মনিকা ঋতুপর্না রূপনার বাড়িতে খুশির বন্যা

2

নিজস্ব প্রতিবেদক ও রাঙামাটি প্রতিনিধি

টানা দ্বিতীয়বারের মতো নারী ফুটবলে সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। দেশের এই বীরত্বে আলো ছড়িয়েছে পাহাড়ের তিন ফুটবল কন্যা। এই তিনকন্যার বদৌলতে দ্বিতীয়বারের মতো সাফ জয়ে গর্বিত পুরো বাংলাদেশ। ফাইনালে গোলের সূচনা করেছেন মনিকা চাকমা। জয়সূচক গোল করে দলকে শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি টুর্ণামেন্ট সেরা ঋতুপর্না। ২০২২ আসরের মতো এবারও সেরা গোলরক্ষক হিসেবে রূপনা চাকমাই আলো ছড়ালেন। চমৎকার ক্রীড়া নৈপুণ্যে টানা দু’টি সাফ জয়ী দলের খেলোয়াড় হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হলেন দেশের ফুটবল রূপকথার এই তিন রাজকন্যা। এবার দেখছেন, ২০২৬ সালের সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে হ্যাটট্রিক শিরোপার স্বপ্ন।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ বাংলাদেশ দলের নারী ফুটবলার ঋতুপর্না চাকমার বর্তমান বয়স ২২। তার বাড়ি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাইছড়ি গ্রামে। সেরা গোলরক্ষক রূপনা চাকমার বয়স ২১। তার বাড়ি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ভুয়ো আদাম গ্রামে। দুজনের পরিবারেই ছিল আর্থিক অভাব অনটন। মনিকা চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ির সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা লক্ষীছড়ির সুমন্ত পাড়ায় হলেও ফুটবলের টানে ঘাগড়াতে চলে আসেন। তিনজনই ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ঋতুপর্না অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঘাগড়া স্কুলে পড়ে চলে যান বিকেএসপিতে।
ঋতুপর্না ও রূপনা দুজনেই ছোট কালে বাবা হারিয়েছেন। মায়েদের কষ্টের সংসারে থেকে বেড়ে ওঠা তাদের। সেই অবস্থায় বাংলাদেশের মেয়েদের জাতীয় ফুটবল দলে রাঙামাটি থেকে উঠে আসাটা নিঃসন্দেহে যেমনটা খুব কঠিন বিষয়, তেমনি গর্বের। এভাবে টানা দ্বিতীয় বারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হওয়া বাংলাদেশের দলে কৃতিত্ব অর্জনকারী মেয়েদের পরিবারে এখন খুশির বন্যা। উচ্ছ¡সিত প্রতিবেশীরাও। তাদের কৃতিত্বে গর্বিত গোটা রাঙামাটিবাসী।
ঋতুর মা বসুমতি চাকমা বলেন, শিশু বয়সে ২০১৫ সালে ঋতুর বাবা ব্রজবাঁশি চাকমা মারা গেছেন। এক ভাই ও চার বোনের মধ্যে ঋতু চতুর্থ। একমাত্র ভাই পার্বন চাকমা ২০২২ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যুস্পৃষ্টে মারা যায়। এখন ঋতু পর্নার অদম্য কৃতিত্ব আমার বুক বেঁধেছে। এবারেও তার শিরোপা জয়ে আমি আনন্দে আপ্লুত। আমি তাদের দলের সবার জন্য আশীর্বাদ করি, যাতে তারা সারাজীবন সাফল্য অর্জন করতে পারে।
গোলবারের নিচে থাকা অতন্দ্র প্রহরী রূপনা। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভুয়ো আদমে তাদের ছিল দুইচালা টিনের একটি কুড়েঘর। গত বারের সাফ জয়ে তাদের জন্য একটি সেমিপাকা বাড়ি করে দিয়েছে সরকার। রূপনার মা কালা সোনা চাকমা বলেন, রূপনাদের এবারও জয়ের খবর শুনে আমি খুবই আনন্দিত। রূপনা শুধু আমার সন্তান না। সে এদেশের সবার সন্তান। আমি তো শুধু তাকে গর্ভে ধারণ করেছিলাম। তার সাফল্যের পিছনে যারা, আমি তাদেরকে বুকভরা শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। রূপনা শিশুকালে তার বাবাকে হারিয়েছে। এর পরদিন থেকে মজুরের কাজ করে ছেলে-মেয়েদের লালন-পালন করি। এখন রূপনাই আমার ভরসা, সে আমার সব।
