ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোনের ‘স্বর্গরাজ্য’

60

মনিরুল ইসলাম মুন্না

নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারে কম দামে পাওয়া যায় স্যামসাং, হুয়াওয়ে, রেডমি, আইফোনসহ নানা ব্র্যান্ড ও কোম্পানির মোবাইল। অথচ এসব ফোন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে চোরাই পথে আসে। এমনকি এসব ফোনগুলোতে নিরাপত্তা লক করা থাকলেও তা এখানকার টেকনিশিয়ানরা দ্রæততার সাথে খুলে ফেলতে সক্ষম হয়। গতকাল সোমবার রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী, গোয়েন্দা বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর-পশ্চিম) মোহাম্মদ আলী হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, ‘ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের চোরাই সিন্ডিকেটের সাথে সখ্যতা আছে বাংলাদেশি চোরাই ফোনের সিন্ডিকেটের সাথে। তারা মোবাইলগুলো নিয়ে এসে রিয়াজউদ্দিন বাজারের কয়েকটি দোকানে সরবরাহ করে দেয়। রিয়াজউদ্দিন বাজারে এরকম চারটি চক্র আছে। ভারতীয় মেয়েটির (দীপান্বিতা সরকার) ফোন উদ্ধার করতে গিয়ে আমরা এ চোর চক্রের সন্ধান পেয়েছি। তারা কোথায় কী করছে, তা আমাদের নজরদারিতে আছে। যদিও ভারতীয় মেয়েটির মোবাইল উদ্ধারের পর কয়েকজন দোকানদার তাদের দোকান বন্ধ করে পলাতক আছে, কিন্তু তারা কোথায় আছে, তা আমরা নজরদারিতে রেখেছি।’
ভারতের মেয়েটি কীভাবে বুঝতে পারলো ফোনটি চট্টগ্রামে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সচরাচর আইফোন ব্যবহারকারীর তথ্য-উপাত্ত আই ক্লাউড একাউন্টে সংরক্ষিত থাকে। আমাদের দেশের জনসাধারণ ফোন হারিয়ে যাওয়ার পর আই ক্লাউড বন্ধ করে দেয়। অথচ আই ক্লাউড খোলা থাকলে ফোনটি ট্র্যাক করার সুযোগ থাকে। যেটা আমরা করি না বা করতে জানি না। সেটা ভারতীয় মেয়ে দীপান্বিতা করতে পেরেছে। তিনি ক্লাউড একাউন্ট চেক করে বুঝতে পারে, মোবাইলটি চট্টগ্রামে রয়েছে। তখন আমরা খবর পেলে সেটি উদ্ধার করতে সক্ষম হই। এছাড়াও কিছুদিন আগে আমাদের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের একটি ফোন চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে গেলে আমরা সেটা ভুটানের রাজধানী থিম্পু’র একটি দোকান থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হই। সে ফোনটাও রিয়াজ উদ্দিন বাজারের চোর চক্রটি পাচার করে।’
ভারতের ফোনগুলো এ দেশে এসে কম দামে বিক্রি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কম দামে ভাল ফোন পেতে রিয়াজউদ্দিন বাজারে যাই। কম দামে ফোনও পেয়ে যাই। আসলে এসব ফোন ভারত থেকে চোরাই পথে আসা। জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ থাকবে- আপনারা মোবাইল কেনার আগে একটু সাবধান হবেন। মোবাইলের বক্স এবং কাগজপত্র ছাড়া মোবাইল কিনতে যাবেন না। সন্দেহ মনে হলে পুলিশের সহায়তা নিবেন।’
রিয়াজউদ্দিন বাজারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এখানে ভারত, আরব আমিরাত, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশের চোরাই মোবাইল আসে। এখানকার দক্ষ টেকনেশিয়ানরা কান্ট্রি লকসহ যেকোনো লক খুলতে সক্ষম। তাদের কাছে এমন এমন প্রযুক্তি রয়েছে, যা দেশের অন্য কোথাও নেই। এমনকি রিয়াজউদ্দিন বাজারে এমন একজন টেকনেশিয়ান আছে, যিনি আইফোনের লক পর্যন্ত খুলতে সক্ষম।
গত রবিবার সিএমপি’র মিডিয়া শাখা থেকে জানা গেছে, ভারতীয় তরুণীর হারিয়ে যাওয়া একটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে নগরীর কোতোয়ালী থানা এলাকা থেকে।গত ৬ জুন থানার রিয়াজউদ্দিন বাজারের জলসা মার্কেট থেকে মোবাইলটি উদ্ধার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম। এরপর আইনি প্রক্রিয়া মেনে রবিবার ভারতের কলকাতায় মোবাইলটি পৌঁছে দেয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
