প্রেম ও ধর্ম কেনাবেচার হাট

212

গত পর্বের পর

এ কথা মনে হতেই অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ইরফান আলী খানের।
লক্ষ্য করলেন শৈবাল চৌধুরী। বেশ আপসেট হলেন মনে হয়।
হুঁ। শ্রেয়ার জন্য আনা ‘মারকুইস’ পারফিউমটি আমি ব্যাংকক থেকে এনেছিলাম। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের গল্প শুনে ও খুব ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল একবার যেন তাকে নিয়ে যাই। কথাও দিয়েছিলাম। মাস খানেক পর ব্যবসার কাজে আমাকে ব্যাংকক যেতে হবে। তখন শ্রেয়াকে নিয়ে যাব। কিন্তু বেচারী তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।
সবই নিয়তি ইরফান আলী খান সাহেব। সবই নিয়তি। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের কথা আমিও অনেক শুনেছি। কিন্তু কখনো যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। আমাদের তো দীর্ঘপথের যাত্রা। গল্প শুনতে শুনতেই যাওয়া যাবে। বলুন।
বাস থেমে আছে। সামনে কী হয়েছে, কেন গাড়ি এগুচ্ছে না কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট হয়। অনেক সময় কৃত্রিম যানজট তৈরি করে রাখে কাভার্ড ভ্যানের চালকরা। রাস্তায় গাড়ি রেখে ঘুমিয়ে পড়লো। আর পেছনে দীর্ঘ লাইনের জট হয়ে গেল।
নিশ্চয় কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
হতেও পারে। জবাবে বললেন ইরফান আলী খান।
থাকুক। বাস তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। আমাদের তেমন একটা সমস্যা হবে না। তাছাড়া আমাদের তেমন কোনো তাড়াও নেই। আমাদের জন্য কেউ অপেক্ষাও করছে না। বরং আমরা যে ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি সেটাই আমাদের জন্য মঙ্গল। এক নাগাড়ে বললেন শৈবাল চৌধুরী।
হ্যাঁ। ঠিক তাই। ব্যাংককের ম্যাসেজ পার্লারের কথাই বলি।
সুকুমবিথ। ব্যাংকক শহরের পর্যটন এলাকা। সারা বিশ্ব থেকে পর্যটকরা ব্যাংকক ভ্রমণে গেলে সুকুমবিথ ঘুরে আসাটা ভ্রমণের একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। নিয়মতান্ত্রিক ট্রাফিক। আইল্যান্ডে সবুজ বৃক্ষ। ঝামেলামুক্ত ফুটপাত। সুকুমবিথ শহরের রাস্তার পাশে ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে ম্যাসেজ পার্লার। কাঁচের দরজার বাইরে-ভেতরে তরুণী মেয়েরা সেজে-গুঁজে বসে আছে। পথচারী যেতে দেখলেই ডাকছে। কেউ প্রয়োজন হলে ঢুকছে আর বাকিরা মৃদু হেসে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো জোর জবরদস্তি নেই। কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত নেই।
আমার এবারের ব্যাংকক ভ্রমণে আমার এক বন্ধু ছিল সাথে। আবির আহমেদ। এটা তার প্রথম ব্যাংকক ভ্রমণ। আমরা যে হোটেলে ছিলাম তার কাছেই বেশ কিছু ম্যাসেজ পার্লার ছিল। দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যে অথবা রাত যখনই হাঁটতে, বা কাজে বেরুতাম তখনই দেখতাম সাদা চামড়ার লাবণ্যময় মেয়েরা ডাকছে। বেশিরভাগ মেয়েদের শরীরে জামা বলতে খুব ছোট প্যান্ট আর অর্ধবুক খোলা টি-শার্ট অথবা বিশেষ ধরনের পাতলা জামা। শুনতাম ব্যাংককে নাকি পতিতারা রাস্তায় টানা-হেচড়া করে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। ফুটপাতে হাঁটার সময় জড়িয়ে ধরতে চায়। কথাটা আমার কাছে সত্যি মনে হয়নি। কারণ আমি যে ক’বার ব্যাংকক গিয়েছি সেরকম কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। তবে একবার দেখেছিলাম রাত এগারটার দিকে আমি ও আবির বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের কাছেই একটি রেষ্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হঠাৎ একটি ট্যাক্সিক্যাব এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো। ক্যাবের জানালা খুলেই তিন-চারটে সুন্দরী মেয়ে তাদের বুক প্রদর্শন করে ঠোঁট বাকিয়ে আমাদের ডাকল। তাদের ক্যাবে করেই যেতে বলল। প্রথমে দু’জনেই কর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। মুখ ফসকে থ্যাঙ্ক য়্যু বেরিয়ে পড়লো ওতেই রক্ষে।
তো একদিন রাতের আর্লি ডিনার শেষ করে হোটেলে ফেরার পথে আবির ভাই বললেন- চলুন। একবার ম্যাসেজ পার্লারে ঢুকে দেখি। আমি আমতা আমতা করলেও আবির ভাইয়ের জোরাজুরিতে ঢুকে পড়লাম। অবশ্য ভালোই হয়েছে। অনেক কিছুই জানা গেছে।
ইরফান আলী খানের কথা শুনতে শুনতেই শৈবাল চৌধুরীর মনে হলো অতিরিক্ত টাকা খুইয়ে ব্যাংককে আপনার বডি ম্যাসেজের দরকার পড়ে না। বাংলাদেশেই তো আপনার প্রেমিকা, যিনি আমার সার্টিফিকেট সর্বস্ব স্ত্রী, আপনাকে সব ধরনের ম্যাসেজ পেতে সহযোগিতা করছে। আপনার মতো ভাগ্যবান, ব্যাঙ্গার্থে, ব্যক্তি ঢাকা শহরে অনেক রয়েছে। আমাদের চারপাশে, বন্ধুবান্ধবদের মাঝে, এমনকি প্রতিবেশীও হতে পারে। আমরা সামাজিকতার খাতিরে অনেকেরই মুখোশ টেনে খুলতে পারি না। আবার অনেকের মুখোশ খোলা থাকলেও দাপটের কারণে আমরা অনেকেই বলি- আহা! বেশ! বেশ! বেশ!
কী ব্যাপার! ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? শৈবাল চৌধুরীকে চুপচাপ দেখে জানতে চাইলেন ইরফান আলী খান।
জি না। শুনছি। আপনি এত রোমাঞ্চকর পরিবেশের কথা বলছেন যেন আমি সত্যি খোলা চোখেই দেখতে পাচ্ছি। বলুন।
ওখানে বেশ কয়েকপদের ম্যাসেজ আছে। ম্যাসেজে মেয়েদের অঙ্গ-ভঙ্গিসহ দু’টি ক্যাটালগ আমাদের হাতে ধরিয়ে দিল। ও আপনাকে তো বলাই হয়নি। আমরা যে আবাসিক হোটেলে উঠেছি সেখানে রুম সার্ভিস পেপার ম্যাগাজিনের সাথে এ রকম একটা নগ্ন ক্যাটালগও ছিল। যেটিতে সবধরনের ম্যাসেজের আলাদা মূল্য তালিকা এবং রুম সার্ভিসের কথাও উল্লেখ রয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় কি জানেন?
কী?
