
সনেট দেব
বাংলাদেশ, নদীমাতৃক এই দেশ, যার উর্বর মাটি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সমাহারে দেশের মানুষ বছরের পর বছর ধরে কৃষিজীবনে নির্ভরশীল। নদী, খাল, জলাশয়-সবই মানুষের জীবনযাত্রার অঙ্গ। কিন্তু আজ সেই নদী, সেই জমি, সেই জলাশয়ই ধীরে ধীরে মানুষকে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান, নদীর লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা-এসবের মিলিত প্রভাবে দেশের জনজীবন আজ এক অবিরাম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত নয়; এটি অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত, সামাজিক এবং মানবিক সংকটের বহুমাত্রিক বাস্তবতা।
দেশের উপক‚লীয় ১৯ জেলা বিশেষত ঝুঁকির সামনের সারিতে। সমুদ্রের পানি ক্রমবর্ধমানভাবে ভেতরে ধাবিত হচ্ছে। ধানক্ষেত, সবজিবাগান, পুকুর এবং মিঠাপানির উৎস-সবই এখন বিপর্যস্ত। সাতক্ষীরা, খুলনা, ভোলা এবং পটুয়াখালীর মানুষের প্রতিদিনের জীবন লবণাক্ত পানির সঙ্গে লড়াই করে কাটছে। পানির এই উচ্চ লবণাক্ততা শুধু কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, মানুষের স্বাস্থ্যও ভাঙছে। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা, ত্বকের রোগ, গর্ভবতী নারীর ঝুঁকি, শিশুদের অপুষ্টি-সবই দিন দিন বাড়ছে। পানি এই মানুষের কাছে আশীর্বাদ নয়, বরং প্রতিদিনের এক নীরব বিষে পরিণত হয়েছে।
কৃষিজমির উপর লবণাক্ততার প্রভাব এতটাই প্রকট যে প্রচলিত ফসলের উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও লবণ-সহনশীল ফসল উদ্ভাবিত হয়েছে, তা যথাযথভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আয়ে টান পড়ছে, এবং অনেক কৃষক বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে। উপক‚লের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি এক নতুন স্তর যুক্ত করছে। ঘূর্ণিঝড় যেমন সিডর, আইলা, রোয়ানু বা ফণী-প্রতিটি ঝড় উপক‚লের মানুষের জীবনকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। একদিনের ধ্বংসযজ্ঞ বহু বছরের সংগ্রামের ওপর প্রভাব ফেলে। ঘরবাড়ি হারানো, ফসল নষ্ট হওয়া, মাছের ঘের ভেসে যাওয়া, পশুপালন ধ্বংস হওয়ার ফলে দারিদ্র্য বাড়ছে। নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে সংকটের ছায়ায়। উপক‚লের মানুষ তাই বলে, “ঝড়ের দিন ভয় লাগে না, ভয় লাগে ঝড়ের পরের দিনগুলোর কথা।”
নদীভাঙন বাংলাদেশের আরেক বড় বাস্তবতা। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা-প্রতিটি নদী প্রতিবছর হাজার হাজার একর জমি গিলে নিচ্ছে। যে জমি ছিল, আজ সে আশ্রয়কেন্দ্রে; যে কৃষক পরিবারের ইতিহাস জমির সঙ্গে বাঁধা ছিল, সে আজ শহরের রাস্তায় রিকশা চালাচ্ছে। নদীভাঙন শুধু ভৌগোলিক সীমানা মুছে দিচ্ছে না, মানুষের পরিচয়, স্মৃতি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তিও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এই ভাঙনের প্রবণতা দেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ভয়াবহভাবে বাড়িয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং গাজীপুরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, শহরের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাড়ি-ঘর হারানো মানুষ কেবল শারীরিকভাবে স্থান পরিবর্তন করছে না, তাদের সামাজিক ও মানসিক জীবনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছোট শিশুদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বয়স্ক মানুষ মানসিক চাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য শহরে সঠিক আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ সীমিত। ফলে তারা নতুন শহরের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছে না, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও দারিদ্র্য আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকেও তীব্র করছে, যেখানে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন।
শহরে এসে মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে আরেক ধরনের বিপর্যয়ের-প্রচন্ড গরম। ঢাকার তাপমাত্রা গত দশ বছরে বেড়েছে দুই থেকে তিন ডিগ্রি। অতিরিক্ত গরমে নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, পথের বিক্রেতারা তাদের কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরাÑএসব এখন খুব সাধারণ সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এ ক্ষতি যদি বাড়তে থাকে, তাহলে শহরের শ্রমবাজার ও উৎপাদনশীলতা গভীর সংকটে পড়বে।
উত্তরাঞ্চলের খরাও ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। বোরো ধান চাষের খরচ বেড়ে গেছে, সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, মাটির উর্বরতা কমছে। কৃষক দ্বিমুখী সংকটে পড়ছে, উৎপাদন কমছে, খরচ বাড়ছে এবং ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওরাঞ্চলের মানুষ বর্ষায় অন্য চিত্র দেখছে। সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বাঁধ ভাঙলে কয়েক ঘন্টার মধ্যে হাজার হাজার একর জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। হাওরবাসীর কাছে বর্ষা মানে সুন্দর দৃশ্য নয়, বরং ক্ষুধা, ঋণ এবং অনিশ্চয়তার আতঙ্ক।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বেড়েছে। অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের কারণে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। কৃষকরা উচ্চ খরচে ফসল ফলাচ্ছেন, অথচ আয়ের নিশ্চয়তা নেই। খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পেলে দেশের শিশু ও দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার ও বিজ্ঞানীরা বলছেন, টেকসই কৃষি প্রযুক্তি, লবণসহনশীল ফসল ও নতুন সেচ ব্যবস্থা ছাড়া ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
জলবায়ু বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারীরা। উপক‚লীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি সংগ্রহ করা, আশ্রয়কেন্দ্রে অনিরাপদ পরিবেশ, ঘর-সংসার চালানোর বাড়তি চাপ, গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি-সবক্ষেত্রে নারীরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে। দুর্যোগ-পরবর্তী খাদ্য ঘাটতি তৈরি হলে প্রথমে নারীরা নিজের খাবারের অংশ কমিয়ে দেন। জলবায়ু পরিবর্তন তাই লিঙ্গ-বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
শহরের সমস্যাও কম নয়। নগরায়ণের বাইরে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যায়। খাল-নদী দখল, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা-সব মিলিয়ে জলবায়ুর ক্ষুদ্রতম প্রভাবও শহরে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জলাবদ্ধতা শুধুমাত্র যানজট বা দৈনন্দিন দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে না, এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষাব্যাঘাত, ব্যবসায় ক্ষতি এবং মানসিক চাপও বাড়াচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ জলবায়ুর কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা শহরের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। জলবায়ু পরিবর্তন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেই নতুন করে রূপ দিচ্ছে।
সমাধান অবশ্য বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। কৃষিতে টেকসই প্রযুক্তি প্রয়োগ, লবণসহনশীল ফসল উদ্ভাবন, মাটির উন্নয়ন এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়ন ছাড়া উপক‚লীয় অঞ্চলকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। আধুনিক পোল্ডার নির্মাণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্গঠন, জলাধার সংরক্ষণ, নদী পুনরুদ্ধার এবং শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার সময়সাপেক্ষ হলেও ভবিষ্যত সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। দুর্যোগ–পরবর্তী পুনর্বাসনে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান সব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও অর্থায়ন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের সীমিত সম্পদে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, জলবায়ু ক্ষতিপূরণ, প্রযুক্তি সহায়তা ও উন্নত দেশগুলোর নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া বাংলাদেশে জলবায়ু ঝুঁকি প্রশমন কঠিন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, জনগণ ও এনজিওদের সমন্বিত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি, জীবনধারণ ও পুনর্বাসন কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। বৈশ্বিক জলবায়ু নীতি ও অর্থায়ন যদি সঠিকভাবে বাংলাদেশে পৌঁছায়, তবে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনমান রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা প্রমাণ করছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কৃষক, জেলে, শ্রমিক, নারী, শিশু-সবাই অদৃশ্যভাবে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছেন। যে পরিবার গতকাল গ্রামে বাস করত, আজ শহরের বস্তিতে টিকে থাকার লড়াই করছে। যে শিশু ঘূর্ণিঝড়ের শব্দে বড় হচ্ছে, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ শুধু দুর্যোগ-পীড়িত দেশ নয়; এটি সংগ্রামী মানুষের দেশ, যেখানে প্রতিদিন মানুষ লড়াই করে নিজের ভবিষ্যত নির্মাণ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলায় বিজ্ঞান, নীতি, মানবিকতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ-সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। এটাই টিকে থাকার পথ, এটাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়। আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করা, উপক‚লীয় মানুষের জীবন-সংগ্রাম সহজ করা এবং দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখা-এখন একান্ত প্রয়োজন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট










