“ভাল আছি ভাল থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”

2

এম. এ. মাসুদ

‘ভাল আছি ভাল থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো’ – এই বিখ্যাত গানটির যিনি গীতিকার, তিনি ভবিষ্যত দ্রষ্টার মতোই হয়তো লিখেছিলেন গানের এই কথাগুলি। তিনি যখন এটি লিখেন, তিনি তখন নিশ্চয় এটা কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে, নিকট ভবিষ্যতে মানুষের পক্ষে আত্মীয়-পরিজন, ভাই-বোন, বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিক-প্রেমিকা কারো কাছে আর চিঠি লিখবার প্রয়োজন হবে না। তাই হয়তো চিঠি লিখবার মত আর কাউকে পাওয়া যাবে না ভেবে অথবা চিঠি পাঠাবার মত কোন ঠিকানা না পাওয়ার কথা চিন্তা করে গীতিকার হয়তো আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখবার কথা বলেছেন। মনের ভাব প্রকাশের, মনের কথা বলবার বা জানবার মাধ্যম চিঠি লেখার দিনগুলি এখন কালের গর্ভে অপসৃত। অথবা এভাবে বলা যায়, বিজ্ঞান আজ মানুষের মনের সকল আবেগ-অনুভূতি আর আনন্দ-বেদনা প্রকাশের চিরন্তন রীতি কেড়ে নিয়েছে এবং মানুষের হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত ভাব প্রকাশের একমাত্র উপায় ‘চিঠি’ নামক এই বিষয়টির উপর আধুনিক ই-মেইল, এসএমএস এবং হোয়াটসঅ্যাপ নামক মারণাস্ত্রের আঘাতে এটিকে এখন যাদুঘরে পাঠাবার আয়োজন করেছে। ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ- কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। আবেগ বিহীন মানুষ যন্ত্রতুল্য। এরা সাধারণত নিষ্ঠুর হয়ে থাকে। তাইতো মনে হয় এ প্রজন্মের মানুষের অন্তর আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। পূর্বসুরীদের আচার-আচরণ এবং স্মৃতির প্রতি আবেগহীন এ প্রজন্মের রয়েছে চরম উদাসীনতা।
মানব সভ্যতার শুরু থেকে এই পর্যন্ত মানুষের মনের ভাব প্রকাশ আর রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের যোগোযোগের জন্য চিঠিই বহুকাল একমাত্র মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। প্রত্যেকটি চিঠি তার নির্দিষ্ট গন্তব্য পৌঁছানোর জন্য রেল, স্টীমার, নৌকা, উড়োজাহাজ সহ সব ধরনের যানবাহন ব্যবহৃত হত। শুধু মনের আবেগ অনুভূতি প্রকাশের জন্য নয়, দেশ-বিদেশে জরুরী বাণিজ্যিক চিঠি প্রেরণের জন্যও ডাক বিভাগ ছিল মানুষের একমাত্র ভরসার প্রতিষ্ঠান। তখন মাত্র দশ পয়সা দামের একটি পোস্ট কার্ডে প্রাপকের উদ্দেশ্যে প্রেরকের নিজের বক্তব্য লিখে ঢাকা শহরের যে কোন ডাক বাক্সে ফেললে তা চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে যেত। আমার এই কথাটি হয়তো আজকের প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। এই প্রজন্মের অনেকেই পোষ্ট কার্ডই দেখেনি। ডাক বিভাগের ভিপিপি (Value Payable Parcel) বা মানি অর্ডার সম্পর্কে এ প্রজন্মের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। তখন মায়ের কাছে ছেলের চিঠি, বাবার কাছে মেয়ের চিঠি, স্ত্রীর কাছে স্বামীর চিঠি বা স্বামীর কাছে স্ত্রীর চিঠি, প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের চিঠি – এভাবে চিঠির মাধ্যমে সামাজিক-পারিবারিক বিষয় আশয়সহ সব বিষয়ে বিদেশে এবং দেশের দূরদূরান্তে অবস্থানরত আত্মীয় পরিজনরা চিঠির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতেন। তখন পারিবারিক সমস্যা নিরসন, বিয়ে-শাদী ইত্যাদির মত বিষয়েও পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধা হতো। তখন পরস্পরকে লেখা চিঠিগুলি খুবই দীর্ঘ হত এবং স্বাভাবিকভাবেই এসব চিঠির উত্তরও দীর্ঘ হত, বিশেষ করে প্রেমিক প্রেমিকার চিঠি। চিঠির প্রাপক প্রেরকেরা এসব চিঠি অত্যন্ত যত্নসহকারে স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করতেন। আপনজন বা প্রিয়জনের কাছ থেকে কখন একটি চিঠি আসবে সে প্রত্যাশার ক্ষণ গণনার মত মধুর ও রোমাঞ্চকর স্মৃতি এই প্রজন্মের মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই ছিল চিঠি। তাদের কাছে অর্থাৎ প্রেমিক বা প্রেমিকার কাছে আসা একটি চিঠি তাদেরকে দীর্ঘদিন আনন্দে ভাসাত আর রোমাঞ্চে ডুবিয়ে রাখত। তখন তাদের কাছে একটি চিঠি আসা মানে ছিল কল্পনায় তাদের মধুচন্দ্রিমা যাপনের মতই। দূর প্রবাসে কর্মরত স্বামীর কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার জন্য বিরহী বধুর তীব্র আকুলতা আজকের প্রজন্মের কয়জন বুঝতে পারবে ?
এক সময় আমাদের দেশে টেলিভিশন ছিল না। সিনেমা আর রেডিওই ছিল বিনোদন মাধ্যম। কিন্তু তখনকার তরুণ সমাজ অদেখা, অপরিচিত মেয়ে বা ছেলের সাথে চিঠি লিখে বন্ধুত্ব করত। যাকে পত্র মিতালী বলা হত। এই পত্র মিতালী শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদেশী ছেলেমেয়েদের সাথেও আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের পত্রের মাধ্যমে মিতালী হত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর চিঠির মাধ্যমে বন্ধুত্ব প্রত্যাশী ছেলেমেয়েদের নাম ঠিকানা সম্বলিত MAKE A FRIEND নামের একটি ইংরেজি এবং ‘মিতালী’ নামের একটি বাংলা পত্র মিতালী পত্রিকা প্রকাশিত হত। পত্র মিতালী শুধু ছেলেও মেয়ের মধ্যে হত না। এই মিতালী ছেলের সাথে ছেলের এবং মেয়ের সাথে মেয়ের মধ্যেও হত। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে পত্র মিতালীর চিঠি লেখালেখির মাধ্যেমে কেউ কেউ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে যেত। পরবর্তী পর্যায়ে পারিবারিক সম্মতিতে বা অসম্মতিতে উভয়ে বিয়ের বাঁধনে আবদ্ধ হওয়ার ঘটনাও আছে। পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হওয়ার এরকম অনেক ঘটনা আছে যা পত্র মিতালীর মাধ্যমে হয়েছে। চিঠি লেখালেখির মাধ্যমে বন্ধুত্ব করার বিষয়টি তখনকার রক্ষণশীল সমাজ উদারভাবেই দেখত যা বিষ্ময়কর হলেও সত্য।
কাউকে চিঠি লেখার বা কারো কাছ থেকে চিঠি আসার আনন্দ আর আবেগ আজ হারিয়ে গেছে। মোবাইল ফোন এই স্থানটি দখল করেছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু চিঠির মত মোবাইল ফোনের এসএমএস, ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা কেউ সংরক্ষণ করেন না। ফলে প্রত্যেক মানুষের জীবনের পূর্ব স্মৃতিগুলি কাউকে পরবর্তীতে আর আলোড়িত করে না। এসএমএস, ই-মেইল বা হোয়াটসঅ্যাপ যতই গতিশীল হোক, ডাক বিভাগের প্রতি আছে মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা। ডাক বিভাগকে মানুষ নির্ভরযোগ্য ও বিশ^াসযোগ্য মনে করে। ডাক বিভাগকে নিয়ে মানুষের রয়েছে নস্টালজিক অনুভ‚তি। ‘সেবাই আদর্শ’ এই বিষয়টি ডাকবিভাগ আজো সুমন্নত রেখে চলেছে। এ প্রজন্মের যারা ঢাকায় থাকেন এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে যাদের ঢাকায় আসা-যাওয়া আছে, তাদের প্রতি পরামর্শ থাকবে – তারা যেন ডাক বিভাগের যাদুঘরটি পরিদর্শন করেন। এতে তাদের সমুখ থেকে শুধু একটি আলাদা জগতের পর্দা অপসারিতই হবে না, এতে তাদের জ্ঞানের পরিধিরও বিস্তৃতি ঘটবে।

লেখক : বর্ষিয়ান নাগরিক ও সমাজকর্মী