গোয়েন্দা বিভাগ উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. রবিউল ইসলাম পূর্বদেশকে বলেন, ‘আইফোন ১৪ প্লাস মোবাইলটির মালিক পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বাসিন্দা দীপান্বিতা সরকার। তিনি একটি মেডিকেলে স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে ৭টা ৫ মিনিটের মধ্যে কলকাতার মহেশতলা থানা এলাকায় তিনি মোবাইলটি হারিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী দীপান্বিতা মহেশতলা থানায় একটি অভিযোগ করেন। কিছুদিন পরে দীপান্বিতার কাছে একটি ই-মেইল যায়। এতে তিনি জানতে পারেন হারানো মোবাইলটি চট্টগ্রাম শহরে চালু হয়েছে। তখন তিনি সিএমপির অফিসিয়াল পেজে যোগাযোগ করে তার অভিযোগের কপি ও মোবাইল চালু হওয়ার লোকেশন পাঠান। মেসেজ পেয়ে সিএমপির পক্ষ তাকে আশ্বস্ত করা হয় মোবাইলটি উদ্ধারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর হারানো মোবাইল উদ্ধার করতে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই মোবাইলটি এখানে আসলেও এতে কোনো সিম ঢুকানো হয়নি। তাই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তদন্ত শুরু করি। যেহেতু মোবাইলের লোকেশন রিয়াজউদ্দিন বাজারের জলসা মার্কেটে দেখানো হয়েছে, সেটিকে সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করি। প্রথমে রিয়াজউদ্দিন বাজারে কারা ভারত থেকে চোরাই মোবাইল আনে তার খোঁজ নিয়ে তালিকা প্রস্তুতি করি। এ তালিকায় চারজনের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনজনই তামাকুমÐি লেন এলাকার। বাকি একজন হলেন জলসা মার্কেটের। এ কাজে আমার ৭-৮ দিন সময় লাগল।
তিনি আরও বলেন, শনাক্ত হওয়ার পর আমরা জলসা মার্কেটে টার্গেট করা দোকানে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিষয়টি টের পেয়ে অভিযুক্ত দোকান মালিক ফোনটি একজন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। গত ৬ জুন মোবাইলটি আমরা পাই। এরপর থেকে জলসা মার্কেটের ওই দোকানটি বন্ধ রয়েছে। আমরা শিগগিরই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করব। এছাড়াও রিয়াজউদ্দিন বাজারে চোরাই মোবাইলের মার্কেটে বড় অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এসআই রবিউল বলেন, একমাস আগে উদ্ধার হলেও ভারতীয় নীতিমালার কারণে কোনো মাধ্যমে মোবাইলটি ওই দেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ ভারতে ব্যবহৃত মোবাইল পাঠানোর নিয়ম নেই। একপর্যায়ে গত রবিবার আমাদের বিশ্বস্ত এক লোকের মাধ্যমে মোবাইলটি ওই তরুণীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। হারানো মোবাইল অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে পেয়ে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছেন এবং পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
রবিউল বলেন, দীপান্বিতার মোবাইল তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জানতে পারি, ভারত থেকে ফোনগুলো কুমিল্লা এবং রামগড় দিয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজারে চলে আসে। ভারতের চোরাই চক্রের সাথে দেশের চোরাই চক্রের আঁতাত রয়েছে। সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০টি মোবাইল রিয়াজউদ্দিন বাজারে আসে। আসার সাথে সাথে এসব মোবাইল প্রতিটি দোকানে চলে যায়। যেসব ফোন লক করা থাকে সেগুলো দ্রুততার সাথে লক খুলতে সক্ষম হয়। পরে দেশের বাজারে এসব মোবাইল কম দামে বিক্রি করে।