ভারত ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে উপাস্য থাকুক

2

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

অতিসম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের ১৮তম লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ অতি তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের রাষ্ট্র চরিত্রের মৌলিক আদর্শ ছিল গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। উঁচুমার্গের গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্বজুড়ে ভারত অন্যতম অপ্রতিদ্ব›দ্বী। ভারত জাতিরাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষতার মহিমায় গৌরবোজ্জ্বল। এটি অনুমেয় যে, ধর্মান্ধ উগ্রবাদী রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির খোলস থেকে বেরিয়ে আবার আদি নান্দনিক স্বরূপে ভারত সুপ্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। ধর্মীয়-ধার্মিক চিন্তা চেতনা অবশ্যই প্রতিটি মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। পক্ষান্তরে বিগত এক দশক ধর্মান্ধ উগ্রহিন্দুত্ববাদের মোড়কে ভারতের রাষ্ট্র চরিত্র প্রায় কলুষিত। সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের জনগণ যে অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনায় সমুজ্জ্বল তা আবার প্রমাণ হয়েছে। ৪ জুন মধ্যরাতে দেশটির ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ১টি আসন ছাড়া সবগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে জানা যায়, ৫৪২টি আসনের মধ্যে শ্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয় পেয়েছে ২৪০টিতে। প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস পেয়ে ৯৯ টি আসন।
অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ৩৭টি, তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি, ডিএমকে ২২টি, তেলেগু দেশম পার্টি ১৬টি, জনতা দল (জেডি-ইউ) ১২টি, শিবসেনা (উদ্ভব) ৯টি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপিএসপি) ৭টি ও শিবসেনা (এসএইচএস) ৭টি আসনে জয় পেয়েছে। এছাড়াও ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপিএসপি) আরও একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির তৃতীয় বারের মত ক্ষমতায় আরোহন অনেকটা সংকটাপন্ন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ বিজেপি অন্যান্য দলের সমর্থনে সরকার গঠনে কতটুকু সফল হবে, তা অনিশ্চিত। হয়তো প্রথমবারের মত জোট সরকার গঠন করতে হবে দলটিকে। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় এখনও অবিচল থাকা কংগ্রেস অতীতের তুলনায় অনেক ভাল ফলাফল করেছে। তাদের ধারাবাহিক উত্থান অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতকে যদি শ্রী নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর দল একটি ধর্মান্ধ উগ্র হিন্দুত্ববাদি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই, তাহলে ভারতের সুপ্রাচীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভূলুন্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বাংলাদেশসহ নিকটতম প্রতিবেশিদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একটি সমৃদ্ধ আঞ্চলিক বলয় তৈরি করতে ভারত যেন মৌলিক রাষ্ট্রীয় চরিত্রে কোন পরিবর্তন না আনে। সহজ সরল কথা ভারতবর্ষের সকল সভ্যজন কখনো কোন জঙ্গিত্ব-ধর্মান্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। সকল সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সংহার করে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-অঞ্চল নিবিশেষে সৌহার্দ সম্প্রীতির অবারিত পুণ্যভূমিতে ভারত ও ভারতবাসীর ঐক্যবদ্ধতাই প্রত্যাশিত। অবিভক্ত ভারতবর্ষে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান অনুষঙ্গ ছিল ধর্মভিত্তিক নয় বরং ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠা।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ ধর্মকে পুঁজি করে বিভাজনের রাজনীতির সূচনা করে। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনসহ সকল ধরনের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অগ্রগণ্য। ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ কূটচাল অবলম্বন করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটিয়ে বৃটিশ রাজ শাষণ-শোষণ ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে। তৎকালীন কংগ্রেসের নেতৃত্বে সকল সম্প্রদায় ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সংবিধানের ২৫-২৮ নং ধারাগুলিতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম স্থপতি পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মের বিরোধিতা করা নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হল সেই রাষ্ট্র যা সকল ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সমভাবে শ্রদ্ধাশীল এবং সকল ধর্মকে সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। এই ধরনের রাষ্ট্র নিজেকে কোনো বিশেষ ধর্ম বা ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করে না।’ ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে স্বতন্ত্র হলেও, নানা দিক থেকে এটি অভিনব। এটি ভারতীয় ঐতিহ্যের সাঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন এটি আদর্শ যা বার বার আঘাত পাওয়া সত্তে¡ও গর্বের সঙ্গে অবিচল আছে।