সুন্দর পরিপাটি বিছানার সাইড বক্সে দু’টি কনডমও রাখা ছিল। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটি টয়লেটের এয়ার ফ্রেশনার বক্স। পরে টের পেলাম আসল রহস্য। ম্যাসেজের ধরনের মধ্যে রয়েছে- ফুট ম্যাসেজ, বডি ম্যাসেজ, বডি টু বডি ম্যাসেজ এবং স্নান পর্যন্ত সবকিছু। সুকুমবিথ এলাকায় থাই মেয়েদের এটি সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা।
তো আবির ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন ফুট ম্যাসেজ করাবেন। আড়াইশ বাথ দিয়ে। আমি কিছু করাবো না। মেয়েরা আমাকেও বারবার ইঙ্গিত করছিল কিছু একটা করার আমন্ত্রণে। রাজি হলাম না। দেয়ালের সাথে লাগানো মোড়ায় বসে আবির ভাইয়ের ফুট ম্যাসেজ দেখছি।
ওদের কথা মতো আবির ভাই বাথরুমে গেলেন। পরনের প্যান্ট চেঞ্চ করে বড় টাওয়েল পরে ফিরলেন। দেয়ালের সাথে হেলানো লম্বা চকিতে পা লম্বা করে শুলেন। আধ শোয়া। পিঠের দিকে দু’টি নরম বালিশ। একজন মহিলা বেশ কয়েকটা ঘটি-বাটি নিয়ে আবির ভাইয়ের পায়ের কাছে মোড়ায় বসলেন। তারপর শুরু করলেন ফুট ম্যাসেজের মহাযজ্ঞ। পায়ের পাতা থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত। নানান ঢং এ। নানান উপায়ে। আবির ভাই চোখ মুদলেন। তার কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো নাক ডাকা। মহিলা নিয়মমাফিক ম্যাসেজ করে যাচ্ছেন। আবির ভাই ঘুমিয়ে পড়লেন। এক ঘন্টা পেরিয়ে গেল। মহিলা তার ম্যাসেজ কর্ম শেষ করে ঘটি-বাটি নিয়ে ফিরে গেলেন। আবির ভাই নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। আমি বসে আছি। ঘুমিয়ে পড়াতে পার্লারের মহিলারা কেউ আবির ভাইকে জাগায়নি। বরং বসে থেকে বিরক্ত হয়ে আমিই জাগালাম। ফুট ম্যাসেজের জন্য আড়াইশ বাথ দিলেন। তারপর দু’জনে ফিরলাম।
আপনি কখনো ম্যাসেজ করিয়েছেন? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
না। আমার কখনো ইচ্ছেও হয়নি।
আমার যদি কখনো ব্যাংকক যাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে অবশ্যই একবার বডি ম্যাসেজ করিয়েই আসব। অন্তত একবার টেষ্টটা নিতে হবে। অভিজ্ঞতা অর্জন বড় ব্যাপার।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট যানজটে আটকে থাকার পর বাস চলতে শুরু করেছে। তাও টিমেতালে। কিছুদূর যায় তো আবার থামে। বাসের সাউন্ড বক্সে রবীন্দ্রনাথের গানের মিউজিক বাজছে।
আমারও পরানও যাহা চায়…
তুমি তাই, তুমি তা-ই গো …।
আনমনা হয়ে জানালায় প্রকৃতি দেখছেন শৈবাল চৌধুরী। আর ভাবছেন একটি বিশ্বাস কতোটা ঠুনকো, কতোটা ভুল এবং কতোটা মিথ্যে হতে পারে। শ্রেয়ার বিবাহিত জীবনের দু’টি বিচ্ছেদের পরও একটু করুণার হাত বাড়িয়ে বিশ্বাস করেছিল শৈবাল চৌধুরী। শ্রেয়াকে নতুন করে জীবন শুরু করার। ভালোবাসার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। জানিয়েছিল পৃথিবীটা এমনই। ভাঙা-গড়াই জীবন। এটুকু ক্ষুদ্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ভালো রাখতে হলে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। আর ভালোবাসা কখনো নিক্তির পাল্লায় পরিমাপ করে হয় না। সব স্বার্থ ত্যাগ করেই ভালোবাসতে হয়। সব স্বার্থ ত্যাগ করে, শ্রেয়ার সব অতীত মেনে নিয়েই তো আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম। আর সে এই তার প্রতিদান দিল। শুধুমাত্র অর্থের লোভেই ইরফান আলী খান সাহেবের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হলো! নাকি অন্য কিছু। আমি কী শ্রেয়াকে কোনোভাবেই সুখ দিতে পারিনি?
শৈবাল চৌধুরী যখন ভাবনার অতল গহব্বরে গিয়েও কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পেল না তখন ইরফান আলী খানের ডাকেই সম্বিত ফিরল।
কী ভাবছেন?
ও ইরফান সাহেব। ভাবছি বাসায় এতক্ষণে পুলিশ এলো কি না। শ্রেয়ার ডেড বডি পেল কি না।

পুলিশ ডেড বডি পেলে তো পুরো এলাকা জানাজানি হয়ে যাবে। তারপর টেলিভিশন, খবরের কাগজ, ফেসবুক কোনোটাই তো বাদ যাবে না। আচ্ছা ইরফান আলী খান সাহেব আপনি আপনার বাসার দারোয়ান কে কী যেন বলে এলেন?
বলেছি আমি ব্যবসার কাছে দেশের বাইরে যাচ্ছি। যেই আসুক না কেন যেন একি কথা বলে।
ভালোই তো বলে এসেছেন। আমিও আপনার কথাটাই গেটে ঝিমুতে থাকা দারোয়ানকে বলে যার পরনাই ভেগেছি। দারোয়ান ঠিকমতো বুঝতে পেরেছে কি না কী জানি। না বুঝলেই বিপদ। অবশ্য তেমন একটা বিপদ হবে বলেও মনে হচ্ছে না।
কী করে বলছেন? বললেন ইরফান আলী খান।
আপনি নিশ্চয় শ্রেয়ার কাছে শুনেছেন গত নভেম্বরে আমরা নতুন বাসায় উঠেছি।
জি। শুনেছি।
আমাদের বিল্ডিং এর এক ফ্লোরে পাঁচটি ফ্লাট। লাগোয়া পাশের ফ্লাটের ভদ্র মহিলার সাথে দু’একবার লিফ্টে উঠতে নামতে দেখা হয়েছে। এছাড়া অন্য ফ্লাটের কারো সাথে পরিচয়ও হয়নি। এখন মাসের পনের তারিখ। আগামী মাসের পাঁচ তারিখের আগে ফ্লাট মালিকও ভাড়ার জন্য আসবে না। ঢাকা শহরে আমার তেমন কাছের কোন আত্মীয়-স্বজন নেই যে বাসায় আসতে পারে। আগে এক কাজিন থাকতেন। তিনিও ট্রান্সফার হয়ে পঞ্চগড় চলে গেছেন। এখন বাসায় এসে খোঁজ নেয়ার মতো কেউ নেই। সকাল সকাল একজন ছুটা বুয়া আসে। আমি বেরিয়ে আসার সময় তার সাথে পথে দেখা হয়েছিল। আমাদের বাসাতেই যাচ্ছিল। তাকে বলেছি আমরা দশ-পনের দিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। ফিরলে তাকে ফোন করে জানাবো। সাথে একমাসের পূর্ণ টাকাও দিয়ে দিয়েছি। কাজের বুয়ারা অল্প কটি টাকার জন্যই তো পুরো মাস ধরে কাজ করে। টাকাটা পেলেই তাদের অন্য কিছু নিয়ে ভাবনা মাথায় আসে না।
ঢাকা শহরের মানুষ এতোটাই আত্মকেন্দ্রিক এবং যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে যে তাদের নিজেদের জীবনযুদ্ধ, আরও একটু ভালো থাকার প্রতিযোগিতা ছাড়া প্রতিবেশী নিয়ে ভাববার সময় নেই। একটা বিল্ডিং এ পঞ্চাশ থেকে একশ’টা ফ্লাট থাকছে। প্রতি ফ্লাটে গড়ে চারজন থাকলেও পঞ্চাশটি ফ্লাটে দুইশ জন মানুষ থাকে। এক ছাদের নীচে থেকেও সবাই যেন পর। বিল্ডিং এর এক কোনার ফ্লাটে নতুন শিশু জন্ম নিয়েছে তো অন্য কোনার ফ্লাটের বুড়ো শিশু মৃত্যুবরণ করছে। নতুন শিশু জন্মের সংবাদটি ঘটা করে না জানালেও বুড়োশিশুর মৃত্যুর খবরটি মসজিদের মাইকেই জানিয়ে দেয়।
একদম ঠিক বলেছেন শৈবাল সাহেব। বললেন ইরফান আলী খান। তারপর নিজেই যোগ করলেনÑ ছোটবেলায় দেখতাম আমাদের বাসায় ভালো কিছু রান্না হলেই মা বাটি করে পাশের বাসার আন্টির জন্য পাঠাতেন। পাশের বাসার আন্টিও হর হামেশা এটা-ওটা আমাদের বাসায় নিয়ে আসতেন। কেমন একটি ভালোবাসা হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। আর এখন কেউ এসে বেল টিপলেও পরিচয় না জানলে আমরা দরজাও খুলি না। অবশ্য দরজা খোলার সময়, পরিবেশ সবই পাল্টে গেছে। এতো সিকিউরিটি থাকা সত্বেও বাসায় ঢুকে মানুষ খুন করে যাচ্ছে দূর্বৃত্তরা। গ্রীল কেটে চুরি করছে। পিস্তলের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি করছে। মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা, নির্ভরতা সবই যেন উঠে গেছে। আমরা প্রত্যেকেই কেমন মানুষ না প্রাণিতে পরিণত হয়েছি। একে অন্যের উপর আস্থা রাখতে পারি না। নির্ভর করতে পারি না।
ইরফান আলী খান যখন আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এসব নীতিকথা বলছেন তখন শৈবাল চৌধুরীর মনের ভেতরটা রাগে, দুঃখে এবং ক্ষোভে জ্বলে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। শৈবাল চৌধুরী মনের ভেতর থেকে বলে উঠলেন মানুষের এতোই আস্থা, বিশ্বাসের কথা বলছেন ইরফান আলী খান সাহেব অথচ নিজেই পর স্ত্রীর সাথে নিজ স্ত্রীর চেয়েও বেশি সম্পর্ক রেখেছেন। আমিও তো শ্রেয়ার প্রতি আস্থা রেখেছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কী সে দিয়েছে। দেয়নি। আর আপনিও সুযোগ বুঝে দাওটা মেরে দিয়েছেন। একেই বলে মানুষের দ্বিমুখিতা। সমাজের বেশির ভাগ মানুষই এরকম দ্বিমুখী নীতি নিয়েই চলছে।
ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে ধাক্কা খেলেন শৈবাল চৌধুরী। শ্রেয়া ইরফান আলী খানের বাসায় যেত। কিন্তু ইরফান আলী খানও কি আমার বাসায় আসতো না? আসতেও তো পারে। জিজ্ঞেস করবো? তিনি কী স্বীকার করবেন? দেখা যাক কথায় কথায় বেরিয়ে আসে কি না।
বুঝলেন ইরফান আলী খান সাহেব। এতোক্ষণ সমাজের কথা বলাতে মুড ভালোই ছিল। হঠাৎ শ্রেয়ার কথা মনে পড়াতে বেশ খারাপ লাগছে। বেচারীর লাশটা মেঝেতে পড়ে আছে। আমি উপরে একটি চাঁদর ঢাকা দিয়ে এসেছি। বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে না পারলেও ভেতরে তো ছুঁচো-ইঁদুরের অভাব নেই। মেয়েটির শরীরটা ইঁদুর-তেলাপোকায় খাবে। তারপর নিরব হয়ে মনে মনেই বললেনÑ যেটি আমরা দু’জনও…। বাকিটা মনের ভেতরই চাপা পড়ে গেল।
আপনার বেড রুমের সাথে যে বারান্দা, সেটির দরজা কী খোলা রেখে এসেছেন? বললেন ইরফান আলী খান। চমকে ওঠলেন শৈবাল চৌধুরী। ইরফান আলী খানের চোখে চোখ রাখলেন। অতপর চোখ নামিয়ে বললেন- হু।
আচ্ছা ইরফান সাহেব আমার বেড রুমেও তো আপনার যাওয়া হয়েছে।
জি। এখন আর অস্বীকার করে কী লাভ। শ্রেয়া তো পরপারে চলেই গেছে।
তাহলে তো আপনাকে আর বিশদ বর্ণনা দেবার প্রয়োজন নেই। শ্রেয়ার লাশটা ঠিক কোন জায়গায় পড়ে আছে। আমার বাসার বেডরুম, বাথরুম , কিচেন, ড্রইংরুম সবইতো আপনার জানা আছে।
ইরফান আলী খান কোন জবাব দিলেন না। শৈবাল চৌধুরীর শরীরের রক্ত টগবগ করছে। পাশে বসা লোকটি যাকে আজই প্রথম দেখছে। ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে গেল। সে তার বাসায় গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে ফষ্টিনস্টি করেছে। তার বাথরুম, বিছানা সবকিছু ব্যবহার করেছে। আর তার সাথেই শৈবাল চৌধুরী পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। ক্ষণে ক্ষণে রাগের মাত্রা এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে ইচ্ছে করছে ইরফান আলী খানকে ধাক্কা দিয়ে বাসের চাকার নিচে ফেলে দেয়। কিন্তু পারেনি শৈবাল চৌধুরী। শ্রেয়ার আত্মহত্যার পরিণতি কী হয় সে ভয়েই পালিয়ে বাঁচতে নাভিশ্বাস। নতুন করে ঝামেলা বাড়ানোর সময় এটা নয়। দাঁতে জিব কামড়ে রাগ হজম করলেন শৈবাল চৌধুরী।
(চলবে )
বললেন আমার বেডরুমের সাথে যে বারান্দা সেটি খোলা। ওদিকে কাক-পক্ষীও ঢুকে পড়তে পারে। লাশের গন্ধ পেলেই মাছি, কীটপতঙ্গ এসে ভীড় জমাবে। গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বাসার লোকজন গন্ধের সুত্র অনুসন্ধানে নেমে পড়বে। তখনই আমরা ফেঁসে যাব।
ইরফান সাহেব। ডাকলেন শৈবাল চৌধুরী।
জি।
শ্রেয়ার রেখে যাওয়া চিরকুটটাই আপনাকে জিম্মি করে ফেলেছে। তাছাড়া শ্রেয়ার মুটোফোন থেকে আপনার সাথে ওর কথা বলার রেকর্ডও পুলিশ বের করে নিতে পারবে। এই দু’টো জিনিসই আপনাকে আটকে দিয়েছে। নচেৎ আপনি ধোয়া তুলশিপাতা হয়ে মামলার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারতেন।
বাসে রবীন্দ্র সংগীত বন্ধ হয়ে গেছে। গাইড মাইক্রোফোনে কয়েকটি শব্দ করলো। বোঝা গেল কিছু বলবে।
মাইকে ঘোষণা দিল সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই কুমিল্লার অফবিট রেস্টুরেন্টে আমাদের যাত্রা বিরতি হবে। আপনারা বিরতির জন্য তৈরি হয়ে নিন। আপনাদের সাথে থাকা লেপটপ মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন নিজ দায়িত্বে রাখুন। যাত্রা বিরতির সময় কুড়ি মিনিট। ঠিক কুড়ি মিনিট পর আমরা পূনরায় কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাব।
গাইডের ঘোষণা শেষ হতে না হতেই বাস কুমিল্লার অফবিট রেস্টুরেন্টের খোলা মাঠে প্রবেশ করল। যাত্রীরা একে একে সবাই নামছে। আমরাও নামলাম। রেস্টুরেন্টটি বেশ সুন্দর। পরিপাটি। ডুপ্লেক্স। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের যাত্রীদের দোতলায় উঠতে হাত দেখিয়ে নির্দেশ করছে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের একজন।
ইরফান আলী খানকে নিয়ে দোতলায় গেলেন শৈবাল চৌধুরী। কোনার দিকে একটি টেবিল দখল করলেন দু’জনে। একে একে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলেন। ইরফান আলী খানকে রেখে ওয়াশ রুমে যাওয়ার সময় একটু মানসিক হোঁচট খেয়েছিলেন শৈবাল চৌধুরী। হঠাৎ তার মনে হলো এই ফাঁকে যদি ইরফান আলী খান কেটে পড়েন। নিজে বাঁচার জন্য বিদেশ পাড়ি দেন। পরক্ষণে নিজেকে বোধ দিলেন এই বলে ইরফান আলী খানের বাসা-অফিস সব ঠিকানাই শৈবাল চৌধুরীর জানা। বেচারা পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না।
টেবিলে মেনু দেয়া আছে। ওয়েটার এসে দাঁড়িয়েছে। বিফ ভূনা, মুগের ডাল আর গরম পরোটা দিতে বললেন ইরফান আলী খান। ওয়েটার ফিরে গেল। চারদিকে ইতি উতি করে একবার দেখে নিলেন দু’জনে। কোথাও পরিচিত কেউ যদি চোখে পড়ে যায়।
টেবিলে দেয়া পানির ফ্রেশ বোতল নেড়েচেড়ে দেখছে ইরফান আলী খান। শৈবাল চৌধুরীর স্বাভাবিক আচরণ তাকে খুব ভাবিয়ে তুলছে। স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে। বাসার মেঝেতে চাঁদর ঢাকা দিয়ে রেখে লোকটি আমার সাথে পালিয়ে যাচ্ছে। বিফ ভূনা দিয়ে পরোটা খাওয়ার অপেক্ষায়। কতো বছর ধরে সংসার করছে। অথচ স্ত্রীর মৃত্যুতে একটুও কষ্ট হচ্ছে না? এ কেমন মানুষ!
শ্রেয়ার জন্য ইরফান আলী খানের বুকের ভেতর বেশ কষ্ট হচ্ছে। মেয়েটি হঠাৎ কেন আত্মহত্যা করলো? স্বামীর সাথে তার বনিবনা হচ্ছে না। শৈবাল চৌধুরী তাকে বুঝতে চায় না। চাহিদা মতো অনেক কিছুই দিতে চায় না। অফিসের বেতন পেলেই বড় একটি অংশ গ্রামে মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এরকম অনেক অভিযোগ শ্রেয়া তার স্বামী শৈবাল চৌধুরীর বিরুদ্ধে ইরফান আলী খানকে জানিয়েছে। ইরফান আলী খান শ্রেয়াকে শুধু মানিয়ে চলার কথাই বলতেন। এছাড়া তার বলারই বা কী আছে। তারপক্ষে তো শ্রেয়াকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। বিয়ে না করেই যেখানে সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে সেখানে বিয়ে করারই বা দরকার কি।
তারপরও হঠাৎ করে শ্রেয়া আত্মহত্যা করাতে ভেঙ্গে পড়েছেন ইরফান আলী খান। শ্রেয়ার সাথে গত ছ’মাসে কতো মধুর সময় কেটেছে। এরকম সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কাটে না। স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব-কর্তব্য আর দায়বদ্ধতার বাইরে শুধু আবেগ, অভিমান আর ভালোবাসা গড়া ছিল ইরফান আলী খান ও শ্রেয়ার সম্পর্ক।
শ্রেয়ার সাথে ইরফান আলী খানের পরিচয়ের গন্ধটাও বেশ চমকপ্রদ। লাল তেলে ভাজা পরোটা, মুগের ডাল আর গরুর ভুনা মাংস এসে পড়ল। লোভ সামলাতে পারছেন না শৈবাল চৌধুরী। বললেনÑ ইরফান আলী খান সাহেব আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কিছু একটা বলতে চাইছিলেন। আগে গরম পরোটা আর ভুনা মাংস খেয়েনি তারপর যেতে যেতে শোনা যাবে।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। বললেন ইরফান আলী খান। তবে ভয়টা আমার পিছু ছাড়ছে না। আগামীকালের পত্রিকায় যদি আমাদের ছবি বেরোয়। খবরে যদি জানানো হয় শ্রেয়াকে খুন করে আমরা পালিয়েছি। যা হবার হবে। আগে ভাই খান তো।
দু’জনে মজা করে খেলেন। ইরফান আলী খানই বিল পরিশোধ করলেন। তারপর অফবিট রেস্টুরেন্টের বাইরে খুচরো মুদি দোকান থেকে সিগারেট নিলেন শৈবাল চৌধুরী। এখানে ধনিয়ার এক রকম মজার ডেজার্ট পাওয়া যায়। সেটি কিনে নিলেন ইরফান আলী খান। খাবারের পর মুখে পরে ওটা চিবুতে বেশ ভালোই লাগে। শৈবাল চৌধুরী সিগারেট ধরালেন। বাস ছাড়তে কয়েক মিনিট বিলম্ব আছে। সিগারেটে টান দিতে দিতেই শৈবাল চৌধুরী বললেনÑ হঠাৎ করেই আমরা একি বাসের যাত্রী হয়ে গেলাম। কী বলেন ইরফান আলী খান সাহেব।
হু। হঠাৎ করে যে এমন একটা বিপদের সম্মুখীন হবো তা ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি।
জীবনের সুখ ঘটনা আর দুর্ঘটনাগুলো এভাবেই হয়। আগে থেকে বলে কয়ে আসে না।
বাস ছাড়ল। ইরফান আলী খান ধনিয়া মুখে পুরে চিবুচ্ছেন। শৈবাল চৌধুরীও হাত পেতে নিলেন। মুখে চিবুতে লাগলেন। সিগারেটের গন্ধটা উবে গেল।
এবার বলুন। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
কী বলবো।
শ্রেয়ার সাথে আপনার পরিচয়, অপরিণত পরিণয়, প্রেম এবং পরকীয়া। পরকীয়া শব্দটি শুনে শৈবাল চৌধুরীর দিকে চোখ তুলে তাকালেন ইরফান আলী খান। ভ্যাবচেখা খেলেন। কথাটি নির্মম সত্যি বলেই কোন উত্তর দিলেন না। বলা যায় দিতে পারলেন না।
ইরফান আলী খান সাহেব। ডাকলেন শৈবাল চৌধুরী।
আপনি নির্দ্বিধায়, সংকোচহীন সবকিছু খোলামেলা বলতে পারেন। শ্রেয়া তো পরপারে চলে গেছে। ও বেঁচে থাকলে তার সাথে আপনার প্লেটোনিক প্রেম রসায়নের কথা স্বীকারও করতেন না। ওর ডেড বডিটা সটান লম্বা হয়ে আমার বাসার মেঝেতে পড়ে আছে। যখন চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছিলাম তখনও দেখেছি ঠোঁটে লাল লিপস্টিক রক্তের মতো উজ্জ্বল। কপালের ছোট নীল টিপটি খসে পড়েনি। তবে এতোক্ষণে দেহের চামড়া নিশ্চয় সাদা হয়ে গেছে। কানের ভেতর দিয়ে তেলাপোকা ঢুকে তার খাবার রাজ্য উদ্বোধন করেছে কি না কী জানি।
প্লিজ। আর না। শ্রেয়ার দেহ নিয়ে বিভৎস বর্ণনা শুনে বিব্রত হয়েই বললেন ইরফান আলী খান।
শ্রেয়া আপনার স্ত্রী।
ছিল। এখন নেই। আর আপনার প্রেমিকা।
চুপসে গেলেন ইরফান আলী খান। শ্রেয়ার সাথে তার সম্পর্কের কথাটি আর বলতে ইচ্ছে করছে না। শৈবাল চৌধুরীর সে কথাটিÑ ‘শ্রেয়ার ডেড বডি মেঝেতে পড়ে আছে। দেহের চামড়া নিশ্চয় সাদা হয়ে গেছে। কানের ছিদ্র দিয়ে তেলাপোকা ঢুকছে।’ বারবার মনের মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছে। ইরফান আলী খান ভাবছে শ্রেয়ার সাথে তার প্রেম ছিল। মেয়েটি তাকে ভালোবাসত। সেও। শ্রেয়ার ভালোবাসায় ডুবে গিয়েই সে ভালোবাসাবাসিতে মজে গিয়েছিল। গত ছ’মাস যেন কী এক স্বপ্নের মতো কেটে গেল। দিনে কতোবার যে কথা হতো শ্রেয়ার সাথে। কী করছে। খেয়েছে কি না। অন্তবাসের কোন জিনিস প্রয়োজন হলেই ইরফান আলী খানকে বলতো শ্রেয়া। আর ইরফান আলী খান বিদেশ ভ্রমণে গেলেই খুঁজে খুঁজে শ্রেয়ার জন্য শপিং করতো। আর শ্রেয়া বিদেশী যে কোন গিফ্ট পেলেই খুব খুশি হতো। গিফ্ট হাতে নিয়েই ইরফান আলী খানকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেত।
শ্রেয়া কি শৈবাল চৌধুরীর সাথেও একি আচরণ করতো? শৈবাল চৌধুরী তো নিজে থেকেই বললেন তিনি শ্রেয়ার তৃতীয় স্বামী। তাহলে আগের দুই স্বামীর সাথে তার আচরণ কেমন ছিল। আমার সাথে যা করতো তা কী অন্যদের সাথেও করতো? অথবা আমার পরে অন্য কারো সাথেও শ্রেয়ার সম্পর্ক ছিল। যদি সেরকম থেকে থাকে তাহলে তো শ্রেয়ার আত্মহত্যায় তারাও ফেঁসে যাবে।
ইরফান আলী খানের ভাবনার মন্থর গতির সাথে বাস এগিয়ে চলছে। শৈবাল চৌধুরী চোখ বন্ধ করে আছে। মনে হয় ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
ঘুমোচ্ছেন চৌধুরী সাহেব? বললেন ইরফান আলী খান।
ঘুম কি আর আসে! চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করছি। ভানটা যদি সত্যি হয়ে যায়। কিছু বলবেন?
