ভারতীয় মুসলমানদের আত্মপরিচয়

1

সৈয়দ রফিকুল ইসলাম

[ প্রথম পর্ব ]
অপমানজনক শব্দে মুসলমানদেরকে আখ্যায়িত যদিও আমার লিখা ১৭টি বই প্রকাশিত হয়েছে, তবুও নিজেকে একজন বোদ্ধা পাঠক হিসেবে দাবী করি। অবসর জীবনে লিখা ও পড়াই আমার একমাত্র সম্বল। বাল্যকাল থেকেই যেহেতু আমি বই পড়তে ভালবাসি এবং তা সংরক্ষণ করি, তাই এ বয়সেও বই পড়াটাই আমার একমাত্র নেশা ও উপভোগের বিষয়। গল্প উপন্যাস বিষয়ে পড়েছি খুবই কম, তাও বিদ্যালয়ের সময়কালে। পরবর্তীতে এবং আমার অবসর জীবনে ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ের গ্রন্থই আমার জীবনে জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। ‘প্রাচীন ভারত’, ‘প্রাচীন বাঙলা’ বিষয়ই আমার আগ্রহের বিষয়বস্তু ও গবেষণা এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে হাতে অস্ত্র ধরেছি, সে হাতে কলম ধরে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লিখতে আমার প্রচেষ্টা।
আমার পঠিত বইয়ের মধ্যে বাংলাদেশী পুস্তকের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের গ্রন্থই অধিক। ইতিহাসের গ্রন্থে কোন বিষয়ের উপর রচিত হলে তাতে ইতিহাসের উপাদান, তথ্য, তত্ত¡ ইত্যাদির সংযোজন থাকে। কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে সিলেবাসের মোড়কে আবদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ও উপাদান খুবই কম থাকা স্বাভাবিক। যেমন নবাবী আমলের শাসকদের সম্পর্কে গ্রন্থে যতটুকু ইতিহাসের উপাদান পাওয়া যাবে, তার চেয়ে ঢের বেশী উপাদান ও তথ্য পাওয়া যাবে যদি নবাবদের শাসনামল ও তাঁদের জীবনালেখ্য নিয়ে পৃথক পৃথক গ্রন্থ পড়া যায়। তাই আমি ইতহিাসের বিভিন্ন ধারার বই পড়ি ও এক বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বই পড়ি, যাতে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যায় এবং তা পর্যালোচনা করি যাতে একটা মৌলিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। যেমন প্রাচীন ভারত সম্পর্কে জানতে ‘প্রাচীন ভারত’, সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়, ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ১ম ও ২য় খন্ড’- সুনীল চট্টোপাধ্যায়, ‘ভারতের প্রাচীন অতীত’Ñ রামচরণ শর্মা, ‘ভারত ইতিহাসের আদি পর্ব ১ম খন্ড’-রণবীর চক্রবর্তী, ‘আদি ভারত, একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’Ñ গৌরী শঙ্কর দে, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আদি মধ্যযুগ’ গৌরী শংকর দে ও শুভ্রদীপ দে প্রাচীন ভারত সম্পর্কে রোমিলা থাপারের গ্রন্থসহ অনেক বই পড়তে হয়েছে। এভাবে এক বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের ইতিহাসের বই পড়তে গিয়ে অনেকের লিখায় সাম্প্রদায়িকার গন্ধ বেরিয়েছে। অনেকের লিখায় সুকশৌলে সত্যকে গোপন করে লিখা হয়েছে, অনেকের লিখায় শব্দ চয়নের তারতম্যে সত্য ইতিহাস লোপ পেয়েছে। সত্যকে গোপন করে মিথ্যা আরোপে কলম ধরা হয়েছে নতুবা সিলেবাসের মোড়কে গদবাঁধা ও ইংরেজদের চক্রান্তে লিখা ইতিহাস পড়ে লিখা হয়েছে মুসলমান ও মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপবাদ আরোপ এবং হিংসা বিদ্বেষ লক্ষ্য করে মর্মাহত হয়েছি।
শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে। একটি সুন্দর বই প্রতিটি মানুষকে সুস্থ সুন্দর অনুভূতি ও সুদূর প্রসারি চিন্তাশক্তি দান করে। শিক্ষার প্রভাবে, পুস্তকের আলোক বর্তিকায় মানুষের মনের অন্ধকারাচ্ছান্ন প্রভাব দূরীভূত হয়। তখনই কষ্ট পাই যখন একজন বুদ্ধিজীবী, একজন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ইতিহাসবিদ, প্রগতিশীল কেহ সাম্প্রদায়িক মনোভাবে নিমজ্জিত হয়ে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ায় এবং সত্য গোপন করে মিথ্যা আরোপে ইতিহাস রচনায় অনুগামী হন।
সাহিত্য সম্রাট, বিশ্বকবি, কবি সাহিত্যিকদের বিশেষত: বঙ্কিমের বইয়ের পরতে পরতে মুসলমানদের প্রতি হেয় করা, হিংসা বিদ্বেষপূর্ণ লিখার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার অনেক ইতিহাসবিদ সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের লিখায় মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপের জন্যই কলম ধরেছেন। আসুন আমরা ইতিহাসের নিরিখেই পর্যালোচনা করি। সাহিত্য সম্রাটে ভূষিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নোবেলজয়ী বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ অন্যান্য কবি সাহিত্যিকদের লিখায় মুসলমানদেরকে বিশেষ সংজ্ঞায় আখ্যায়িত করে কটাক্ষ করা হয়েছে। যেসব শব্দ দ্বারা হিংসার নিরিখে হেয় ও তুচ্ছ করা হতো মুসলমানদেরকে তা নি¤œরূপÑ
যবন, ম্লেচ্ছ, নেড়ে, বিদেশী, পাতকী, পাপিষ্ঠ, দুরাত্মা, নরাধম, নরপিশাচ, পাষন্ড, ধেড়ে, পাপাত্মা প্রভৃতি শব্দগুলো স্থান কাল ভেদে ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিটি শব্দ ও অর্থ নিশ্চয় পাঠকের উপলব্ধির উর্ধ্বে নয়। তবে যবন, বিদেশী, ম্লেচ্ছ ও নেড়ে সম্পর্কে আলোচনা করলে পাঠকের উপলব্ধি হবে, মুসলমানদেরকে যবন, নেড়ে, বিদেশী ও ম্লেচ্ছ সংজ্ঞায়িত করা যথার্থ কি না।
যবন, বিদেশী, ম্লেচ্ছ ও নেড়ে- এ শব্দগুলির আভিধানিক অর্থ কী? বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে আছে-
যবন-(অর্থ) প্রাচীন গ্রিক জাতি।
বিদেশী-(অর্থ) অন্যদেশের নাগরিক বা ভিন্ন দেশবাসী।
ম্লেচ্ছ- (অর্থ) তুচ্ছার্থে অনার্য জাতি।
নেড়ে – (অর্থ) অশ্রদ্ধাজনিত আক্রমণাত্মক উক্তিতে নিচু শ্রেণির মুসলমান।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রাচীন গ্রিক জাতি কারা? অন্যদেশের নাগরিক কারা? অনার্য জাতি কারা? বাঙালি মুসলমানদের হেয়-তুচ্ছ করে, প্রতি হিংসা পরায়ণ হয়ে সংজ্ঞায়িত করেছেন আমাদের প্রিয় হিন্দু ভাইয়েরা, যারা মুসলমানদেরকে মোটেই সহ্য করতে পারেন না। এ বিষয়ে (যবন ও ম্লেচ্ছ) কলিকাতা থেকে প্রকাশিত নতুন বাঙ্গালা অভিধানেও মুসলমানদেরকে অসম্ভব হেয় ও তাচ্ছিল্য করে অর্থ প্রদান করে বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে কোমলমতি ছাত্রদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে মুসলমানদের অবস্থান সম্পর্কে। পশ্চিম বঙ্গের পন্ডিত লেখক গোলাম আহমাদ মোর্তজা ‘যবন’ সম্পর্কে তাঁর ‘ইতিহাসের ইতিহাস’ গ্রন্থে (যাহা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে) লিখেছেন-
