সেলিম উদ্দিন, ঈদগাঁও
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের ফুলছড়ি বনবিটে নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি ও ড্রেজার মেশিন দিয়ে পাহাড়ি বালি পাচার করা হচ্ছে। সংরক্ষিত বন দখল করে পাকা বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এতে মারাত্মকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, লঙ্ঘন হচ্ছে বন সংরক্ষণ আইন।
গত ক’দিন সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড় কাটা, সামাজিক বনায়নের গাছ কর্তন করে চোরাই পথে বিক্রি, পাহাড়ি বালি উত্তোলন, পাহাড় কেটে পাকা দালান নির্মাণসহ নানা অনিয়মের মধ্যেই চলছে ফুলছড়ি বনবিটের কার্যক্রম। ফুলছড়ি অফিসের পশ্চিম পাশে আতাউল্লাহর পাকা বাড়ি নির্মাণ, থমতলায় প্রবাসীর বাড়ি নির্মাণ, নতুন অফিস বাজারের পূর্বে হেডম্যানের বাড়ির পাশে পাকাঘর, খুটাখালী ছড়ায় লিটন সিকদারের ড্রেজার মেশিন, রবি টাওয়ারের পাশ থেকে আবদু শুক্কুরের নেতৃত্বে বালি পাচার ও পাহাড়ি মাটি পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব অপকর্মে সরাসরি বিট কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র সিংহ, হেডম্যান আবদু শুক্কুর ও এফজি রফিক ও হাসান জড়িত রয়েছে।
একই সাথে নাপিতখালী বনবিটেও চলছে হরিলুট। বনবিটের ফকিরাবাজার, ভিলেজারপাড়া থেকে পাহাড় কেটে দৈনিক ৪/৫টি ডাম্পার দিয়ে পাহাড়ি মাটি পাচার, ডুলা ফকির (রহ.) এর মাজারের পশ্চিম পাশে রবিউলে দখলকৃত পাহাড় কাটা, দারুসসালাম মাদ্রাসা পূর্ব পাশে মোবারকের বহুতল ভবন নির্মাণ, হাজীপাড়া এলাকায় মাহবুব এবং মোতাহেরের মেয়ের পাকাবাড়ি নির্মাণ, বামবাগান রোডে পিয়াজ্যা দোকানের পিছনে শাহাজাহান মিস্ত্রির পাকা বাড়ি নির্মাণ, সাহাব উদ্দিন মেম্বারের পূর্ব পাশের রোডে সোলতান নগরে নুরুল ইসলামের পাকা বাড়ি নির্মাণ ও মেম্বার নাঈমের নেতৃত্ব চলছে বহুতল ভবনের কাজ।
সরেজমিনে সত্যতা মিলেছে বিট কর্মকর্তা লিটনকে মোটা অংকের মাসোহারা দিয়েই এসব বনবিধ্বংসী অপকর্মগুলো চলছে। বিট অফিসের এফজি রফিক ও হেডম্যান শুক্কুর পরোক্ষভাবে পাহাড়ি মাটি ও বালি পাচারে ড্যাম্পার প্রতি ২০০ টাকা, যে সকল ড্যাম্পার বনবিভাগের অপকর্মে জড়িত সেগুলোর থেকে মাসিক মাসোহারা দিতে হয় ১ হাজার টাকা, পলিথিনের ঘর নির্মাণে ১০ হাজার টাকা, পাকা বাড়ি নির্মাণে ৩০ হাজার টাকা, জব্দকৃত গাড়ির সিওআর করতে ৫ হাজার টাকার জরিমানার ¯িøপ দিয়ে আদায় করে লক্ষাধিক টাকা।
লোকেমুখে প্রচার আছে বিট কর্মকর্তা লিটন দুর্নীতিবাজ বিট অফিসার জুয়েলের অনুসারী। জুয়েলকে বদলীর পর তারই উত্তরসূরী হিসাবে চষে বেড়াচ্ছেন লিটন। তার নিজস্ব গুটিকয়েক সংবাদকর্মী রয়েছে। ঘুষের টাকায় তাদেরকে লেলিয়ে দিয়ে জায়েজ করা হয়। এমনকি নিয়মিত মাসোহারা না পৌঁছালে বারবার অভিযান, মামলাসহ নানা ধরনের হয়রানি করাও হয় বলে জানা যায়।
প্রতিদিন ফুলছড়ি রেঞ্জ কার্যালয়ের সামনে দিয়ে মাটি-বালি ভর্তি গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে গেলেও বন কর্মকর্তা লিটন থাকে নীরব। সংরক্ষিত বন দখল করে পাকা বাড়ি নির্মাণ, পাহাড় কাটা, পাহাড়ি মাটি-বালি ও বনায়নের কাঠ পাচার ইত্যাদি বন আইন পরিপন্থী কর্মকাÐ। তবে, বিট কার্যালয়ের কর্মচারি থেকে রেঞ্জ ও বিভাগীয় কার্যালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে সময়মতো পৌঁছে যায় পাহাড়খেকোদের এই অপকর্মের মাসোহারা।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, লিটন চন্দ্র সিংহ একের ভিতর তিন। প্রশিক্ষণকালীন ফুলছড়ির বিট অফিসার, পরে নাপিতখালীর অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ক্ষেত্রবিশেষে রেঞ্জ কর্মকর্তা। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে রয়েছে তার সখ্যতা। তাদের সাথে বনায়নের গাছ কাটা, পাহাড় নিধন, মাটি-বালি উত্তোলন ও পাচার সিন্ডিকেটে তিনি সরাসরি জড়িত। ইতোপূর্বে অনিয়ম দুর্নীতির দায়ে ফুলছড়ি বিট কর্মকর্তা জুয়েল চৌধুরীকে ডিমোশন করে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে অভিযুক্ত বিট কর্মকর্তা লিটন চন্দ্র সিংহের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা রাশিক আহসান জানান, অভিযোগগুলো সুস্পষ্টভাবে দিন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, উপরোক্ত অভিযোগগুলো রেঞ্জ অফিসারকে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। বন সংরক্ষক চট্টগ্রাম অঞ্চল ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, অপকর্মে বন কর্মকর্তা জড়িত হলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।











