
সোহেল মোহাম্মদ ফখরুদ-দীন
বাংলার বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ ও আধুনিক চেতনার ইতিহাসে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এক অনন্য ও উজ্জ্বল নাম। তিনি শুধু একজন শিক্ষাবিদ নন, ছিলেন এক যুগমন্থনকারী
চিন্তানায়ক, যাঁর গভীর পান্ডিত্য, নীরব সাধনা এবং অনিঃশেষ জ্ঞানতৃষ্ণা কয়েক প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। বাঙালি মুসলমানের জাগরণের ধারায় তাঁর অবদান: উনিশ শতকের শুরুতে বাঙালি হিন্দু সমাজে যেমন রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বিহারীলাল ও রবীন্দ্রনাথের মতো ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে নবজাগরণ সুস্পষ্টভাবে ঘটেছিল, বাঙালি মুসলমানের জাগরণ ততটা দ্রুত ঘটেনি। সেই জাগরণের বীজ বপন করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল মনসুর আহমদ, সাংবাদিক ও সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের রচনা, সমালোচনা ও বৌদ্ধিক তৎপরতা মুসলিম সমাজে নতুন চেতনার সঞ্চার করে।
এরও আগে গদ্যে মীর মশাররফ হোসেন, কাব্যে কায়কোবাদ, আর সামাজিক অন্ধকার দূরীকরণে মুনশী মেহেরুল্লাহ ও ইসমাইল হোসেন সিরাজী,মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই ধারারই উত্তরাধিকার হিসেবে, অধিক পরিণত, অধিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আবির্ভূত হন জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক-যাঁর চিন্তা, মানবিকতা ও সমাজদর্শন বাঙালি মুসলমানের জাগরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জন্ম, শিক্ষা ও বৌদ্ধিক বিকাশ: ১৯১৪ সালে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া আব্দুর রাজ্জাকের মেধা শৈশব থেকেই প্রকাশ পায়। ঢাকার মুসলিম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ থেকে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৩১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৩৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে কিংবদন্তি চিন্তাবিদ হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লাস্কির আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর থিসিস মূল্যায়নের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তিনি ডিগ্রি না নিয়েই দেশে ফিরে আসেন-জ্ঞানই তাঁর কাছে ছিল ধ্যান, ডিগ্রি নয়।
শিক্ষকতা ও চিন্তার পরিসর: ঢাকায় ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ গঠিত হলে সেখানে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। তিনি পাঠদানের সীমা অতিক্রম করে হয়ে উঠেছিলেন ‘বৌদ্ধিক পরিমন্ডলের কেন্দ্রবিন্দু’। রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শনÑসব বিষয়ে তাঁর ছিল বিস্ময়কর দখল। দেশ-বিদেশের চিন্তাবিদদের ওপর তাঁর পাঠ ও বোধ এতটাই গভীর ছিল যে তিনি একাই যেন একটি জীবন্ত গ্রন্থাগার। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু বুদ্ধিজীবী, প্রশাসক ও রাজনৈতিক নেতা তাঁর কাছে ছুটে যেতেন পরামর্শ ও বৌদ্ধিক স্পষ্টতা অর্জনের জন্য। তাঁরা তাঁকে ডাকতেন ‘শিক্ষকের শিক্ষক’- Teacher of the Teachers|।
রচনা কম, প্রভাব গভীর: অল্প কিছু প্রবন্ধ বাদে তিনি খুব কমই লিখেছেন। কিন্তু তাঁর ভাবনা, আলাপচারিতা, এবং ব্যক্তিত্বের অনুপ্রেরণা অসংখ্য ছাত্র-গবেষক-চিন্তকের চিন্তার ভিত গড়ে দিয়েছে। তাঁর মেধার আলো ধরে রাখার প্রয়াসেই আমাদের চট্টলগৌরব, চন্দনাইশের কৃতিসন্তান, কবি আহমদ ছফা রচনা করেন ‘যদ্যপি আমার গুরু’-যা আজও বাংলাদেশের বৌদ্ধিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
সরদার ফজলুল করিম তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতার ভিত্তিতে লেখেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা’-যা রাজ্জাকের চিন্তাজগত ও সমাজদর্শনের দরজা খুলে দেয় গবেষকদের সামনে।
জাতীয় অধ্যাপক ও সম্মাননা: জ্ঞানচর্চায় অনন্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৫ সালে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ উপাধিতে ভূষিত করে-যা ছিল তাঁর বৌদ্ধিক মহিমার স্বীকৃতি।
দেহান্ত ও স্মরণ: ১৯৯৯ সালের ২৯ নভেম্বর এই জ্ঞানতাপস প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তাধারা, শিক্ষাদর্শন ও বৌদ্ধিক সাহস আজও আমাদের পথ দেখায়।
২০২৫ সালের এই দিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি: ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর এই স্মরণগম্ভীর দিনে দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ (ইতিহাসের পাঠশালা) এবং চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (ঈঐজঈ) তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। তিনি আমাদের বৌদ্ধিক ইতিহাসের আলোকবর্তিকা- একজন ক্লান্তিহীন চিন্তাক, জ্ঞানতাপস, আর মুক্তবুদ্ধির আজীবন সাধক।
লেখক: পরিচালক ও সম্পাদক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ ( ইতিহাসের পাঠশালা )










