পূর্বদেশ ডেস্ক
গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে দেশের ৪ জেলায় শিশুসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন কয়েক শতাধিক মানুষ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত যে ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে; এরমধ্যে ঢাকায় ৩ জন, গাজীপুরে ১ জন, নারায়ণগঞ্জে ১ জন এবং নরসিংদীতে ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ২ শিশু। এ ঘটনায় বেশ কয়েকটি ভবন ও স্থাপনায় ফাটল দেখা গেছে। কয়েকটি ভবনের অংশ ধসে পড়ারও খবর পাওয়া গেছে।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এই ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী। মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর মাধবদী। এদিন ভ‚মিকম্পে সারা দেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। ২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে প্রাথমিকভাবে আতঙ্ক ছড়ায়, বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। এরপর আসতে থাকে প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য।
আচমকা ভূমিকম্পে আতংকগ্রস্ত হয়ে নিরাপদে সরতে গিয়ে সবচাইতে বেশি ২৫২ জন আহত হয়েছেন রাজধানীর পাশের জেলা গাজীপুরে। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে উঁচু ভবন দুলতে শুরু করলে ঘরবাড়ি, অফিস, শিল্পকারখানা, দোকানপাট থেকে মানুষ দ্রুত খোলা জায়গায় ছুটে আসে। গাজীপুরে বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানায় আতঙ্কে নামতে গিয়ে অনেক শ্রমিক আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পে আহত হয়ে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৫২ জন মানুষ ভর্তি আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই পোশাকশ্রমিক।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান। তিনি শুক্রবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে বলেন, টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে ৮৫ জন এবং গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯০ জন ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে গেছেন। অনেকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন।
যেসব জেলায় ১০ জনের মৃত্যু
ঢাকা : পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলীতে ৫ তলা ভবনের রেলিং ধসে ৩ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বেলা সোয়া ১১ টার দিকে বংশাল থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতরা হলেন আনুমানিক ২২ বছর বয়সী রাফিউল ইসলাম, হাজী আবদুর রহিম (৪৭) ও তার ছেলে মেহরাব হোসেন রিমন (১২)। তিনজনের মরদেহ মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
রাফিউল ইসলাম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমুহ) চিকিৎসক আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান।
স্থানীয়রা জানান, ভূমিকম্পের সময় হঠাৎ করে পাঁচতলা ভবনের রেলিং ধসে তিন পথচারী ঘটনাস্থলে নিহত হন। তারা সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত হন।
নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভ‚মিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা নামের এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নবজাতকের মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। মৃত ফাতেমা গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকার আব্দুল হকের মেয়ে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে ভ‚মিকম্পের সময় ঘটনাস্থলে হয়ে ভুলতা গাউছিয়া যাওয়ার সময় সড়কের পাশের দেয়াল ধসে নবজাতক ফাতেমা, তার মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগমের ওপর পড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলেই নবজাতকের মৃত্যু হয়। পরে তারা দেয়ালের নিচ থেকে নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেন। আহত অবস্থায় নবজাতকের মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগমকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নবজাতকের মা ও প্রতিবেশী গুরুতর আহত হয়েছেন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার সকালে উপজেলার গোলাকান্দাইল এলাকায় এ ঘটনায় শিশুটির মাসহ আরও দু’জন আহত হন। নিহত শিশু ফাতেমা ওই এলাকার আব্দুল হকের মেয়ে; তিনি ঢাকার শ্যামবাজারে ব্যবসা করেন।
গাজীপুর : গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নে ভূমিকম্পের গাছ থেকে পড়ে গিয়ে সুজিৎ দাস (৩৮) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গাছ থেকে পড়ার পর তাকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া শাদেরগাঁও জামে মসজিদের দু’টি গম্বুজ কাত হয়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা গেছে। নবনির্মিত সাদেরগাঁও চারতলা বিশিষ্ট স্কুলে বেশ কয়েকটি ফাটল দেখা গেছে।
নরসিংদী : নরসিংদী জেলার তিনটি উপজেলায় ভয়াবহ ভ‚মিকম্পে পিতা-পুত্রসহ ৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নিহতরা হলেন নরসিংদী শহরতলীর গাবতলী এলাকার হোসেন (৩৭) ও তার শিশু পুত্র ওমর ফারুক (১০), পলাশ উপজেলার কাজম আলী ভ‚ঁইয়া (৭০) ও ডাঙ্গা গ্রামের নাসির উদ্দিন (৫০) এবং শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আসকিতলা গ্রামের ফুরকান মিয়া (৪০)।
