বিএনপির মনোনয়ন যুদ্ধে তিন হেভিওয়েট নেতা

10

এম এ হোসাইন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অন্যতম ‘ভাগ্য নির্ধারক’ আসন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে এখন নির্বাচনী উত্তাপ তুঙ্গে। ‘যে দল আসনটিতে জিতে, সেই দলই সরকার গঠন করে’ এমন বিশ্বাস দীর্ঘ তিন দশকের নির্বাচনী ইতিহাসকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। এ কারণে এবার এই আসনে সবচেয়ে বেশি সরব ও সক্রিয় হেভিওয়েট প্রার্থীরা। বিশেষ করে বিএনপি এই আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর আবার স্থগিত করায় দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মাঝে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এ আসনে কে পাচ্ছেন ধানের শীষের টিকিট এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা।
জান গেছে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। দল এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে মনোনয়ন না দিলেও হেভিওয়েট নেতারা কেন্দ্রের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মাঠে তৎপরতা বাড়িয়েছেন। এমনকি দলের তিন নেতা একই দিনে, একই সময়ে একই আসনের পৃথক স্থানে গণসংযোগও করেছেন।গত শনিবার চকবাজার, কাপাসগোলা ও কলেজ রোড এলাকায় তারেক রহমান প্রদত্ত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতে ৩১ দফার লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহব্বায়ক আবু সুফিয়ান। তিনি ধানের শীষে ভোট দিয়ে তারেক জিয়ার নেতত্বে দেশকে এগিয়ে নিতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহবান জানান। এসময় তার সাথে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ছিলেন।
একই দিন একই সময়ে পাথরঘাটা আনসার ক্লাব থেকে শুরু করে বান্ডেল রোড, মা ভবন, ইকবাল রোড হয়ে পুরাতন ফিশারিঘাট এলাকায় গণসংযোগ করেন মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর। তার সঙ্গেও ছিলেন দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। তিনি জনগণকে ৩১ দফার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহবান জানান।
অপরদিকে একই সময়ে ফিরিঙ্গিবাজারের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে তিনি লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি জনগণের সাথে মতবিনিময় করেন এবং দেশের উন্নয়নে দলের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন। তিনজনের এই আলাদা আলাদা গণসংযোগ বিএনপির অভ্যন্তরে ধানের শীষের টিকিট পেতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার বার্তা দেয়।
এদিকে চট্টগ্রাম-৯ আসনকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হয় ‘ভাগ্যবান আসন’। এ আসন থেকে যারা নির্বাচিত হন তারা সাধারণত মন্ত্রিসভায় স্থান পান। ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইতিহাসও তাই বলছে। এবার আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহব্বায়ক আবু সুফিয়ান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম, নগর বিএনপির যুগ্ম আহব্বায়ক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল, যুগ্ম আহব্বায়ক এস এম সাইফুল আলমসহ প্রয়াত নেতা আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান। এদের সবাই এখন ভোটের মাঠে সক্রিয়।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই চট্টগ্রাম-৯ আসনে তাদের প্রার্থী হিসেবে ডাক্তার এ কে এম ফজলুল হককে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প চালিয়ে এলাকার জনগণের কাছে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে ব্যস্ত। পাশাপাশি নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী এডভোকেট মোহাম্মদ নেজাম উদ্দীনও বই মার্কা নিয়ে এলাকায় গণসংযোগ জোরদার করেছেন।
এই আসনে এনসিপির দুই নেতার নাম আলোচনায় আছে। তারা হলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন ও মীর মোহাম্মদ শোয়াইব। সব মিলিয়ে এবার চট্টগ্রাম-৯ আসন হবে বহু-মেরুকেন্দ্রিক লড়াই।
ধানের শীষের প্রার্থী হতে দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুল আলম বলেন, দল কাকে মনোনয়ন দিচ্ছে সেটা তো নিশ্চিত করে বলা যায় না, এটা নির্ভর করে এলাকাবাসী কাকে চাচ্ছে তার উপর। স্থানীয় বাসিন্দাদের এখানে বড় একটি প্রভাব রয়েছে। আমি বাকলিয়ার সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে এখানে রাজনীতির সাথে জড়িত। রাজনীতির কারণে আমাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়েছে, আমার ছেলেকে ঘুম করেছে। আমি জেলে গেছি, দলকে কখনো ছেড়ে যাইনি। এই বাকলিয়া, কতোয়ালীর অধিকাংশ লোকজন আমাদের আত্মীয়স্বজন। আমি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করি। বাকিটা দল সিদ্ধান্ত নিবে।
আসনটিতে বিএনপি প্রথমে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহব্বায়ক আবু সুফিয়ানকে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে আবার প্রার্থীর নাম স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এরপরও মাঠে সক্রিয় আছেন আবু সুফিয়ান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার আসনটি স্থগিত ঘোষণা করেছে। আশাকরি দ্রুত সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি এখন নিয়মিত ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছি। আমি কনফার্ম ধানের শীষের প্রার্থী হবো।
নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর নিয়মিত এলাকায় প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আশাবাদী দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। আমি স্থানীয় মানুষ, এখানেই আমার বসবাস। নিয়মিত দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। ১৬ বছরে সাতবার জেলে গেছি। দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। আশা করি দল সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করবে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে দলের ভিতর শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর এলাকায় পৃথক পৃথক গণসংযোগ ভোটারদের মাঝে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে মরিয়া এসব নেতা। তবে আসনটিতে বিএনপি যতদিন মনোনয়ন চূড়ান্ত না করবে, ততদিন এ উত্তাপ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে আবদুল্লাহ আল নোমান এই আসন থেকে বিএনপির টিকিটে বিজয়ী হয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এখান থেকে আওয়ামী লীগের এম এ মান্নান বিজয়ী হয়ে মন্ত্রী হন। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান বিজয়ী হয়ে হন খাদ্যমন্ত্রী। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম বিএসসি বিজয়ী হয়ে হন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টির জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু বিজয়ী হন এখানে। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগের টিকিটে বিজয়ী হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।