বলছিলাম শ্রেয়ার লিখে যাওয়া চিরকুট আর ওর হাতব্যাগে পাওয়া আমার ভিজিটিং কার্ড পেয়ে আপনি নিশ্চিত হয়েছেন আমি শ্রেয়ার প্রেমিক।
হ্যাঁ। তাই তো। ঐ চিরকুট আর ভিজিটিং কার্ড দিয়েই আমি আপনাকে ধরে ফেললাম। আসলে ধরে ফেলা শব্দটি আপনার জন্য যুতসই হলো কিনা বুঝতে পারছি না। ‘খুঁজে পেলাম’ও বলা যেতে পারতো। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
যা-ই হোক। আমি ভাবছি আমার মতো শ্রেয়ার আরও এক বা একাধিক প্রেমিক নেই তো? বেশ ভাবনার ভঙ্গিমায় বললেন ইরফান আলী খান।
থাকলেও থাকতে পারে। আপনি ছাড়া অন্যকোন নাম-ঠিকানা যেহেতু পাইনি সেহেতু নির্দিষ্ট করে কিছু বুঝা যাচ্ছে না। থাকুক বা না থাকুক তাতে এখন আর আমার কিছু যায় আসে না। কারণ শ্রেয়া আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।
হ্যাঁ। তাই ঠিক।
ইরফান আলী খান সাহেব?
জি!
এবার দয়া করে বলবেন শ্রেয়ার সাথে আপনার সম্পর্কটা কীভাবে হয়েছিল?
বলছি। শুনুন।
নড়েচড়ে পা মেলে বসলেন ইরফান আলী খান। পায়ে জড়ানো পাতলা কম্বলটা ভালোভাবে টেনে নিলেন। জানালার সরানো পর্দা একটু আগিয়ে দিলেন। বাইরের আলোটা কমলো।
লুবনা কে চেনেন? হঠাৎ জানতে চাইলেন ইরফান আলী খান।
লু-ব-না। ইতস্তত চিন্তা করে জবাব দিলেন শৈবাল চৌধুরী। হ্যাঁ, শ্রেয়ার বান্ধবী। দু’একবার আমার বাসায় এসেছিল।
লুবনা ছিল আমার অফিসের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার। শ্রেয়া লুবনার কাছেই যেত। একদিন আমি অফিস থেকে বেরুনোর পথে রিসিপশানে দেখি শ্রেয়া বসা। লুবনা বলল শ্রেয়া আমার সাথে একটু কথা বলতে চায়।
বেশ তো।
আমি কক্ষে ফিরে গেলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে শ্রেয়া দরজায় দু’টি টোকা দিয়ে ঢুকল। চৌধুরী সাহেব!
জি।
একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে শ্রেয়া প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যাওয়ার মতো একটি মেয়ে। যদিও সে আপনার স্ত্রী।
ছিল। এখন আর নেই।
হু।
আমার বিষয়টা আপাতত : থাক। আপনার আর শ্রেয়ার কথা বলুন।
কক্ষে প্রবেশ করে সামনে রাখা চেয়ারে বসল। লুবনা ফিরে গেল। পরিচিত হলাম। এবং প্রথম দিনেই বুঝতে পারলাম শ্রেয়া কিছু একটা করতে চায়। সেটা চাকরি হলেই ভালো হয়। কিন্তু ওর চাকরি করা নিয়ে আপনার আপত্তি আছে। আমি তাকে বুঝিয়ে বলেছিলাম স্বামীর আপত্তি থাকলে চাকরি না করাই শ্রেয়।
শ্রেয়া বলল ঘরে দম আটকে আসে।
আমি বললাম মাঝে মাঝে এসে লুবনার সাথে গল্প করে সময় কাটিয়ে যাবেন। আর ওতেই শ্রেয়া রাজী হয়ে গিয়েছিল। শ্রেয়ার খুব ভালো একটি গুণ প্রথম দিনেই আমার চোখে ধরা পড়ে।
কী? বললেন শৈবাল চৌধুরী।
শ্রেয়া খুব সুন্দর উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গীতে কথা বলতে পারে। ও যখন কথা বলে তখন শুনে থাকতে ইচ্ছে করে। এবং…। থামলেন ইরফান আলী খান।
বাকি কথাটা শেষ করলেন শৈবাল চৌধুরী। এবং কথা শুনেই শ্রেয়ার প্রেমে পড়ে গেলেন। তাই না মি. ইরফান আলী খান?
ইরফান আলী খান কোন জবাব দিলেন না।
আমার বেলায়ও তাই হয়েছিল। শ্রেয়াকে দেখে এবং কথা শুনে যে কেউ প্রেমে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু ইরফান আলী খান সাহেব আপনার কী একবার চিন্তা করা উচিত ছিল না শ্রেয়া অন্য একজন পুরুষের স্ত্রী। অবশ্য একথা বলেও লাভ নেই। প্রেমে পড়লে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। বলুন, তারপর কী হলো।
তারপরের ঘটনা সবটাই তো আপনি জানেন। শ্রেয়ার সাথে আমার মাখামাখি দেখে তার বান্ধবী লুবনা চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। শ্রেয়ার আর একটি ভালো গুণ ছিল। আপনি হয়তো জানেন। বললেন ইরফান আলী খান।
কী?
শ্রেয়া খুব ভালো আবৃত্তি করতে পারতো।
প্রতিরাতে আপনাকে কবিতা শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো, তাই না? পিত্তি জ্বলে যাওয়া রাগ এবং বিরক্তি নিয়ে বললেন শৈবাল চৌধুরী।
ইরফান আলী খান বেশ চমকালেন। নিজেকেই প্রশ্ন করলেন শৈবাল চৌধুরী কিভাবে জানতো যে শ্রেয়া তাকে কবিতা শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো। না কি অন্ধকারে ঢিল ছুড়লো।
আপনি জানতেন? ইরফান আলী খান জিজ্ঞেস করলেন।
হ্যাঁ। কিন্তু কখনোই শ্রেয়াকে বুঝতে দেইনি যে আপনাদের এই গোপন প্রণয়ের বিষয়টা আমি জেনে গেছি। প্রায় প্রতি রাতে এগারটা দশ মিনিটে শ্রেয়ার মুঠোফোন বেজে উঠতো। শ্রেয়া বেশি কিছু বলতো না। হ্যাঁ, হু করেই ফোনটা রেখে দিত। তারপর ফোনের লাইন না কেটেই কবিতা আবৃত্তি শুরু করতো। যখন আমি বিরক্ত হতাম তখন ও বসার ঘরে গিয়ে আপনাকে কবিতা শুনাতো। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত আপনাকে কবিতা শুনাতো। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত আপনারা কথা বলতেন। কবিতা শুনতেন।
শৈবাল চৌধুরীর কথা শুনে ইরফান আলী খানের চেহারায় একজন অপরাধীর ছাপ পড়লো। আর সেটি ঢাকার জন্যই তিনি প্রশ্ন করে বসলেন আপনি কী শ্রেয়াকে বারণ করতেন না?