পাহাড়ে নারী ফুটবলের আঁতুর ঘর রাঙামাটির ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়। যেখানে ফুটবল দুনিয়ায় হাতেখড়ি হয়েছে পাহাড়ের সন্তান জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় মনিকা, আনাই, আনুচিং, ঋতুপর্না ও রূপনা চাকমার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাফল্য অর্জনে গর্বিত বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান। তিনি বলেন, ঋতুদের জয়ের খবরে আমরা খুবই আনন্দিত। তারা আমাদের গর্ব। আমরা তাদেরকে নিয়ে খুব গর্ববোধ করি। তারা বাড়ি ফিরলে আমরা সংবর্ধনা দেব।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান বলেন, ঋতুপর্না ও রূপনার জন্য পুরো জাতি গর্বিত। আমরা তাদের জন্য সব সময় সাফল্য কামনা করি। তারা বাড়ি ফিরলে আমি তাদের জন্য সংর্ধনার আয়োজন করব।
নেপালের মাঠে ফাইনাল জয়ের পর সেরা খেলোয়াড় ঋতুপর্না চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই জয় সকলের। আমরা যেন এই জয়ের ধারবাহিকতা রাখতে পারি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হলাম, আরও বড় পরিসরে যেতে চাই’।
রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১২ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের আসরেও বিদ্যালয়টি ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে রানারআপ হয়। সেই থেকে এই বিদ্যালয়ের নারী ফুটবলারদের জাতীয় পর্যায়ে খেলার মিশন শুরু। দেশের বয়সভিত্তিক দলে বিভিন্ন সময় খেলে এখন জাতীয় দলে আলো ছড়াচ্ছেন এই বিদ্যালয়েরই সাবেক খেলোয়াড়রা। এদেরই তিনজন মনিকা, ঋতুপর্না ও রূপনা।
জানা যায়, বঙ্গমাতা ফুটবলে স্কুল দলের হয়ে ২০১৩ আসরে ১০নং জার্সিতেই মধ্যমাঠে খেলতেন মনিকা চাকমা। এখন নারী জাতীয় দলের ৬নং জার্সিতেই মাঠ দাপাচ্ছেন এই বাঘিনী। আর তখন ৬নং জার্সির মঘাছড়ি স্কুলের সবচেয়ে ছোট ঋতুপর্নায় এখন ১৭নং জার্সিধারী সাফের সেরা খেলোয়াড়। রূপনাতো বাংলার গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী।
মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চ্যাস্পিয়ন দলে (২০১১ সাল) অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় থাকলেও তারা বেশিদূর এগুতে পারেনি। পিছুটান ও ইনজুরিতে পথেই বিচ্যুতি ঘটেছে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের। পরের আসরে বিদ্যালয়ের রানার্সআপ টিমের পাঁচ খেলোয়াড় মনিকা, ঋতুপর্না, রূপনা, আনুচিং ও আনাই মগিনী ঠাঁই পেয়েছে জাতীয় দলে। এই পাঁচ কন্যা ২০২২ সাফ আসরে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে। এবার আনাই, আনুচিং ছিঁটকে গেলেও সাফের টানা ডাবল শিরোপার স্বাদ পেল মনিকা, ঋতুপর্না, রুপনা।
কিন্তু চাথুইমা, তিশা চাকমাদের মতো হারিয়ে যেতে পারতো সাফ জয়ে ‘জাতীয় বীর’ এ পরিণত হওয়া তিন নারী তারকা। তাদের হারতে দেননি একজন বীরসেন চাকমা। মঘাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন তিনিই তার স্কুলের চ্যাস্পিয়ন ও রানারআপ দলের খেলোয়াড়দের ঘাগড়া স্কুলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। কোচ শান্তিমুনি চাকমা ও সুইহ্লা মং মারমার তত্ত্বাবধানেই তাদের আরো পরিপক্ষ করা হয়। মূলত তাদের হাতেই মাঠ দাপানো রপ্ত করেছেন জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া পাহাড়ের নারী ফুটবলাররা।
কাউখালির ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় ফুটবল টিমের প্রশিক্ষক শান্তিমুনি চাকমা পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমার হাতেগড়া মেয়েরা সফলতা পাওয়ায় খুশি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ওদের সাথে এখনো যোগাযোগ হয়নি। হয়তো দেশে ফিরলেই যোগাযোগ হবে। এই মেয়েগুলো অনেক সম্ভাবনাময়। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এরা সফল হয়েছে। ফিটনেস ধরে রাখতে পারলে আগামিতে ওরা হ্যাটট্টিক চ্যাম্পিয়ন হবে’।