“হিন্দু ভাইয়েরা মুসলমানদেরকে বলেন, ‘যবন’- শব্দের অর্থ গ্রিক জাতি। অনেকের মতে, ভারতে মুসলমান আগমনের পূর্বে ‘যবন’ কথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস এখন যবন বলতে মুসলমানদের বোঝায়। ভাষা শিখতে হলে অভিধানের অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমাদের দেশের (ভারতের) পন্ডিতদের কল্যাণে অভিধানে ‘যবন’ শব্দের অর্থ যা পাওয়া যায়, অনেকের বিচারে তাও বিষাক্ত একং দুর্গন্ধময়- দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের বাধা স্বরূপ। নতুন বাঙ্গালা অভিধানে আছে ‘যবন’ মানে ‘অহিন্দু জাতি বিশেষ; ম্লেচ্ছ জাতি; বিধর্মী; অসদচারী; গ্রিক, আফগানিস্তান, আরব, পারস্য প্রভৃতি জাতির অধিবাসী। এরপর ‘কথিত আছে’ বলে যে তথ্যটি ঢুকানো হয়েছে তা যেন সারকুড়ের আবর্জনা। ছাত্র ছাত্রীদের পরিচ্ছন্ন হৃদয়ে বদ্ধমূল করিয়ে দেয়া হয়েছে মাত্র। যেমন- বশিষ্টের আশ্রমদ্রোহী বিশ্বামিত্রের সমস্ত সৈন্য পরাভূত করবার নিমিত্ত তার কামধেনু শবলার যোনিদ্বার হতে এর জাতি উৎপন্ন হয়। এতেও আশা মেটেনি। লেখক তখন ধর্মের বুলি শুনিয়েছেন, ‘বিষ্ণু পুরাণে যবন জাতির অন্যবিধ উক্তি আছে- সাগর রাজা কতগুলো লোককে গুরু অপরাধের জন্য মস্তক মুন্ডন করাইয়া ভারতবর্ষ হইতে দূরীভূত করে দেন; তারাই পরে যবন নামপ্রাপ্ত হইয়াছে।’ কিন্তু উইলসন সাহেবের মতে, ‘ব্যাকট্রিয়া হতে আয়োনা বা গ্রিক পর্যন্ত সমগ্র উপনিবেশের অধিবাসী গ্রিকদেরকে হিন্দুরা যবন বলতেন এবং ঔড়হরধ শব্দটি থেকে ‘যবন’ শব্দের উৎপত্তি।”
[সূত্র ঃ ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা, কথা সম্ভার ২০২২, পৃষ্ঠা- ৬২-৬৩]
ভারতবর্ষের প্রাচীন (আদি) অধিবাসী কারা
বাঙালি হিন্দু ভাইয়েরা উক্ত শব্দ সমূহ প্রয়োগ করেছেন বাঙালি মুসলমানদেরকে কটাক্ষ করে। অথচ আমরা সবাই বাঙালি জাতি অর্থাৎ এক জাতি, এক ভূখন্ড, এক ভাষা এক সভ্যতা ও সংস্কৃতি এক পাড়া, এক গ্রাম, এক প্রতিবেশী। অথচ কি কদর্য, তুচ্ছ তাচ্ছিল্যপূর্ণ শব্দ প্রয়োগ! আমরা হিন্দু মুসলমান যেহেতু এক ভাষাভাষী একজাতি তাহলে আমাদের নৃতাত্তি¡ক পরিচয় কী? বাঙালি হিন্দুর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় কী এবং বাঙালি মুসলমানের নৃতাত্তি¡ক পরিচয় কী? নৃতাত্তি¡ক পরিচয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে ‘যবন’ কারা হিন্দু ভাইয়েরা নাকি মুসলমানরা, ইতিহাসবিদ ভূতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত¡বিদদের মাধ্যমেই আমরা আলোচনা করবো। ভারতের ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার তাঁর গ্রন্থে প্রস্তরযুগীয় মেগালিথিক সভ্যতার পর থেকে (আর্যপূর্ব) জাতিগত অনুসন্ধানে ভারতীয় উপমহাদেশের জাতি সম্পর্কে লিখেছেন-
“ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান ছয়টি জাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। সবচেয়ে প্রাচীন হলো, নেগ্রিটা। তারপর এরো প্রোটো অস্টালয়েড। এরপর মঙ্গোলয়েড ও মেডিটেরেনিয়ান এর পরবর্তীরা আর্য সভ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
হরপ্পা অঞ্চলের প্রোটো অস্ট্রালয়েড, মেডিটেরেনিয়ান, আলপাইন ও মঙ্গোলয়েড মানুষের কঙ্গাল পাওয়া গেছে। অনুমান করা হয়, এই সময়ে উল্লিখিত প্রথম পাঁচটি জাতি ভারতবর্ষে স্থায়ীভাবে বসবাস করত। ভারতের অধিবাসীদের মধ্যে সংখ্যাধিক্য ছিল প্রোটো অস্ট্রালয়েড শ্রেণির লোকদের। এদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত। এর উদাহরণ পাওয়া গেছে কয়েকটি আদিম উপজাতির মুন্ডা ভাষার মধ্যে। মেডিটেরিয়ানি বা ভূমধ্যসাগরীয় জাতির প্রধান যোগ ছিল দ্রাবিড় সভ্যতার সঙ্গে। মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীর লোকের প্রধান বাসভূমি ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলগুলোতে। এদের ভাষার সঙ্গে চীন-তিব্বতীয় ভাষাগোষ্ঠীর সাদৃশ্য আছে। এদেশের সবচেয়ে শেষে জাতিগোষ্ঠীর আগমন, আমরা তাদের সাধারণভাবে আর্য বলে অভিহিত করি। প্রকৃতপক্ষে আর্য শব্দটি ইন্দো-ইউরোপীয় একটি ভাষা গোষ্ঠীর নাম, এটি আদৌ কোনো জাতিগত বিভাগের নাম নয়।”
[সূত্র ঃ ভারতবর্ষের ইতিহাস, রোমিলা থাপার, হাওলাদার প্রকাশনী, ২০২২, পৃষ্ঠা- ২২-২৩]
আর্য পূর্ব হরপ্পার পূর্বে কোন কোন জাতি গোষ্ঠী ভারতবর্ষে বসবাস করত সে সম্পর্কে ‘প্রাচীন ভারত’ গ্রন্থে কী লিখা হয়েছে? গ্রন্থটি বিশ্ববিদ্যালয় উপযোগী ইউজিসি নতুন পাঠক্রমে অনুসরণে লিখিত হয়েছে এবং কলিকাতার প্রগতিশীল প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত।
“ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিধ, নৃতত্ত্ববিধ সকলে হরপ্পা সভ্যতার উৎস সন্ধান করেছেন। বহু বছর ধরে পন্ডিতরা কয়েকটি সম্ভাব্য তত্ত্ব হাজির করেছেন হরপ্পা সভ্যতার উৎপত্তি ব্যাখ্যা হিসেবে। হরপ্পার উৎপত্তি সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা হল উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে বসবাসকারী ব্রাহ্মী জনগোষ্ঠী হল সভ্যতার স্রষ্টা। এই উপজাতির লোকেরা দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলত, এজন্য ধরে নেওয়া হয় এই সভ্যতা হল দ্রাবিড় জনগণের সৃষ্টি। হরপ্পা সভ্যতা ভূমধ্যসাগরীয় প্রোটো-অস্ট্রালয়েড (অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাষীদের সঙ্গে সাদৃশ্য যুক্ত) ও আলপনয়েড (আল্পস পর্বতমলার পাদদেশে বসবাসাী জনগোষ্ঠী) জনগোষ্ঠীর মানুষজনের প্রাধান্য ছিল। অনেক পন্ডিতদের বক্তব্য হল হরপ্পায় শুধু এই তিন জাতিগোষ্ঠীর লোকজন ছিল না, ছিল আরো অনেক জাতিগোষ্ঠীর লোক। বহু ধরনের জাতির লোক নিয়ে হরপ্পায় একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, কোনো একটি বিশেষ জাতির প্রাধান্য ছিল না।”
[সূত্র ঃ প্রাচীন ভারত, সুবোধ কুমার মূখোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা- ৫৪-৫৫, প্রগতিশীল প্রকাশক, ২০১৪ কলিকাতা]
পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যপুস্তক পর্ষৎ কর্তৃক প্রকাশিত ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ১ম খন্ড’ গ্রন্থে আর্য পূর্ব হরপ্পার জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়েছে-
“বাসামও (ঐতিহাসিক) হরপ্পার সংস্কৃতির দেশীয় উৎসে বিশ্বাসী। তিনি বলেছেন মধ্য প্রাচ্যের কাছে এর কোন ঋণ ছিল না। বিদেশাগত মানুষ এই সংস্কৃতির নির্মান করেনি। সিন্ধু উপত্যকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেসব মানুষ বাস করেছিল এ তাদেরই সৃষ্টি।” পৃষ্ঠা- ৩৯
“বেশীরভাগ ঐতিহাসিক মনে করেন যে, দ্রাবিড় জাতি হরপ্পা সংস্কৃতির স্রষ্টা। এই মতের অনুকুলে যে যুক্তিগুলি উপস্থাপিত করা হয়, সেগুলি বেশ জোরালো। বলা হয় যে, প্রাক-আর্য যুগের দ্রাবিড় জাতি সমগ্র ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। উত্তর পশ্চিম ভারত ও তাদের অধিকারের বাইরে ছিল না। আজও বেলুচিস্তানের পাহাড়ে দ্রাবিড় ভাষাভাষি ব্রাহুই উপজাতি বাস করে। আধুনিককালে দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে প্রধানত প্রোটো অস্টালয়েড (অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত) এবং মেডিটারেনিয়ান জাতির মিশ্রণ দেখা যায়। হরপ্পার ভাষা প্রাচীন তামিলের আদিমরূপ।” পৃষ্ঠা-৪০
“ঋক্ বেদে অনার্যদের উল্লেখ আছে, আর্যরা যাদের জয় করেছিল এবং দ্রাবিড়গণ অনার্য। ঐতিহাসিক জাঁ ফিলিওজা একটি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছেন, হরপ্পা সংস্কৃতি ছিল উন্নত ধর্মের। ভারতে আর্যপূর্ব জনগণের মধ্যে মুন্ডা এবং দ্রাবিড় এই দুইটি জনগোষ্ঠীই ছিল প্রধান। মুন্ডাদের কোন উন্নত সভ্যতা ছিল না, একমাত্র দ্রাবিড়দের ছিল।” পৃষ্ঠা ৪০-৪১
“… দ্রাবিড়দের যাঁরা ধ্বংস করেছিল, উক্ত ধ্বংসে যারা আক্রমণকারী এবং বৈদিক আর্যদের বলে বিভিন্ন মতের ব্যক্তিদের যুক্তি বেশ জোরালো। তারা কিছু সংখ্যক মাতার খুলতে ভারি অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন এবং সিন্ধুর ঝুঁকার এ প্রাপ্ত সীলের উপর সোজা ও ঋজু রন্ধ্রযুক্ত কুঠার চিত্রের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক খুঁজে পান। তারা বলেন, এই জাতীয় কুঠার ভারতের নিজস্ব সৃষ্টি নয়। এ উত্তর পশ্চিম ইরান থেকে ভারতে এসে ছিল এবং বৈদিক আর্যরাও ইরানের ঐ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল। সুতরাং আক্রমণকারী বৈদিক আর্যদের সঙ্গে এই কুঠারকে অনায়াসে যুক্ত করা চলে। তারা আর্যগণ এবং সিন্ধু উপাত্যকার মানুষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের স্মৃতিচিহ্ন আবিষ্কার করেন।… আর্যদের আক্রমণের ফলে সিন্ধু সভ্যতার সমাপ্তি ঘটেছিল।” পৃষ্ঠাÑ ৫০-৫১।
[সূত্র ঃ প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ১ম খন্ড, সুনীল চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা- ৩৯, ৪০-৪১, ৫০-৫১] (চলবে)
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাবন্ধিক