শ্রেয়াতো আর ছোট্ট খুকি নয় যে তাকে বারণ করে কিছু করা যাবে। আমি জানতাম সবকিছু একদিন পরিষ্কার হয়ে সামনে আসবে। আজ তাই তো হলো। বুঝলেন ইরফান আলী খান সাহেব। ভুলটা আসলে আমার। দুই স্বামী পরিত্যক্তা একজন মহিলাকে আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। আপনি যেমন শ্রেয়ার কণ্ঠ, লম্বা স্লিম দেহের গড়ন দেখে প্রেমে পড়েছিলেন আমিও হয়তো ওসব কারণেই বিয়ের পিড়িতে বসে যাই। আর তার মাসুল গুণতে হচ্ছে এখন। কয়লা ধুলে ময়লা যায় না প্রবাদ বাক্যটি শ্রেয়ার জন্যই মনে হয়েছিল। তাছাড়া আমাদের পুরুষদেরও দোষ কম কিসে। সুযোগ পেলেই মৌমাছির মতো মধুতে মুখ দিতে চাই। যেমন আপনি!
আতে ঘা লাগলেও কিছু বললেন না ইরফান আলী খান। চুপচাপ থাকলেন।
আচ্ছা আপনারা তো বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। ইরফান আলীর চোখে চোখ রেখে বললেন শৈবাল চৌধুরী। দ্বিতীয় বারের মতো হোচট খেলেন ইরফান আলী খান। বিস্ময়ে চোখ চানাবড়া করে সরিয়ে নিলেন ইরফান আলী। কোন জবাব দিলেন না। মনে মনে স্বীকার করলেন হ্যাঁ গত মাসেই তো আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ব্যবসার কাজে আমার দেশের বাইরে প্রোগ্রাম থাকাতে পিছিয়ে গেল। তবে শৈবাল চৌধুরী একথা জানলো কী করে। হয়তো শ্রেয়ার রাতের মুঠোফোনের কথা আড়ি পেতে শুনেছে।
দেখুন ইরফান আলী খান সাহেব, আপনাদের দু’জনের যে বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেটা আমি জানি। কিভাবে জেনেছি সেটা এখন আর জেনে লাভ নেই। তবে আপনাদের বিয়েটা হয়ে গেলেই আমি বেঁচে যেতাম। শ্রেয়া আমার স্ত্রী। ভালোবাসে আপনাকে। শ্রেয়া আমার সাথে নির্জীব পড়ে থাকার চেয়ে আপনার সাথে সজীব থাকাটাই উত্তম হতো। বললেন শৈবাল চৌধুরী।
আপনি হতেন শ্রেয়ার চতুর্থ স্বামী বর। ইসলাম ধর্মমতে একজন পুরুষ স্ত্রী হিসেবে চারজন নারীকে গ্রহণ করতে পারে। যদি তাদের প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা এবং বিচারের সমতা করতে পারে। ওখানে শ্রেয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। সে তিনজন স্বামীকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বা না করেই চতুর্থজনকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে। আমাকে বিচ্ছেদের পত্র পাঠিয়ে দিলে আমি মুক্তির মহানন্দে সেটা মেনে নিতাম।
চৌধুরী সাহেব বাদ দিন না ওসব। শ্রেয়া লাশ হয়ে আপনার বাসার মেঝেতে পড়ে আছে। তার সাথে আমার কী হতে পারতো না পারতো ওসব ভেবে আমাদের মধ্যে তিক্ততা বাড়িয়ে লাভ নেই। বললেন ইরফান আলী খান।
আপনার সাথে আমার সম্পর্কের তিক্ততা বাড়বে না। আমি এখন সময় আর পরিস্থিতির সাথে সমন্বয় করা শিখে গেছি। না হয় আপনার বাসায় গিয়ে দেখা হওয়ার সাথে সাথেই আপনাকে খুন করে ফেলতাম। আমি জানি দোষটা আপনার একার না। শ্রেয়ারও। তাছাড়া শ্রেয়া আপনার কাছে গেলেও রোমান্টিক অর্থ নৈতিক কোনভাবেই খারাপ থাকতো না।
আমরা মনে হয় চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি এসে পড়েছি। বললেন ইরফান আলী খান। রাস্তার দু’পাশে জাহাজ-কাটা যন্ত্রাংশের দোকান দেখলেন। ভাটিযারী, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামেও যাত্রা বিরতি হবে? বললেন ইরফান আলী খান।
হতে পারে। ওদের নিজস্ব বাস কাউন্টার আছে। ওখানে যাত্রী ওঠা-নামা করতে পারে।
কক্সবাজার পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে। প্রায় বার ঘন্টার জার্নি। বললেন ইরফান আলী খান।
ঠিক তাই। জার্নিটা আমার খারপা লাগছে না। দু’জনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছি। আজই আমাদের পরিচয় হলো। একসাথে ভ্রমণও করছি। ব্যাংকের গদ বাঁধা জীবন থেকে হঠাৎ অঘোষিত ছুটি পাওয়া বড় ভাগ্যের ব্যাপার। যদিও পরবর্তী প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আমরা দু’জনই শঙ্কিত এবং ভীত। কাল সকালের সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই বুঝা যাবে শ্রেয়ার আত্মহত্যার ব্যাপারটি মানুষের গোচরে এসেছে কি না। জানাজানি হলেই তো পুলিশ, সাংবাদিক সব একাট্টা হয়ে মাঠে নেমে পড়বে। অযথা টেনশান করে কাজ নেই। চলুন আমরা আমাদের মতো খোশ গল্প না ‘খোশ গল্প’ বলা যাবে না কারণ কথায় কথায় আমাদের মুখোশের আড়ালের চেহারাটাও খুলে যাচ্ছে। তাই গল্প না বলে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতেই যাই।
এক নাগাড়ে বলে থামলেন শৈবাল চৌধুরী। পুনরায় শুরু করলেন শ্রেয়ার দ্বিতীয় স্বামীর সাথে ঘর-সংসার এবং বিচ্ছেদের কাহিনী আপনাকে বলবো বলেছিলাম।
জি। শ্রেয়া কি তার দ্বিতীয় স্বামীর গল্প আপনাকে বলেছিল?
একটি মেয়ে তার বিশ্রী অতীত সম্পর্কে স্বামীকে বলে? এটা আপনি বিশ্বাস করেন?
