‘ফাল্গুনী ঝড়ের’ ছোবল, নিহত ৪

62

এখন ফাল্গুন মাস। শীতের রেশ কাটছে। আর এরই মধ্যে হানা দিয়েছে বৃষ্টি। সঙ্গে দমকা হাওয়া। কোথাও উপড়ে পড়েছে গাছ, কোথাও বৃষ্টিতে জমেছে পানি। গতকাল সকালে অন্ধকার নেমে আসে। নয়টা পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হয়েছে। ফ্লাইওভারেও পানি জমেছে। লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বইমেলা।
এদিকে বজ্রপাতে জেলার সীতাকুন্ড, বাঁশখালী, মহেশখালী এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। মাছ ধরার ট্রলারগুলো নদীর কূলে অপেক্ষা করছে। তবে দু’দিনের হালকা গরম কাটিয়ে দিয়েছে বসন্ত মৌসুমের এই প্রথম বৃষ্টি। দিনভর সূর্যের দেখা মিলেনি।
গতকাল ভোর থেকেই শুরু হয় দমকা হাওয়া। কালবৈশাখীর মতো দমকা হাওয়া বয়ে গেছে নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়। সেই সঙ্গে হয়েছে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত।
প্রচন্ড বেগে বাতাস আর বৃষ্টির মধ্যে গতকাল সোমবার সকালের আলো ছাপিয়ে কালো অন্ধকার নেমে এসেছিল বন্দরনগরী জুড়ে। সকালে বের হওয়া গাড়িতে হেডলাইট জ্বালিয়েই চলাচল করতে হয়েছে। রাতের মতই অন্ধকার হয়ে যায়। ১০ ফুট দুরত্ব দেখা যাচ্ছিল না।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জ্বল কান্তি পাল জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে সৃষ্ট মৌসুমি বায়ু দমকা হাওয়ার আকারে চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।
সকাল সাড়ে ৮ টায় এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। সকাল ৯ টা ১০ মিনিটে তা বেড়ে হয় ৬৫ কিলোমিটার। সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭০ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামের উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যায়।
বাতাসের সঙ্গে বিকট শব্দে বজ্রপাত ছিল। এর সঙ্গে শুরু হয় কখনো হাল্কা, কখনো মাঝারি ধরনের বৃষ্টি। সকাল বাতাস ও বৃষ্টির সঙ্গে আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়। বৃষ্টির মধ্যে পথচারী, অফিস-স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা বিপাকে পড়েন।
জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে স্বাভাবিক লঘুচাপের কারণে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও দমকা হাওয়াসহ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। কাজীর দেউড়ি, সার্কিট হাউস, শিশুপার্ক, বহদ্দারহাট সোনালী ব্যাংক সড়ক সহ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু গাছপালা ভেঙে পড়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, পশ্চিমা লঘুচাপের একটি বাড়ন্ত অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর এর আশপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপও রয়েছে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে। এই দুয়ের কারণেই মাঝ ফাল্গুনে ঝড়-বৃষ্টির আগমন।
সোমবার ভোর থেকে আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। এ সময় প্রাইভেট কারসহ যান্ত্রিক গাড়িগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। সকালের শিফটের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ কর্মস্থলমুখী মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। বাস, টেম্পু, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা চলাচল কমে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক যাত্রীকে। সামান্য বৃষ্টিতেই আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ও লুপে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যানবাহন চালক ও যাত্রীদের।
সকাল ৯টা পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস মাত্র ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছিল। এতটুকু বৃষ্টিতেই ফ্লাইওভারের কিছু অংশে জল থৈ থৈ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ওই পানির ওপর দিয়ে গাড়ি চলার ফলে ময়লা পানি পড়ে সড়কের রিকশাসহ ফুটপাতের পথচারীদের ওপর।
ট্রাকচালক করিমুজ্জামান বলেন, প্রায় সময় ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলা করি। কারণ নিচে যানজট থাকে। যানজট এড়াতেই এদিকে যাওয়া-আসা। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়। সুবিধার কথা চিন্তা করে ফ্লাইওভারে দিয়ে আসি। কিন্তু ফ্লাইওভার পানিতে থৈ থৈ করে।
হঠাৎ বৃষ্টিতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের জিমনেশিয়াম চত্বরের একুশে বইমেলা। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পেন্সিল পাবলিকেশন, অ্যাডর্ন, নন্দন বইঘর, বলাকা, আবীর প্রকাশনীসহ অনেকগুলো স্টল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশকিছু স্টলের বইপত্র ভিজে গেছে। আবার কয়েকটি স্টলের সামনে দেখা গেল ভেজা বইয়ের স্ত‚প। কয়েক লাখ টাকার বই নষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করছেন আয়োজকরা।
এ ব্যাপারে বইমেলা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সচিব জামাল উদ্দিন জানান, ঝড়ে বইমেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হাজারো বই একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো টাকার অংক হিসাব করা হয়নি। তবে ধারণা করছি, ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে
বাঁশখালী উপকূল ও আশপাশের চারটি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমপক্ষে ৪০টি কাঁচা ও টিনের ঘর। বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন একজন কৃষক। গতকাল সকালের দিকে সৃষ্ট ঝড়ে খানখানাবাদ, শেখেরখীল, সাধনপুর ও ছনুয়া এলাকায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ^াস দেয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সরল এলাকার পাইরাং গ্রামে কৃষিজমিতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান দলিলুর রহমান (৭৫)। তিনি একই গ্রামের মৃত অলি মিয়ার পুত্র। মারা যাওয়া ব্যক্তি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত দুই বছর আগে দেশে ফেরত আসেন। পরে বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে দুই গন্ডার জমির উপর নিজেই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার পূর্বদেশকে বলেন, খানখানাবাদ, শেখেরখীল, সাধনপুর, ছনুয়া এলাকায় যেসব ঘরের অবস্থা খারাপ ছিল সেগুলো ঝড়ে ভেঙে গেছে। সরল এলাকায় একজন বজ্রপাতে মারা গেছে। খানখানাবাদে ২৬টি ঘর, শেখেরখীলে ৮-১০টি ঘর মিলিয়ে সর্বমোট ৪০টির মতো ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক দশ হাজার টাকা দিয়েছি। সরকারিভাবেও বরাদ্দ দেয়া হবে। বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের হয়তো টিন বরাদ্দ দেয়া হবে।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বদরুদ্দীন চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, ঝড়ে ৭-৮টি ঘর পুরো ভেঙে গেছে। ৩৫টির মতো ঘর আংশিক ভেঙেছে। প্রত্যেক ওয়ার্ড ঘুরে ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে ১৭ বস্তা চাল দিয়েছি। বেড়িবাঁধে কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বেড়িবাঁধের কাজে ঠিকাদারের নিয়োগ দেয়া পাঁচজন শ্রমিক আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে রাখা বøক বাতাসে পড়ে গেলে তারা আহত হয়।
বান্দরবান ও মহেশখালী প্রতিনিধি জানান, বজ্রাঘাতে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার হোঁয়ানক ইউনিয়নের কেরুনতলী এলাকায় ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নাইক্ষ্যংছড়ির একই পরিবারের তিন সদস্যও আহত হয়েছেন।
গতকাল সোমবার সকাল সোয়া ৯ টা থেকে সাড়ে ৯ টার মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। নিহত মো. রাজীব কেরুনতলী ইউনিয়নের মো. মুফিজুল আলমের ছেলে। সে কেরুনতলী আব্দুল মাবুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। অপরজন হলেন দক্ষিণ বাইশারীর গৃহবধূ জান্নাত আরা (২৪)। এ সময় একই পরিবারের মরিয়ম বেগম (৫০), মরিয়ম বেগমের ছেলে এরশাদুল্লাহ (২৮) ও তার মেয়ে আছমা বেগম (১৬) আহত হন।
নিহত জান্নাত আরা আহত এরশাদুল্লার স্ত্রী। তারা সবাই দক্ষিণ বাইশারী এলাকার বাসিন্দা।
মহেশখালী থানার ওসি প্রভাস চন্দ্র ধর জানান, গতকাল সকালে বাবার সঙ্গে লবণ মাঠে যাচ্ছিল স্কুলছাত্র রাজিব। এ সময় বজ্রাঘাতে রাজিবের মৃত্যু হয়। রাজিবের লাশ পরিবারের কাছে রয়েছে।
অন্যদিকে বাইশারীর ঘটনায় গৃহকর্তা আলী আকবর জানান, সকাল সোয়া ৯ টার দিকে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি শুরু হলে বাড়ির লোকজন উঠানে রাখা জিনিসপত্র ঘরে ঢোকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে যায়। তখন তার ছেলে এরশাদুল্লাহ ঘরের টিনের চাল ঠিক করছিল। এ সময় তিনি বজ্রপাতের বিকট শব্দ শুনতে পান। এর পরই দেখেন ঘরের চালের ওপর এরশাদুল্লাহ ও বাকিরা উঠানে দরজার পাশে পড়ে আছে। পরে আশেপাশের লোকজন এসে ঘটনাস্থল থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে জান্নাত আরাকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদের কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বাইশারী পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সহকারী ইনচার্জ মাইনুদ্দিন, এএসআই জাকির হোসেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ একেএম হাবিবুল ইসলাম বলেন, ‘বজ্রপাতের কারণে একজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছে’। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
পূর্বদেশের সীতাকুন্ড প্রতিনিধি জানান, সীতাকুন্ডে বজ্রপাতে রতন জলদাশ (৩৬)নামে এক জেলে নিহত হন। একই ঘটনায় আহত হয়েছে অপর একজন। নিহত জেলে ভাটিয়ারী মির্জানগর এলাকার মনু জলদাশ মাঝির পুত্র। গতকাল সকালে উপজেলার ভাটিয়ারী মির্জানগর জেলে পাড়া সাগর উপক‚ল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে স্থানীয়রা জানান, সকালে নদীতে মাছ ধরতে যায় কয়েকজন জেলে। এ সময় বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন দুই জেলে। স্থানীয়রা ও সাথে থাকা জেলেরা তাদের উদ্ধার করে ভাটিয়ারী বিএসবিএ হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে আনার পর কর্ত্যব্যরত ডাক্তার রতন দাশকে মৃত ঘোষণা করেন এবং অপর আহত গফুর জলদাশকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
এ বিষয়ে সীতাকুন্ড মডেল থানার ওসি দেলওয়ার হোসেন বলেন, আমি বিষয়টি শুনে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। এক জেলে হাসপাতালে আনার পর মৃত্যুবরণ করেন এবং অপর জেলেকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এ ব্যাপারে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা চলমান রয়েছে।’