মাঝারি ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি

5

শুক্রবার সকালে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠেছিল দেশ। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হঠাৎ কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ সারা দেশ। স্থানীয় পরিমাপ অনুযায়ী এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭, আর যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস সেটিকে ৫ দশমিক ৫ হিসেবে রেকর্ড করেছে। জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর মাধবদী এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে এর উৎপত্তি হয়েছে। মাঝারি ধরনের এ ভূমিকম্প চট্টগ্রামসহ সবকটি জেলায় সামান্য অনুভূত হলেও ঢাকা ও আশেপাশের জেলায় এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বেশি। ইতোমধ্যে দেশে ৫ দশমিক ৭ স্কেল বা এরচেয়ে কমবেশি আরো বেশ কয়টি ভ‚মিকম্প হয়েছে কিন্তু তার অনুভূতি ও ক্ষতি সামান্যই বলা যায়। কিন্তু এবারের অনুভূত ভূমিকম্পটি বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভ‚কম্পন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ভ‚মিকম্পে ইতোমধ্যে ঢাকা, নরসিংদিসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ভুমিকম্পে শুধু ঢাকায় এক শিশুসহ ৪জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি ভবন হেলে যাওয়া, দেয়াল ধসে পড়া, পলেস্তারার ঝরে পড়া, আগুনি লাগারমত ঘটনার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে। মাঝারি ধরনের এ ভূমিকম্পে এতোবড় ক্ষতি কেন? স্বয়ং দেশের রাজধানীতে যদি এ জাতীয় ক্ষতি হয়, তবে দেশের অন্যান্য জেলার কী অবস্থা হতে পারে! তা নিয়ে গতকাল শুক্রবার দিনভর আলোচনার টেবিলে ঝড় তুলেছিল সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত। একটি জাতীয় পত্রিকা তাদের অনলাইন ভার্সনে লিখেছেন, ঢাকা নিয়ে সব ভবিষ্যৎবাণীর সামান্য প্রতিফলন দেখা গেল আজকের (শুক্রবার) এর ভ‚মিকম্পে। আরেকটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে বলা হয়েছে, এটি একটি মাঝারি শ্রেণির ভূমিকম্প। গত মার্চ মাসে ৭ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে মিয়ানমার। ভূমিকম্পের পর ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। ওই ভূমিকম্প এতটাই শক্তিশালী ছিল যে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও এর প্রভাব পড়েছিল এবং কিছু ভবন ধসে পড়েছিল। ভূমিকম্পের মাত্রা একই থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দেশে দেশে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত ৭ জানুয়ারি তিব্বতে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্পে হাজারো ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছিল এবং শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। অপরদিকে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো প্রাণহানি বা উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে কম্পনের মাত্রা এবং স্থায়ীত্বকাল গুরুত্বপূর্ণ। রিখটার স্কেল বা মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল (এমডব্লিউ) ব্যবহার করে কম্পনের শক্তি মাপা হয়। সাধারণত পাঁচ মাত্রার কম্পন মানুষ বুঝতে পারে, সাত মাত্রার উপরে কম্পনকে বড় কম্পন এবং আট মাত্রার বেশি হলে তা বড় দুর্বিপাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও কম্পন কতক্ষণ স্থায়ী হয়, তাও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল বা গভীরতা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রায় প্রভাব ফেলে। এবারই প্রথম ঢাকার নিকটেই নরসিংদিতে এ ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল। ্এর আগে অধিকাংশ ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভারতে, নেপালে কিংবা দেশের সিলেট অঞ্চলেই দেখা গিয়েছিল। এছাড়া দিনে বা রাতে, জনসংখ্যা বা আবাসস্থলের ঘনত্ব, মাটির প্রকৃতি বা ধরণ ইত্যাদি বিবেচনায় ক্ষয়ক্ষতি কম বা বেশি হয়। তবে ঢাকায় গতকালের ভূমিকম্পে যে পরিমান ক্ষতি হয়েছে, এর কারণ কি তা এখনও নির্ণয় হয়নি। সাধারণ আলোচনায় যেটি দেখা যায়, মানুষের ঘনত্ব,ভবনে নির্মাণ কার্যক্রমে দুর্বলতা, পুরনো ভবন মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ব্যবহার করা, সর্বোপরি সরকারের ভ‚মিকম্প মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত সাপোর্ট ও দক্ষতার অভাব এবং মানুষের অসচেতনতায় অন্যতম কারণ। গতকালের এ ভুমিকম্পের পর যে কোনো সময় আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির। তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, এটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ফলে যে কোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। তবে ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা এবং এর আশপাশে বিগত কয়েক দশকে সংঘটিত হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প।’ তিনি বলেন, এর আগে ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বরকল ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এটিও অনেক শক্তিশালী ছিল। তবে ১৯১৮ সালে দেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, আমরা সরকারকে বারবার বলে আসছি ভূমিকম্পে মহড়ার বিকল্প নাই। সরকার ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকার্যের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে, কিন্তু ভূমিকম্প মোকাবেলায় যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। আমরা জানি, ভ‚মিকম্প কোন পূর্বভাস দিয়ে আসেনা। এটি হঠাৎ সংঘটিত হয়। ধর্মে এর নানা ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর ব্যবস্থা সরকার করতে পারে। পৃথিবীর দেশে দেশে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার পত আবিষ্কার করেছে অনেক দেশ। আমাদের সেই পথেই হাঁটতে হবে। সরকার এ বিষয়ে গভীর মনোযোগী হবে- এমনটি প্রত্যাশা।