যেটুকু বলেছিল সেটুকুই আপনাকে বলবো। তাছাড়া আপনিও তো শ্রেয়ার চতুর্থ স্বামীদেব হতে যাচ্ছিলেন। আপনাকে তো আমার সম্পর্কেও অনেক কথা বলেছে।
ইরফান আলী খান কথা বাড়ালেন না।
শ্রেয়ার দ্বিতীয় স্বামীর নাম বাদল রহমান। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে। বায়ান্ন-তেপ্পান্ন হবে। বাসা ছিল মোহাম্মদপুরের শের শাহশুরী রোডে। বাদল সাহেব ব্যবসা করতেন। পরিচয়ের সুত্রটা কীভাবে হয়েছিল তা শ্রেয়া বলেনি। প্রথম স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর নাকি সে খুব হতাশ হয়ে পড়েছিল। ফিরে গিয়ে মা-বাবাকে কিভাবে মুখ দেখাবে সে চিন্তায় বাধ্য হয়ে ফার্মগেটের একটি ছাত্রী হোস্টেলে উঠেছিল। শ্রেয়ার বাবা-মা তাকে ফিরে যেতে বলেছিল। পরিবারের মতে ভালো একটি ছেলে দেখে বিয়েও দেবে বলেছিল। কিন্তু শ্রেয়া আস্থা রাখতে পারেনি। ডিভোর্সী একজন মেয়েকে অবিবাহিত কোন ছেলে বিয়ে করতে চাইবে না। এটাই তার ধারনা ছিল। অর্থ-বিত্তের প্রতি যে শ্রেয়ার বেশ লোভ ছিল সেটাতো আপনি নিজেই বুঝতে পারছেন। না হয় শ্রেয়া আপনার সাথে সম্পর্কই করতো না। বাদল রহমান শ্রেয়াকে বলেছিলেন ঘরে তার স্ত্রী আছে। অসুস্থ। তাই শ্রেয়াকে বিয়েতে বাদল রহমানের স্ত্রী দ্বিমত করবেন না। যেকোনভাবে শ্রেয়ার একটি অবলম্বন দরকার। একদিন সন্ধ্যের পর শ্রেয়া বাদল রহমানের সাথে বাসায় গেলো। বাসায় একাই ছিলেন বাদল রহমানের চল্লিশোর্ধ স্ত্রী সালেহা বেগম। তিন বেডের বড় বাসা। সুন্দর সাজানো-গোছানো বসার ঘর। বাদল রহমান চাবি দিয়েই বাহির থেকে দরজা খুলেছিল। শ্রেয়া বসার ঘরের সোফায় বসলো। বাদল রহমান ভেতর ঘরের দিকে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ঘুম জড়ানো চোখে ঢুলতে ঢুলতে সালেহা বেগম এলেন। বাদল রহমান শুধু আমার নামটা উচ্চারণ করলেন। নাম শুনেই আৎকে উঠলেন সালেহা বেগম। কিছুই বললেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। হয়তো এতোদিন বাদল রহমান তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা মুখেই বলেছেন। সত্যি কার্যে পরিণত করবেন এটা সালেহা বেদম ভাবতেই পারেননি। মাথার কাপড় মুখে টেনে দিয়ে ফিরে গেলেন সালেহা বেগম।
ফিরে যাওয়ার সময় সালেহা বেগমের চেহারার দিকে তাকিয়েছিল শ্রেয়া। বেদনায় নীল হওয়া সেই মুখটির কথা অনেকবার বলেছে শৈবাল চৌধুরীকে। কোন নারীই চায় না তার স্বামী অন্য কোন নারীর বিছানায় যাক। তেমন কোন পুরুষও তার স্ত্রীর ব্যাপারে অন্য কোন পুরুষ মেনে নিতে পারে না।
ইরফান আলী খান তব্দ হয়ে শুনছেন। শ্রেয়া যতবারই সালেহা বেগমের নীল মুখটির কথা বলেছে ততবার তার মনের ভেতর বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের তোলপাড় অনুভব হয়েছে শৈবাল চৌধুরীর। সালেহা বেগমের মুখে কোন ভাষা ছিল না। যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না। তাই স্বামীর এমন অবিচার মেনে নিয়েছিল। তবে সালেহা বেগমকে দেখে তেমন অসুস্থ বলেও মনে হয়নি শ্রেয়ার। বাদল রহমান নাকি সালেহা বেগমের যৌন অক্ষমতার কথাই বলেছিল।
যা হোক। বাদল রহামানের গলায় ঝুলে পড়েছিল শ্রেয়া। সালেহা বেগমের সাথে সাক্ষাতের তিন দিনের মাথায় সন্ধ্যা রাতে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে বেশ কয়েকপদের খাবার প্যাকেটও নিজের তল্পিতল্পাসহ বাদল রহমানের বাসায় উঠেছিল। বিয়ের কর্মটা কাজী অফিসেই সেরেছিল মিষ্টি আর সন্দেশ দিয়ে। যদিও মিষ্টি সন্দেশের কোনটাই শ্রেয়া মুখে তোলেনি।
বাসায় ওটার পর সালেহা বেগম নিয়মমাফিক আপ্যায়ন করেছিল শ্রেয়াকে। ওর আলাদা ঘর দেখিয়ে দিয়েছিল। ঢাকা শহরে কোন বাসায় কে থাকলো, কে আসলো গেল তার খোঁজ কেউ রাখে না। টাকার বিনিময়ে ফ্ল্যাট বাসায় এসে সময় কাটিয়ে যায় এমন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং পেশাদার অনেক মেয়ে ঢাকা শহরে আছে। এই ব্যবসাটাও প্রশাসনের গোচরে-অগোচরে দিন দিন জমজমাট হয়ে উঠছে। তবে এমন রমরমা ব্যবসার একমাত্র পথের কাটা ছুটা কাজের বুয়া। তারা এক বাসার ঘটনা অন্য বাসায় গিয়ে রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করে। কখনও কখনও নিজ থেকে কিছু বিশেষণ যোগ করেও বলতে দ্বিধা করে না।
সালেহা বেগমের বাসায়ও প্রতিদিন সকাল আটটায় ছুটা বুয়া আসে। সম্মান বাঁচানোর জন্যই সালেহা বেগম শ্রেয়াকে নিজের খালাতো বোন বলে বুয়াকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এবং শ্রেয়া চাকরির সুবাদে ঢাকায় এসে উঠেছে এবং এখানেই তাকে থাকতে হচ্ছে। স্বামী বাদল রহমান দয়া পরবশ হইয়া তার বোনকে বাসায় থাকতে দিয়েছেন। জীবনের প্রয়োজনেই মানুষকে অদ্ভুত মিথ্যে বলতে হয়। সত্যের ভান করতে হয়। শত কষ্টে, অভাবে থেকেও সুখের অভিনয় করতে হয়।
দিন যায়। বাদল রহমান উভয় স্ত্রীর উপর পরম সন্তুষ্টির সহিত সংসার ধর্ম পালন করছে। সংসারের প্রতি যে উদাসীনতা ছিল সেটি আর নেই। সকালে এক টেবিলে তিনজন এক সাথে নাশ্তা করছে। রাতে শ্রেয়ার সাথেই শোয় বাদল রহমান। রাত যত গবীর হয় সালেহা বেগমের বুকটা ভারী হয়ে আসে। বুকের ভেতরের তোলপাড় দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করে। নীরব কান্নায় বালিশ ভিজে। ঘুম আসে না। বিছানায় কোন বালিশ বুকে জড়িয়ে হু হু শ্বাস বেড়োয়। ছিটকিনি লাগানো দরজার ভেতর সালেহা বেগম তার আত্মার সাথে কথা বলে। সালেহা জানতে চায়Ñ এই কী ছিল নিয়তি? আত্মার প্রতিউত্তর পাওয়া যায় না। সতীনের সাথেই কি বাকি জীবন এক ছাদের নিচে কাটাতে হবে? নাকি সালেহা বেগম নিজে থেকেই এ ঘর ছেড়ে চলে যাবে? প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন মাথায় এসে ভীড় করে। সালেহা বেগম আত্মার কাছে কোন উত্তর পায় না। নেপথ্যে সালেহা বেগমের আত্মা হাসে। হঠাৎ একটি সমজদার জবাব আত্মার মুখ ফস্কে বেরিয়ে পড়েÑ সবুরে মেওয়া ফলে। সেই মেওয়ার অপেক্ষায় রাতভর নির্ঘুম পায়চারী করে সালেহা বেগম।
গভীর রাতে পাশের ঘরের স্নানঘর থেকে জল ঢালার শব্দ কানে আসে। পায়চারী থামিয়ে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে সালেহা বেগম। আর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঘুমোতে যায় শ্রেয়া ও বাদল রহমান।
একদিন শ্রেয়াকে প্রশ্নটি করেই বসে সালেহা চেগম। তুমি কেন বাবার বয়সী একজন লোককে বিয়ে করলে?
অনভিপ্রেত প্রশ্নে হোঁচট খায় শ্রেয়া।
তুমি কি জানো নারী হয়ে অন্য একজন নারীর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছ?
শ্রেয়া কোন জবাব দেয়নি।
এই বিয়েতে কি তোমার বাবা-মার মত ছিল?
না।
তাহলে?
আসলে আমার একটা অবলম্বন খুব প্রয়োজন ছিল। ভালোবেসে মা-বাবার অমতেই একজনকে বিয়ে করেছিলাম। সেটা টিকেনি। তারপর ওদের কাছে ফিরে যেতেও মন চায়নি। তাছাড়া তিনি বলেছেন আপনি অসুস্থ। আর ওনার দ্বিতীয় বিয়েতে আপনারও কোন অমত নেই।
তোমার কী মনে হয় আমি অসুস্থ?