জানা গেছে, নরসিংদীর সদর উপজেলার গাবতলী এলাকার একটি নির্মাণাধীন ৭ তলা ভবনের ছাদ থেকে ইট পড়ে দেলোয়ার হোসেন, তার শিশু পুত্র ওমর ফারুক এবং তাসফিয়া আহত হয়। এলাকাবাসী তাদের উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়ার পর পিতা-পুত্রের মৃত্যু হয়।
দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামে। তারা নরসিংদী গাবতলী এলাকায় ভাড়া থাকতেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নরসিংদী সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এমদাদুল হক।
অপরদিকে পলাশ উপজেলার মালিতা গ্রামে মাটির ঘরের মাটির দেয়াল ভেঙে পড়ে। এ সময় মাটিচাপা পড়ে কাজম আলী ভ‚ঁইয়া নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়। অপর দিকে একই উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের ডাঙ্গা গ্রামে নাসির উদ্দিন নামে একজন ভ‚মিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন।
অন্যদিকে, শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আসকিতলা গ্রামে ফুরকান মিয়া নামে একজন ভ‚মিকম্পের সময় গাছে উঠে ডাল কাটার সময় গাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুরকান মারা যান।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফারজানা ইয়াসমিন।
নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবু তাহের মোহাম্মদ সামসুজ্জামান ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর খবর আমি অবগত নই। আমি শুনেছি দেলোয়ার হোসেন আইসিইউতে রয়েছেন।
এই ভূখন্ডে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেরও ইতিহাস রয়েছে। তবে গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন প্রাণঘাতি ভ‚মিকম্প দেশের মানুষ আর দেখেনি। ভূ-তত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে এ ভূমিকম্পটি হয়েছে, ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটে। ভূমিকম্পের কম্পনের তীব্রতা ছিল বেশ। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে’।
এক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকার একটি ৮ তলা ভবনের পাশের দেয়াল এবং কার্নিশ থেকে ইট ও পালেস্তারা খসে নিচে পড়ে, যেখানে একটি গরুর মাংস বিক্রির দোকান ছিল। সেখানে থাকা ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজন তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা ৩ জনকে মৃত ঘোষণা করেন।
আহত কয়েকশ : শুক্রবার ভূমিকম্পে গাজীপুরে আহত হয়ে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ২৫২ জন মানুষ ভর্তি আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই পোশাকশ্রমিক।
মহানগরীর টঙ্গী এলাকায় ভূমিকম্পের সময় পিনাকী গার্মেন্টস এবং ফ্যাশন প্লাস গার্মেন্টসের শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। শ্রমিকেরা দ্রুত ভবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে গেট এবং সিঁড়িতে প্রচন্ড ভিড় ও হুড়োহুড়ির সৃষ্টি হয়। এ সময় অনেক শ্রমিক পদদলিত হন। এ ঘটনায় শ্রমিকেরা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং আতঙ্কে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহত ব্যক্তিদের টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ওহেদুজ্জামান বলেন, আতঙ্ক বের হতে গিয়ে অনেক শ্রমিক আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মহানগরীর বাসন থানাধীন কোজিমা লিরিক কারখানা, লীবাস টেক্সটাইল লিমিডেট, হাসান তানভীর নামক কারখানা, ডে ফ্যাশন কারখানা কোস্ট টু কোস্টু নামক কারখানা এবং জেলার শ্রীপুর থানাধীন ডেনিম্যাক ডেনিম লিমিডেট কারখানার শ্রমিকেরা ভ‚মিকম্পের সময় তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন মামুনুর রহমান বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৭ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর আগে ১৩০ জন ভর্তি ছিলেন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন।
গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক আব্দুল সালাম সরকার বলেন, ‘এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ভূমিকম্পে কম বেশি আহত এ হাসপাতালে এসেছেন’। তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৭২ জনের মধ্যে ৪৯ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন ৫৩ জন। তাদের মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ জন।
নরসিংদী সদর হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের তথ্য মতে, কমপক্ষে দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। তাছাড়া ভূমিকম্পে জেলার প্রায় সব উপজেলায় বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নরসিংদীর সিভিল সার্জন ড. সৈয়দ মো. আমিরুল হক শামীম জানান, ভূমিকম্পের ঘটনায় কমবেশি অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং তাদেরকে নরসিংদী জেলা হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের তিনতলা ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের চারতলা থেকে নিচে লাফ দিয়ে তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এছাড়া সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা ভেঙেছেন ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামিম, আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
