ভূগর্ভস্থ পানির সংকট : আগামীর বড় চ্যালেঞ্জ

5

মুহাম্মদ জাবেদ হোছাইন

পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদান হলো পানি। নদী, ঝরনা, হ্রদ, সমুদ্র-সবখানেই পানি বিস্তৃত; কিন্তু মানুষের জন্য নিরাপদ পানযোগ্য পানির উৎস খুবই সীমিত। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, কৃষিখাতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার, শিল্পায়নের প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূ-উপরস্থ পানি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় মানুষ বারবার হাত বাড়িয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির দিকে, যা দীর্ঘদিন ধরে মানবসভ্যতার নীরব পরিত্রাতা হিসেবে ছিল। কিন্তু আজ সেই ভূগর্ভস্থ পানিই বিপন্ন হতে চলেছে। এর উৎস দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে, স্তর নামছে ভয়াবহ হারে। আর এভাবেই মানবজাতি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দিকে।
ভূগর্ভস্থ পানির গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর মোট মিঠাপানির মাত্র ২.৫% মানুষের ব্যবহারোপযোগী আর তার একটি বড় অংশ রয়েছে মাটির নিচে সঞ্চিতভাবে। কৃষি, গৃহস্থালি, শিল্পকারখানা, এমনকি অনেক দেশের নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যন্ত এই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ তাদের দৈনন্দিন পানির প্রয়োজন সরাসরি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকেই মেটায়। বিশ্বের প্রায় ৪০% পানি সরাসরি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে উত্তোলিত হয় এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত পানির ৭০% আসে এই ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। শহুরে জীবনে পানির বেশিরভাগই টিউবওয়েল বা গভীর নলক‚পের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু উদ্বেগজনক তথ্য হলো-বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানি প্রায় ১১৩ বিলিয়ন লিটার হারে কমে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক অঞ্চল এই সংকটের মারাত্মক প্রভাব ভোগ করছে। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকারী তিন দেশের মধ্যে অন্যতম; বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানির ওপর জনসংখ্যার চাপ ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে যে হারে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, তার তুলনায় পুনঃসঞ্চয় বা রিচার্জের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে বিশ্ববাসী ইতোমধ্যেই এই সংকটের তীব্র প্রভাব টের পাচ্ছে।
সংকটটির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত ও বেপরোয়া পানি উত্তোলন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি ও নগর জীবনের পানির চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। বহু দেশে পানি উত্তোলনের ওপর কোনো কঠোর নীতি নেই। ফলে অগণিত নলকূপ, গভীর টিউবওয়েল ও বাণিজ্যিক বোরহোলের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। কৃষিক্ষেত্রে পানি ব্যবহারের ধরনও সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। আজও অনেক দেশে প্লাবন সেচ পদ্ধতি চলমান, যা পানির বিরাট অপচয় ঘটায়।
অন্যদিকে নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট হচ্ছে, কংক্রিটের নগর বিস্তৃত হচ্ছে, ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরায় সঞ্চিত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনও এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদি খরা, উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং হিমবাহ গলনের অস্বাভাবিক ধারা পানির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ সমস্যা; শিল্পবর্জ্য, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার মাটির গভীরে প্রবেশ করে পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ।
এই সংকটের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নিরাপদ পানীয় জল মানবাধিকারের মৌলিক দাবি হলেও, ভবিষ্যতে বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী পানীয় জলের সংকটে পড়বে বলে জাতিসংঘ সতর্ক বার্তা দিয়েছে। পানি সংকট খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। কারণ কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য মজুত কমে যাবে এবং দাম বেড়ে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হবে। পানির ওপর নির্ভরশীল শিল্পখাতও বড় ধাক্কা খাবে; অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে বহু দেশে।
পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হবে, জলাশয় শুকিয়ে যাবে, জীববৈচিত্র্য লোপ পাবে, আর যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভয়ংকরভাবে নেমে গেছে, সেখানে ভূমিধস বা ল্যান্ড সাবসিডেন্সের মতো বিপর্যয় দেখা দেবে-যার উদাহরণ ইতোমধ্যেই মেক্সিকো সিটি, জাকার্তা, টোকিও, সাংহাই ও ঢাকাতে পরিলক্ষিত। সব মিলিয়ে পানি নিয়ে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন বাড়বে, নদীর পানি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির অধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংঘাত বা ‘ওয়াটার ওয়ার’ দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। রাজধানী ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক মিটার করে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় কৃষিকাজের জন্য ব্যাপক নলকূপ নির্ভরতার ফলে পানির স্তর ভয়াবহভাবে কমেছে। আবার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ায় নিরাপদ পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। আর্সেনিক দূষণ তো বরাবরই এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছে। সর্বত্রই পানি উত্তোলন বেশি, কিন্তু রিচার্জের সুযোগ কম।
এ অবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কৃষিক্ষেত্রে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, আধুনিক সেচব্যবস্থা জনপ্রিয় করতে হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে জলাধার, খাল, বিল, নদী ও পুকুর পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে হবে; যাতে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে জমে থেকে পুনরায় মাটির নিচে যাওয়ার পথ পায়। শহর ও গ্রামে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা এবং পানি উত্তোলনের ওপর কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে পানি সাশ্রয়ের নৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও পরিবার পর্যায়ে।
সমগ্র চিত্রটি খুবই স্পষ্ট ভূগর্ভস্থ পানি সংকট আর দূরবর্তী কোনো সম্ভাবনা নয়। এটি ইতোমধ্যেই বাস্তবতা হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই সংকটের নীরব শিকার হচ্ছে, আরও অনেকে শিগগিরই হবে যদি এখনই পরিবর্তন না আসে। মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষায় পানি ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে আনতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি পিপাসিত পৃথিবীর উত্তরাধিকার পেতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, টেকসই নীতি, সচেতনতা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা। পানি বাঁচানো মানেই জীবন বাঁচানো—এই উপলব্ধি হৃদয়ে নিয়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভূগর্ভস্থ পানির ভান্ডার নিঃশেষ হয়ে গেলে সভ্যতার আলোও ¤øান হয়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর বুকে মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হবে কঠিন থেকে কঠিনতর।

লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক