মজুত কয়লায় দিনে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব

25

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি আমদানির প্রভাবে অস্থিরতা বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়ে। অন্যদিকে দেশীয় জ্বালানির বড় আধার গ্যাসের মজুতও ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কয়লা উত্তোলনে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। দেশে আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাক্ষেত্রে প্রায় ৭ হাজার ৯৬২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তোলনযোগ্য এই কয়লা দিয়ে ৫০ বছর যাবত প্রতিদিন ১০ হাজার মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
দেশিয় মজুতের এই যখন অবস্থা, তখন সরকার বেশি দামে কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘আন্ডার গ্রাউন্ড’ না ‘ওপেন পিট’ খনি হবে, সেই বিতর্কে অনেক সময় চলে গেছে। কয়লা উত্তোলনে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দিতে হলে নিজেদের কয়লার দিকে নজর দিতে হবে। আগামীতে দেশের জ্বালানি পুরোপুরি আমদানি নির্ভর হচ্ছে। যেসব বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র আসছে, সেগুলো আমদানি করা কয়লা ও গ্যাসে চালাতে হবে। এতে খরচও বেশি হবে। তিনি বলেন, আমদানি করা কয়লার দর প্রতি টন ২০০ ডলারের বেশি হয়ে থাকে। সেখানে দেশিয় কয়লা ১২০ ডলারের মধ্যে পাওয়া সম্ভব। বালাসীঘাট ব্যবহার করে সেখানে আরও একটি রেললাইন বসিয়ে উত্তরের কয়লা আমরা দক্ষিণে নিতে পারি। নদী ড্রেজিংয়ের জন্য একটি বরাদ্দ রাখলেও খরচ বেশি পড়বে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। ভবিষ্যতে কয়লায় কার্বন ট্যাক্স বসতে পারে, এটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। তবে দেশিয় কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে কৃষি জমি, পরিবেশ, স্থানীয় অধিবাসীদের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। খবর বাংলা ট্রিবিউনের
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশিয় সম্পদ তথা কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত গত ১০ বছরে বড় পুকুরিয়া ছাড়া আর কোনও ক্ষেত্র থেকে কয়লা তুলতে পারেনি সরকার। কয়লানীতির কথা বলা হলেও সেটিও আলোর মুখ দেখেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লা তোলার প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেয় পেট্রোবাংলা। কিন্তু ওই মেয়াদেই তিনি আপাতত কয়লা উত্তোলন না করার নির্দেশ দেন। এতে করে পরবর্তী পাঁচ বছরে কয়লা উত্তোলন নিয়ে তেমন কোনও কাজ হয়নি।
এ বিষয়ে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এলএনজি আমদানির ওপর জোর না দিয়ে দেশিয় কয়লা উত্তোলনের ওপর জোর দেওয়া দরকার। প্রায় ১০ বছর ধরে কয়লা নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এতদিনে উদ্যোগ নিলে এখনই সেই কয়লা পাওয়া যেত। দেশিয় কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে জ্বালানি খরচ এমনিতেই কমে যাবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে। কিন্তু পাশাপাশি দেশিয় জ্বালানির বিষয়টি জোরদার করা দরকার।
বর্তমানে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত পাঁচটি কয়লাক্ষেত্রে প্রায় ৭ হাজার ৯৬২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত আছে। এরমধ্যে বড়পুকুরিয়ায় ৩৯০, ফুলবাড়িতে ৫৭২, দিঘীপাড়ায় ৮৬৫, খালাসপীরে ৬৮৫ এবং জামালগঞ্জে ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে। এরমধ্যে একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া, এই খনির উত্তর ও দক্ষিণাংশ থেকে কয়লা উত্তোলনের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর অংশে এক দশমিক পাঁচ বর্গ-কিলোমিটার এলাকায় ৯০ মিলিয়ন টন কয়লা রিজার্ভ রয়েছে। এরমধ্যে চার মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, দক্ষিণ অংশে তিন বর্গ-কিলোমিটার এলাকায় ৬০ মিলিয়ন টন কয়লা রিজার্ভ রয়েছে। এরমধ্যে ১০ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে।
এদিকে, দীঘিপাড়া কয়লা ক্ষেত্র থেকে কয়লা উৎপাদনের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। ৬০টির মধ্যে ২০টি বোর হোলের খনন কাজ শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে এই স্ট্যাডি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আর উৎপাদনে আসতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং দেশিয় কয়লা উত্তোলন বন্ধ রেখে এলএনজি আমদানির কোনও মানে নাই। কয়লানীতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। এ বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে হবে এবং তা সরকারকেই নিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত পেট্রোবাংলা কিংবা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এককভাবে নেওয়া সম্ভব নয়। যেহেতু ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়ে গেছে, তাই দ্রুত কাজ শুরু করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।