জি না। তবে তিনি আপনার যে অসুস্থতার কথা বলেছেন সেটাতো আর বাইরে থেকে দেখার সুযোগ নেই।
জিভে কামড় খেলেন সালেহা বেগম। বললেন শ্রেয়া তুমি জেনে রাখো আমি অসুস্থ নই। আর কোন স্ত্রীই তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে মত দেয় না। আমি অমত করিনি বলে এই নয় যে মত দিয়েছি। ধরে নিতে পারো বাধ্য হয়েছি। না হয় আমার অস্থিত্বই যে টিকে না। এ সমাজের পুরুষদের তুমি কোনভাবে চিনতে পারবে না। অনেকেই বাদল রহমানের মতো দিনের বেলা সাধু আর রাত হলে নেমে পড়ে মহাযজ্ঞে। রাগের মাথায় পুরুষ জাতকে একচোট নিয়ে ক্ষান্ত হলেন সালেহা বেগম।
শোন শ্রেয়া আমি তোমাদের পাকা ধানে মই দেব না। তবে তোমার ভুলের মাশুল তোমাকে একদিন দিতেই হবে। আর একটি কথা আমি আশা করবো এসব তোমার স্বামী জনাবকে বলবে না। সবকিছুই স্বাভাবিক চলবে।
শ্রেয়া কথা বাড়ালো না। তবে সালেহা বেগমের কথায় তার নিজেকে অপরাধী মনে হলো। একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীর বাড়া ভাতে ছাই দেয়া প্রকৃতি কোনভাবেই সয় না। একথা মনে হতেই শ্রেয়ার মনটা চুপসে গেল। বাদল রহমানের প্রতিও তার ঘৃণার রেখা জন্ম নিল। কিন্তু শ্রেয়া এমন একটি ফাঁদে আটকা পড়ল যেখান থেকে খুব সহজে বেরিয়ে যাওয়ারও কোন পথ খোলা রইল না।
বিপত্তিটা ঘটলো যখন রানী তার চার বছরের বাচ্চা নিয়ে ঘরে এলো। কলিংবেলের শব্দ শুনে শ্রেয়া গিয়েছিল দরজা খুলতে। বাচ্চাসহ রানীকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। রানীর আর কতোই বা বয়েস। শ্রেয়ার মতোই হবে।
কাকে চাই? বলল শ্রেয়া।
কাকে চাই মানে? তুমি কে?
আমি…। পরিচয় দিতে গিয়ে থামে শ্রেয়া।
বাথরুম থেকে পড়ি কি মরি ছুটে আসে সালেহা বেগম। রানীকে দেখেই খুশিতে আটখানা।
রানী মা মনি আয়। আমার দিয়া নানুমনি এসেছে, বাহ্।
বলতে বলতেই সালেহা বেগম রানীর কোল থেকে চার বছরের দিয়াকে কোলে তুলে নেয়। আদর করে। চুমু খায়। শ্রেয়া কোন কথা বলে না। ওদের পিছু পিছু বসার ঘরে ঢোকে।
সোফায় না বসতেই, গায়ের জামা-কাপড় না ছাড়তেই রানী শ্রেয়াকে ইঙ্গিত করে বলে- মা, ওকে?
সালেহা বেগম শ্রেয়ার দিকে তাকায়। শ্রেয়ার বুঝতে বাকি থাকে না রানী সালেহা বেগমের মেয়ে। আর দিয়া তার নাতনি। দারুন অস্বস্তি নিয়ে শ্রেয়া তার ঘরে গিয়ে দরজার কপাট লাগায়। বালিশে মুখ বুজে কান্না করে। শ্রেয়ার মনে হাজারো প্রশ্ন উঁকি দেয়। বাদল রহমান কখনো বলেনি তার শ্রেয়ার সমবয়সী একটি মেয়ে আছে। মেয়ের ঘরে নাতনি আছে। মেয়ের আলাদা সংসার আছে। মনে প্রচন্ড চোট পেয়ে ভেঙ্গে পড়ে শ্রেয়া। দরজার কপাট খুলে বেরিয়ে আসে না।
ইতোমধ্যে সালেহা বেগমের কাছে শ্রেয়ার পুরো ঘটনা জেনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে রানী। বাবা বাদল রহমানের প্রতি চরম ঘৃণায় একদলা থুথু ছিটায়। মায়ের কাছে বেড়াতে এলে যে ঘরে রানী থাকে সে ঘরটি দখল করে নিয়েছে শ্রেয়া। কোনভাবেই সমবয়সী একজন মেয়েকে মায়ের আসনে বসাতে পারে না রানী। বাদল রহমান অফিস থেকে ফেরার আগেই দিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। সালেহা বেগম আটকায়। রানী নিজেকে বোঝাতে পারে না সে তার স্বামীকে কী জবাব দিবে। ছোট্ট দিয়াকে কী বলে পরিচয় করিয়ে দেবে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়। শ্রেয়া তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসেনি। দুপুরের খাওয়া হয়নি। ক্ষিদেয় পেটে মোচড় দিয়ে উঠেছে ক’বার। ঘরে থাকা বিস্কুট দিয়ে জল খেয়েছে। ওতে কী আর ভাতের ক্ষিদে মেটে।
বাদল রহমান যখন বাসায় ফেরে তখন রাত আটটা। কলিংবেল বাজতেই সালেহা বেগম গিয়ে দরজার ছিটকিনি খোলে। সালেহা বেগমকে দেখে কিছুটা বিস্মিত হয় বাদল রহমান। কারণ শ্রেয়া এ বাড়িতে আসার পর বাদল রহমান অফিস থেকে ফিরলে দরজাটা শ্রেয়াই খুলেছে। হাতের ব্যাগ, বাজার-সদাই নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।
কোন কথা না বলেই ভেতরে ঢোকে বাদল রহমান। বুঝতে পারে বাসায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
শ্রেয়া কোথায়? নীরবতা ভাঙ্গে বাদল রহমান।
ওর ঘরেই আছে।
ঘুমোচ্ছে?
জানি না।
ঝগড়া-ঝাটি কিছু হয়েছে?
না।
কথা না বাড়িয়ে শ্রেয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ায় বাদল রহমান। তখনি সালেহা বেগমের ঘর থেকে নানুভাই নানুভাই বলে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসে দিয়া। বাদল রহমান কোলে তুলে নেয়। আর মুহূর্তেই তার বোঝা হয়ে যায় বাসায় কী ঘটেছে। দিয়াকে কোলে নিয়ে বসার ঘরে এসে আদর করে। মনের ভেতর তোলপাড় চলে বাদল রহমানের। শ্রেয়াকে কী জবাব দেবে। কিভাবে বশে আনবে শ্রেয়া আর রানীকে।
ওদিকে বাদল রহমানের উপস্থিতি টের পেয়েও ঘরের দরজা খোলে না শ্রেয়া। বাবা-মার অমতে বিয়ে করেছিল পঞ্চাশোর্ধ বাদল রহমানকে। এখন সে বাবা-মাকে কী জবাব দেবে। কী করে বলবে তার স্বামীরও শ্রেয়ার সমবয়সী একটি মেয়ে আছে। নাতনি আছে। আত্মীয়-স্বজন আছে। পাড়া-পড়শি আছে। সমাজ আছে। ভাবতে ভাবতে শূন্যতায় ভরে ওঠে শ্রেয়ার মন। সিদ্ধান্তহীনতায় আটকে থাকেনি। ব্যাগ গুছিয়ে সে রাতেই কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে গিয়ে ওঠে। শ্রেয়া তার দ্বিতীয় স্বামী বাদল রহমানের ঘর ছেড়ে পূনরায় বোহেমিয়ান জীবনে ফিরে যায়।
শ্রেয়ার দ্বিতীয় ঘর-সংসারের গল্প শুনতে শুনতে ইরফান আলী খান বিকল হয়ে পড়ে। টের পায়