প্রাসঙ্গিকতায় বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিন্ন ফসল হচ্ছে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র গঠনে বিশ্বের কিংবদন্তি জাতীয়তাবাদী ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের অন্যতম কালজয়ী মহাননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের জন্য বিশ্বনন্দিত। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এহেন অযাচিত-অবাঞ্চিত-অনভিপ্রেত বিচ্যুতি থেকে পরিত্রাণ লাভে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক মানসে কালপরিক্রমায় অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার পরিগ্রহে তিনি ঋদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতির আদর্শের মৌলিক চারটি স্তম্ভ তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। চতুর্থ স্তম্ভ-‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধু মনুষ্যত্বের সাবলীল ও স্বাভাবিক প্রকাশে বাঙালি স্বজাত্যবোধের মূল্যায়নে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনকে অসাধারণ বিশ্লেষণে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ-দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিকবৃন্দের গ্রহণযোগ্য ধর্ম পালনের সৌকর্যকে উদঘাটিত করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম কর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই।’
বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত মার্জিত-পরিশীলিত ধর্ম চর্চা বা পারস্পরিক প্রাত্যহিক বিনিময়-আদান প্রদান-লেনদেন-শ্রদ্ধা ভালোবাসা-পুণ্য প্রীতির সঙ্গত ও সংযত প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করার অনুপম ক্ষেত্রের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হল এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচার – এই বাংলাদেশের মাটিতে এ-সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি। কেউ যদি বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নাই, আমি বলবো সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটিকয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে।’
লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের সাউথ এশিয়া সেন্টার আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশ্ববরেণ্য নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অর্মত্য সেন বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সমাজের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে মতাদর্শ, তা এখনও সারা পৃথিবীর জন্য প্রাসঙ্গিক। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর শক্তিশালী স্বতন্ত্র যে ধরণ ছিল, বর্তমান সময়ে তার বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে। যা কেবল বাংলার জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ অনবদ্য রচনায় অধ্যাপক সেন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে বিশেষভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সেকুলারিজম ধারণার মানে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে না, এমন নয়। সেটা ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার হবে না।’ তিনি বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা দর্শন ব্যাখ্যায় ষোড়শ শতকের স¤্রাট আকবরের মতাদর্শের তুলনামূলক আলোচনায় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও আকবরের মতাদর্শ এখনও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটা কেবল ভারতে ব্যবহৃত হতে পারে তা নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রাসঙ্গিক।’
আমাদের সকলের জানা, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রত্যয় বা আদর্শ আক্ষরিক অর্থে সংস্কৃত-বাংলা থেকে উদ্ভূত নয়। এটি ইংরেজি ‘সেকুলারিজম’ প্রত্যয়ের অনুবাদ প্রতিশব্দ। ভারতবর্ষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে ধর্মনিরপেক্ষতা শিক্ষাচিন্তার ইহজাগতিকতায় সুস্পষ্ট। ১৮০২ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন প্রণীত নীতি-নৈতিকতার ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ পত্রের আলোকেই ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে আমেরিকার সংবিধানে প্রথম সংশোধন আনা হয়। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পর ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেনের লেখক জর্জ জ্যাকব হলিওয়েফ সর্বপ্রথম ভাষা ও সাহিত্যে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি ব্যবহার করেন। প্রায় শতবছর পর খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অন্নদাশঙ্কর রায়’র মতানুসারে; এই উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রথম রাষ্ট্র-চিন্তায় ব্যবহার করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংজ্ঞায়িত করতে কৃতি সমাজ-দার্শনিকরা নিজ ধর্মের প্রতি আনুগত্য ও অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল মানসিকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। রাষ্ট্র শাসনেও একই ধারায় সকল ধর্ম-ধর্মাবলম্বীর প্রতি যৌক্তিক সহনশীলতাকে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিরূপে বিবেচ্য হয়ে আসছে। অবশ্যই ধার্মিকতা ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য নিরূপণে প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রকে জাগরুক রাখতে হবে। অন্যথায় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সমাজকে অন্ধকারের গহŸরে নিমজ্জিত করবে – নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী, সাবেক উপাচার্য চ.বি