচালান রোধে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, পুনর্বাসন কেন্দ্র বাড়ানো, এবং চিকিৎসা আগে, শাস্তি পরে নীতি চালু করা সময়ের দাবি।
একইসঙ্গে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা সহায়তা, এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতা প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ যখন তরুণদের সামনে বিকল্প পথ থাকবে, তারা মাদকের পথে যাবে না।
এখনই সময় এই যুদ্ধের ডাক শোনার।
আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি মাদকের দাস হয়ে ধ্বংস হব, না কি জীবনের যোদ্ধা হয়ে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ব?
প্রত্যেক বাবা-মা যদি সচেতন হন, প্রত্যেক শিক্ষক যদি অনুপ্রেরণা দেন, প্রত্যেক তরুণ যদি নিজের স্বপ্নকে ভালোবাসে তাহলে এই মহামারিকে রুখে দেওয়া সম্ভব।
একজন তরুণকে মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে আনা মানে একটি প্রজন্মকে নতুন জীবন দেওয়া।
আসুন আজই আমরা শপথ নিই
আমরা নেশা নয়, জীবন বেছে নেব।
আমরা মাদক নয়, মানবতার পক্ষে দাঁড়াব।
আমরা অন্ধকার নয়, আলোর পথেই হাঁটব।
লেখক : প্রাবন্ধিক










