বিদেশিদের হাতে বন্দর ব্যবস্থাপনা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

0

‘চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাই আমরা মনে করি বন্দর নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে তা জাতির সামনে খোলাসা করা উচিত। বিশেষ করে বন্দর পরিচালনার ভার বিদেশিদের দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ বিবেচনা আরও জরুরি। আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই অতীতেও জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি জনগণ। তার ফলে তৎকালীন সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল।’
গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ১০ বিশিষ্টজনের দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়। বিবৃতিদাতারা হলেন-আবুল মোমেন, ড. মঈনুল ইসলাম, ফেরদৌস আরা আলীম, শিশির দত্ত, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, ওমর কায়সার, কমল সেনগুপ্ত, কামরুল হাসান বাদল, অলোক রায় ও দেলোয়ার মজুমদার
তাঁরা বলেন, বর্তমান সরকার একটি ইন্টেরিম বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বন্দর পরিচালনার মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্ব এ সরকারের নয়। এমন চুক্তি করতে পারে শুধুমাত্র জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকার। সরকার ফেব্রæয়ারিতে নির্বাচন দিতে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। সে ক্ষেত্রে একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগেভাগে খুব তড়িঘড়ি করে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে জাতির মানসে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বন্দরের সঙ্গে ডেনমার্কের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালসের ৩৩ বছর মেয়াদি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে গত সোমবার। এই মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকছে চুক্তিতে। একই দিন কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল নিয়েও চুক্তি হয়েছে। পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর মেয়াদে পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এস এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে’।
বিবৃতিতে তাঁরা আরও বলেন, লালদিয়ার প্রকল্পে বাংলাদেশের পক্ষে মধ্যস্থতাকারী (ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার) বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) প্রতিবেদনে টার্মিনাল অপারেটরের (এপিএম টার্মিনালস) প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর চুক্তি পর্যন্ত কার্যক্রম শেষ করতে ৬২ দিন সময়সীমা ধরা হয়েছিল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক দ্রুততায় মাত্র দুই সপ্তাহে এই কার্যক্রম শেষ করেছে। এতেও জনমনের সন্দেহ গভীর হয়েছে। এই ধরনের চুক্তি খুব সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়। কারণ, চুক্তির কোনো শর্তের কারণে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত না হলে পরে তার খেসারত দিতে হতে পারে। যার বড় উদাহরণ রয়েছে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে। দেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ায় ২০০৪ সালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি জিবুতি সরকার বাতিল করলেও ডিপি ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাতে উল্টো জিবুতি সরকারের বিরুদ্ধে সুদসহ ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং স্বত্ব বাবদ আরও ১৪৮ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের নির্দেশ আদায়ে তারা সক্ষম হয়। এ ধরনের চুক্তির ফলে বিশ্বের বহু দেশের একই রকম খেসারত দেওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক।
বিভিন্ন দেশের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা প্রশ্ন তুলতে চাই চুক্তিতে টার্মিনেশন, ক্ষতিপূরণসহ যেসব আর্থিক বিষয়াদি রয়েছে তা কেন গোপন রাখা হল? এবং দেশীয় স্বার্থ জড়িত রয়েছে এমন শর্তগুলো প্রকাশ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
তাঁরা বলেন, সামনে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। নিউমুরিং টার্মিনালটি দেশীয় জনবল দিয়ে লাভজনকভাবেই পুরোদমে চালু আছে। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান এটি পরিচালনা করছে। প্রশ্ন হলো লাভজনকভাবে চালু টার্মিনালটি কেন আমরা বিদেশিদের দেবো। যেখানে কোনো নতুন বিনিয়োগের সুযোগ নেই? বর্তমান সরকারও কেন বিগত সরকারের পথে হাঁটবে সে প্রশ্নও সঙ্গতভাবেই উঠছে।
বন্দরের হাতে আর মাত্র দু’টি টার্মিনাল আছে জানিয়ে তাঁরা বলেন, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল- এই দুটো পরিচালনা করছে দেশীয় অপারেটররা। এর মধ্যে চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালেও বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে দুই বিদেশি কোম্পানি। এটিও যদি চলে যায় তাহলে হাতে থাকবে শুধু জেনারেল কার্গো বার্থ বা জিসিবি। এটি সবচেয়ে পুরোনো। তাঁরা বলেন, গ্রিনফিল্ডে টার্মিনাল নির্মাণে বিনিয়োগ আসবে সন্দেহ নেই। বে-টার্মিনালেও বিদেশিরা বিনিয়োগ করবে। তবে এখন চালু টার্মিনালগুলো যেভাবে বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানই দাঁড়াতে পারবে না। অর্থাৎ বন্দর খাতে আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা তৈরির কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ধরনের সিদ্ধান্তকে দেশের স্বার্থবিরোধী তাই আত্মঘাতী বলেই অভিহিত করা ছাড়া উপায় থাকে না। একই সাথে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল মাশুল বাড়ানো বা এ ধরনের কোন সংকটের সময় দেশীয় প্রতিষ্ঠান বা নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থাকলে তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে সুযোগ থাকে তা থাকবে না। পুরোটাই যদি বিদেশিদের হাতে চলে যায় তখন সংকট থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আমাদের হাতে থাকবে না। জাতি বিদেশি অপারেটরদের কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে।
এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার একটি ইন্টেরিম সরকারের নেই সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমরা বলতে চাই- এই চুক্তি আত্মঘাতী, দেশের স্বার্থবিরোধী। সরকারের এ ধরনের ন্যক্কারজনক ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে আমরা জনগণের দরবারে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ চুক্তি দু’টি বাতিলের জন্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আবেদন জানাই। বিজ্ঞপ্তি