কলাবাগানের লেক সার্কাস রোড, হাতিরপুল, সেন্ট্রাল রোড, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, এলিফেন্ট রোড, মিরপুর, গুলশান, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায়, মানুষকে দ্রুত ভবন ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় কে কার আগে নামবেন তা নিয়ে তাদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিও হয়।
ভবনে ফাঁটল
ঢাকায় অনেক ভবনে ফাঁটল, ভবনের টাইলস ও পলেস্তরা খসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা সাংবাদিক ইমরান হোসেন জানান, শুক্রবার সকালে ঘুমের মধ্যে শক্ত ঝাঁকুনি অনুভব করে অনেকেই বিচলিত হয়ে পড়েন। ভূমিকম্প টের পেয়ে অনেকেই বাসভবন থেকে বেরিয়ে পড়েন। অনেক ভবনে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। ঘটনার এক ঘণ্টা বাদেও বাসায় ঢুকতে ভয় পাচ্ছি। তিনি বলেন, আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শেলফ থালা-বাসন নিচে পড়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি দেখতে কোনো জরুরি সাড়াদানকারী দলকে তিনি দেখেননি। মেরামতের জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না।
নিউ মার্কেট থানার ওসি এ কে এম মাহফুজুল হক বলেন, তাদের থানা ভবনের ৩, ৪ ও ৫ তলায় ফাটল ধরেছে। নিউ মার্কেটের সামনে একটি ভবন হেলে পড়ার গুঞ্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, সে রকম কিছু না। ভবন মালিকের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি, ভবনের ডিজাইনই এ রকম’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসিন হল, কবি জসীমউদ্দিন হল, স্যার এ এফ রহমান, মোকাররম ভবন, শেখ ফজলুল হলসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের একটি কক্ষের জিনিসপত্র তছনছ হয়ে গেছে।
নরসিংদী শহরের এবং ঘোড়াশাল বাজার এলাকার অনেক ভবনে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌর এলাকার নতুন বাজার গ্রামের ইশাক মিয়ার বাড়ি ভেঙে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
গাজীপুরে হেলে পড়েছে ছয়তলা একটি ভবন, ফাটল ধরেছে এক মাদ্রাসার দেয়ালে। টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘স্টেশন রোডে একটি ছয় তলা ভবন হেলে আরেকটি ভবনের সঙ্গে লেগে গেছে। এতে ভবনটির বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে’।
নরসিংদী শহরের এবং ঘোড়াশাল বাজার এলাকার অনেক ভবনে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল পৌর এলাকার নতুন বাজার গ্রামের ইশাক মিয়ার বাড়ি ভেঙে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ভ‚মিকম্পে পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে জাতীয় গ্রিডের সাবস্টেশনে যন্ত্রাংশ আগুনে পুড়ে গিয়ে বন্ধ রয়েছে।
পলাশ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আব্দুস শহীদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কালবেলাকে বলেছেন, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটের চেষ্টায় ৩০ মিনিটের মধ্যেই এ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা : ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান, বাসা-বাড়ির সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভূমিকম্পের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা উঠে এসেছে। ভূমিকম্প টের পেয়ে আতঙ্কিত মানুষ ছুটে ভবনের নীচে নেমে ফাঁকা জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, বহুতল ভবনগুলোতে মানুষ পিলার ধরে থাকার দৃশ্যসহ নানান দিক উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ফায়ার সার্ভিসের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা : বেলা ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এরমধ্যে আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকায় ৮ তলা ভবন ধসে পড়ার খবর পেয়ে সদরঘাট ও সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশন থেকে দু’টি ইউনিট সেখানে যায়। তারা দেখতে পায় পলেস্তারার কিছু আলগা অংশ এবং কিছু ইট খসে পড়েছে। ভবনের কোনো ক্ষতি হয়নি। খিলগাঁও নির্মাণাধীন ভবন থেকে পার্শ্ববর্তী দোতলা একটি ভবনে একটি ইট পড়ে একজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বারিধারা ব্লক-এফ, রোড-৫ এ একটি বাসায় আগুনের খবর পাওয়া যায়। বারিধারা ফায়ার স্টেশনের দু’টি ইউনিট সেখানে গিয়ে আগুন নেভায়। ভূমিকম্পের কারণেই ওই আগুন লেগেছিল কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্রাপুরের স্বামীবাগে আট তলা একটি ভবন অন্য একটি ভবনে হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। সূত্রাপুর ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেছেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কোনো ক্ষয়ক্ষতি নেই। কলাবাগানের আবেদখালী রোডে একটি ৭ তলা ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। মোহাম্মদপুর ফায়ার স্টেশন থেকে একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ভবন ঠিক আছে, লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেছিল। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি বাসা বাড়িতে আগুন লাগে। গজারিয়া ফায়ার স্টেশন থেকে দু’টি ইউনিট সেখানে গেছে।










