দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ চট্টগ্রাম বন্দরকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আসলে কি করতে চাচ্ছে, তা নিয়ে একধরণের ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। গত মাসে বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রায় ৪০ভাগ ট্যারিফ বৃদ্ধি করেছে। এ নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী সমাজ ও তাদের সংগঠন, শিল্পপতি, সিএনএফ ফার্মের বিভিন্ন সংগঠন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন সংগঠন সংস্থা আন্দোলন করে আসছে। এধরনের একটি সংকটের সুরাহা হওয়ার আগেই সরকার দুইটি কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় এক বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের খবর পাওয়া গেছে।
এর আগে দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কন্টেইনার স্থাপনা-নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা শোনা গিয়েছিল। জানা যায়, টার্মিনালগুলো ২২ থেকে ৩০ বছর মেয়াদের চুক্তিতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। টার্মিনালগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল, ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে নির্মিত পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার লালদিয়া চর কন্টেইনার টার্মিনাল। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ইজারা দেয়ারও পাঁয়তারা চলছে। সব মিলিয়ে সাতটি টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে গেলে বন্দরের হাতে থাকাবে শুধু মান্ধাতা আমলের সেই জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। গতকাল ঢাকার একটি হোটেলে বেশ কিছু চুক্তির কথা জানা গেলেও গণমাধ্যমে পুরোটা প্রকাশিত হয়নি। ফলে এখনও সঠিকভাবে জানা যাচ্ছেনা আদৌ কোন টার্মিনালগুলো নিয়ে চুক্তি হচ্ছে। তবে দৈনিক পূর্বদেশে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল এর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি বৈশ্বিক লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান মেডলগকে দেয়ার কথা প্রকাশ করেছে। কোম্পানির সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি ২২ বছরের জন্য করা হয়েছে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন, বন্দরের স্থাপনা বা টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করার কোন এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সকারের আছে কিনা, তা বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। ইতোমধ্যে বন্দরসংশ্লিষ্ট মহলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীরা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশিদের সাথে চুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং অর্থ-বাণিজ্যিক স্বার্থের নিরিখে কন্টেইনার টার্মিনাল এভাবে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া একেবারেই সমীচীন নয়। গত ১২ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের কমিটির এক সভায় চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিঘীর চরে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং ৪৮ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব ডেনমার্কের একটি কোম্পানিকে দিতে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত হয়। উল্লেখ্য, গতকাল ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ইনল্যান্ড কন্টেইনার পরিচালনায় টার্মিনালটি সুইজারল্যান্ডের যে কোম্পানির সাথে চুক্তির খবর পাওয়া গেছে, তা কোন শর্ত ও ভিত্তিতে চুক্তি হল সে সম্পর্কে দেশবাসী কিছুই জানে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পতিত স্বৈরাচারের মতো গোপন চুক্তির মাধ্যমে বন্দরের টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, চলতি নভেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। আপনার সরকার এসব দিকে নজর না দিয়ে শেখ হাসিনার মতো গোপনে চুক্তি করছে। বিদেশিদের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করার জন্য আপনাকে ক্ষমতায় বসানো হয়নি। রুহুল কবির রিজভী আরো বলেছেন, এখন পরিস্থিতি এমন যে, মানুষ বাঁচতে চায়, দু’বেলা খাবারের নিশ্চয়তা চায়। আপনার সেদিকে নজর নেই। বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেই। কৃষকরা মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কেউ চাল কিনলে আলু কিনতে পারছে না। নিম্ন আয়ের মানুষ ও কৃষককে বাঁচিয়ে জনবান্ধব সরকারের পরিচয় দেন। বাম গণতান্ত্রিক জোট বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে। জোটের নেতারা বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার বদলে কথিত চুক্তির মাধ্যমে তা ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। বিগত সরকারের মতো গোপন চুক্তির মাধ্যমে দেশের বন্দর ও টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এ অভিযোগ একেবারে তুচ্ছ জ্ঞান করার কোন কারণ নেই। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্ট হয় কিংবা দেশ-জনতার স্বার্থ বিনষ্ট হয়, এমন কিছু করার অধিকার কোনো সরকারেরই থাকতে পারে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ দায়িত্ব পালন এবং সরকারের স্বাভাবিক কাজ কর্ম পরিচালনা এ সরকারের কর্তব্য। এর বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করা, সিদ্ধান্ত নেয়া, বিশেষত জাতীয় স্বার্থ বিঘœ ঘটাবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া সরকারের উচিৎ নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আমরা মনে করি, গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, নীতি ও কাজ যে কোনো সরকারের জনপ্রিয়তার প্রধান অবলম্বন। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত না হলেও গণসমর্থিত সরকার হিসেবে পরিগণিত। তার কাছ থেকে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণ ও মঙ্গলের পরিপন্থী কিছু কেউ আশা করে না। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে। নিত্যপণ্যের বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরাজ করছে অচল অবস্থা। এ মুহূর্তে সরকারের উচিৎ এসব সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হওয়া।











