ফুলের মতো দেশ

7

রুনা তাসমিনা

ছাব্বিশ মার্চ উপলক্ষ্যে ইশকুলে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় হবে। আঁকার হাত ভালো তন্ময়ের। প্রতিবার প্রথম পুরস্কার তার হাতেই আসে। কিন্তু এবার এসবে মন বসে না তন্ময়ের। পুকুর পাড়ের শিমুল গাছে টকটকে লাল ফুল। পুকুরের পানি ঝিরঝির করছে বাতাসে। ঘাটে বসে তন্ময় ভাবছে বাবার কথা। বাবা বলতো,
পুরস্কার পেয়েছিস ভালো কথা। কিন্তু এসব পুরস্কার আমাদের মতো গরীবদের কোনো কাজে আসবে? আমাদের দরকার হাতের কাজ শেখা। আমার মতো হাতের কাজ শিখবি।
মিদুল স্যার বলেন, এই দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে ভাষা এনেছে। রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারা বাংলার মানুষ একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতার জন্য। তন্ময়ের খুব ইচ্ছে করে স্যারকে জিগ্যেস করতে।
স্যার, যুদ্ধ কি এখনো শেষ হয় নি? যদি হয়ে থাকে তাহলে কেন আমার বাবা শিমুল ফুলের মতো রঙ মেখে রাস্তায় শুয়ে থাকে! বঙ্গবন্ধুর মতো আরেকজন নেতা কি এই দেশে জন্মাতে পারে না? বাইক নিয়ে যে ছেলেগুলো পাড়া চষে বেড়ায় তাদের দমানোর জন্য একজন বঙ্গবন্ধু ভীষণ দরকার! বাবার টাকাকড়ি সব কেড়ে নিয়ে যে ছেলেগুলো আজ বাবাকে হাসপাতালে শুইয়ে রেখেছে তাদের রুখবে কে! পুকুরের জলের মতো চোখ টলটল করে নিলয়ের।
তুই এখানে বসে আছিস! মা তোকে কখন থেকে ডাকছে। মিনুর ডাকে ফিরে তাকায় নিলয়।
মা এসেছে! বাবা কেমন আছে? তোরা আসলি কখন?
এসেই তো মা খুঁজছে তোকে। চল তাড়াতাড়ি। নিলয় জোরে পা চালিয়ে ঘরে ফিরে বোনের সঙ্গে। কিন্তু মা’র সঙ্গে কোনো কথা বলে না। এতো বড়ো একটা বিপদ ঘটে গেলো। সে কিছুই জানে না!
মা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। যেনো কিছুই হয় নি এমনভাবে বলে,
ইশকুলে নাকি কাল প্রতিযোগিতা হবে? কী আঁকবি এবার?
ভাইয়া তো বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকবে। কী সুন্দর করে বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকে ভাইয়া! মিনু মাঝখানে বলে ওঠে।
তন্ময় চুপ করে থাকে। বাবার কথা জানতে বড্ড ইচ্ছে হয়। কিন্তু মা’র ওপর ভীষণ অভিমান তার। গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। পুকুরের টলটলে জল এখন আর পাড় দিয়ে বাঁধা নেই।
তোর বাবা কী বলেছে জানিস?
বাবা কথা বলেছে! সবাই বলছিলো বাবার হুঁশ ফিরবে না! মা, বাবা ঠিক হয়ে যাবে তো? অভিমান ভুলে যায় তন্ময়। একসঙ্গে অনেক কথা জানতে চায় মা’র কাছে। মা বলে,
হ্যাঁ কথা বলেছে। জানতে চেয়েছে ইশকুলের ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা কবে? আর বলেছে তন্ময় যেনো এবারও প্রথম পুরস্কার পায়। আর ডাক্তার বলেছে আগামী সপ্তাহে বাড়ি আসতে পারবে।
মুহুর্তে তন্ময়ের মনে হাজার হাজার ফুল ফুটে ওঠে। পুকুরের ঢেউগুলো মনে হয় জলসিঁড়ির মতো। মনে হয়, ওই সিঁড়ি বেয়ে সে চাইলেই নেমে যেতে পারে পাতালপুরীতে। পাতালপুরীর রাজপ্রাসাদে। যেখানে ঘরের দরোজা জানালা সবগুলোতে বাবার হাতের কারুকাজ। ওখানে কেউ বাবার কাছে টাকা চাওয়ার সাহস করবে না। কেউ শিমুল ফুলের রঙ লাগিয়ে দিতে পারবে না বাবার গায়ে। নানান রঙের প্রজাপতি উড়ে উড়ে ঘুরবে। পাখিগুলো উড়তে উড়তে নানা কথা বলবে। রূপালি রোদে বসে তন্ময় আঁকবে। ঘাসগুলো অবাক হয়ে সেই ছবি দেখবে। তন্ময় বলবে, তোমাদের ছবি আঁকি।
কী হয়েছে? এমন বিড়বিড় করে কী বলছিস?
মায়ের কথায় সূর্যের মতো হাসি ঝলকায় তন্ময়ের মুখে। ভুলে যায় বাবাকে দেখতে যেতে না পারার দুঃখ। বাবা ছবি আঁকে কাঠে। তন্ময় কাগজে! দুজনেই তো ছবিয়াল! হাতের কাজই এবার তন্ময় দেখাবে বাবাকে।
ছাব্বিশ মার্চের প্রতিযোগিতায় এবারও তন্ময় প্রথম হয়। মিদুল স্যার বলে,
এবারের ছবিটা একেবারে অন্যরকম এঁকেছিস। তবে খুব ভালো হয়েছে।
তন্ময়ের মুখে বিজয়ীর হাসি। বলে,
স্যার, বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা রঙের আঁচড়ে মুছে দেবো কিশোর গ্যাংয়ের নাম। শিমুল ফুলও একসময় মেঘের মতো তুলো হয়ে ভাসে। আমরা সেই তুলোর মতো সুন্দর দেশ গড়বো স্যার। মিদুল স্যারের মুখে হাসি ফোটে। স্যার তাকিয়ে দেখেন ক্লাস টেনের কিশোর ছেলেটি স্বপ্ন দেখা শিখেছে। পুকুর পাড়ের শিমুল ফুলের গাছটি ফুলে ফুলে লাল। স্যারের মনে হয় প্রতিটি ফুলে এক একজন তন্ময় আছে।
তারা তুলোর মেঘের ভেলায় চড়ে ফুলের মতো করবে এই দেশ।