বর্ষায় গাছ লাগান

7

মুশফিক হোসাইন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বৃক্ষ রোপণের হিড়িক লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ লাগাচ্ছেন আন্তরিকভাবে কেউ আবার ঘটা করে ফটো সেশন করে। যেভাবেই হোক বৃক্ষ রোপণ মহৎ কাজ। কিন্তু এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে আমরা নিজের অজান্তে প্রতিবছর অসংখ্য চারাগাছ হত্যা করে ফেলি। শহরের আইল্যান্ড, রোড ডিভাইডার, ফুটপাতসহ বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো হয়ে থাকে। এবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০২৩ সাল বর্ষবরণ উপলক্ষে ২৩ লাখ চারা লাগানোর ঘোষণা দিয়েছেন। লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভুল জায়গায় ভুল গাছ লাগানো হচ্ছে। আবার অতি উৎসাহী কেউ কেউ জিওব্যাগে নিম, কাঁঠালি চাঁপাসহ নানান গাছ লাগিয়েছে। ফুটপাতে লাগানো জিও ব্যাগ ঐ গাছের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না। আমাদের ভাবতে হবে কোয়ায় কি গাছ লাগানো যাবে। এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে এবং পত্রিকায় কলামের মাধ্যমে বলার চেষ্টা করেছি। হা তমেম্মি! সব গুড়ে বালি। প্রশ্ন হলো আমি ইচ্ছে করলে যেখানে সেখানে গাছ লাগাতে পারি না। লাগালে সামান্য ঝড় বাতাসে জান মালের ক্ষতি তো হবেই সাথে গাছটি চিরতরে মারা যাবে।
মানব প্রজাতির সাথে জীববৈচিত্র্যের নিবিড়তম সম্পর্ক আছে। প্রাণী ও উদ্ভিদ এবং তাদের বাসস্থান ও জিনসমূহের সাথে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের সহ অবস্থান। পৃথিবীর অগনিত উদ্ভিদকুল, প্রাণীকুল ও অনুজীবকুল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় একত্রিত হয়ে পরিবেশকে মানুষসহ সকল জীবের বাসযোগ্য করে তোলে। এই জীববৈচিত্র্যকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে মানুষেরা কার্যত: নিজেদের ক্ষতিই ডেকে আনছেন। ভুলে গেলে চলবে না যে, জীববৈচিত্র্যের প্রধান নিয়ামক হলো উদ্ভিদকূল। যার আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে মানব জাতিসহ প্রাণী ও অনুজীবের বাস। উদ্ভিবকুল আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে। সকল প্রাণীর জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ-বৃক্ষ নিধন। ফলতঃ বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসের জন্য বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলি জনসংখ্যার আবাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে চলছে। বস্তুত: যে হারে বৃক্ষ, জমি নিধন হচ্ছে সে হারে বৃক্ষ বাড়ছে না। দেশে দেশে তাই বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি পালিত হয়। আমাদের বাংলাদেশ তার ব্যক্তিক্রম নয়। প্রশ্ন হলো কোথায় কি গাছ লাগাবেন। সে সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে। যত্র যে কোন গাছ লাগানো উচিত নয়। স্থান ও উপযোগীদের ভিত্তিতে গাছ নির্বাচন করতে হবে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক; বেশি পানি সহ্য করতে পারে না এমন স্থানে এমন প্রজাতির পানির ধারে লাগানো উচিত নয়। আবার পুকুর পাড়ে পাতা ঝরা গাছ লাগানো যাবে না। বৈদ্যুতিক তারের নিচে, রোড ডিভাইডার, আইল্যান্ড এবং ফুটপাতে ইত্যাদি স্থানে বেশি ডালপালা ছড়ায় বা উচ্চতা বেশি হয় এমন গাছ লাগানো উচিত নয়। আবার সবগুলো এক প্রজাতির না লাগিয়ে মিশ্র প্রজাতির গাছ লাগালে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠ কবরস্থান ও পার্কে গাছ লাগানোর জন্য টাউন প্ল্যানার বা নৈসর্গবিদ এর পরামর্শ গ্রহণ করা উত্তম। বসতবাড়ি ও সৃজিত বাগানে ও গাছ লাগাতে হবে পরিকল্পনা মতো। বিশেষ করে পরিচর্যা করতে যাতে কোন সমস্যা না হয় সে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বর্ণনা করা যাক কোথায় কি গাছ লাগাতে হবে।
বাড়িঘরের আশেপাশে উপযোগী গাছগুলি হল, ফলজ ও কাষ্ঠল বৃক্ষ, আঙ্গিনায় লাগাতে হবে ঔষধি, পুষ্পজ ও সবজির চারা। বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড় লাগানো উত্তম। পুকুর পাড়ে পেঁপে কুল, লেবু ও ছোট আকারের গাছ। তবে খেয়াল রাখতে হবে দেশীয় গাছ গাছড়ার প্রতি শহরের ফুটপাত, আইল্যান্ড, ডিভাইডারে লাগাতে হবে ছোট ও মাঝারি আকারের লতা ও গাছ। যাতে সারা বছল ফুল ফোটে। মৌসুমে সৌমুসে পুরো এলাকা যাতে সুঘ্রাণে মৌ মৌ করে নগরবাসীদের মনে প্রাণে প্রফুল্লতা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে এ সকল স্থানে উঁচু বৃক্ষ জাতীয় গাছ লাগানো যাবে না। প্রথমতঃ উপরের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কারণে প্রতি বছর বিদ্যুৎ কৃর্তপক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করার জন্য গাছের ডালপালা ছাঁটা হয়। দ্বিতীয়তঃ ঝড়ে বা দমকা হাওয়ায় গাছ ভেঙ্গে সড়কের উপর পড়ে জানমালের ক্ষতির সম্ভাবনা ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ, সরকারি অফিস-আদালত, শ্মশান, কবরস্থান ইত্যাদি স্থানে দেশীয় ফলজ ও পুষ্পজ বৃক্ষ লাগাতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে খেলার মাঠে বড় জাতের বৃক্ষ না লাগানোই শ্রেয়। ধানী জমি বা সবজিচাষের মাঠেও বড় আকৃতির গাছ লাগানো যাবে না। অতএব সামনের বর্ষায় অর্থাৎ জুন-জুলাই বা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে গাছ লাগানো উত্তম। তবে গাছ লাগানো শেষ কথা নয়। তার নিরাপত্তা ও যতœআর্তি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিশু-কিশোরদের বৃক্ষ রোপণে উৎসাহিত করুন।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)