মোহাম্মদ ইউসুফ
আপনজনের মৃত্যুতে হৃদয়ে তৈরি হয় বিশাল এক গভীর শূন্যতা। এটি জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। প্রতিটি মৃত্যুই এক অপূরণীয় ক্ষতি, কোনোকিছু দিয়ে কখনোই এই ক্ষতিপূরণ হয় না। আসলে জীবন ক্ষণিকের খেলা, মৃত্যুই তার চ‚ড়ান্ত নিস্তব্ধতা। চোখের সামনে আপনজনের প্রয়াণ স্বব্ধ করে দেয় নিজেকে। কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। মৃত্যু আমাদের শেখায়- ভালোবাসা কখনো মরে না, শুধু বদলায়। মৃত্যুতে বুকের ভেতরে এতটা শূন্যতা অনুভব হয় যে, তা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রিয় মানুষের হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় কিন্তু সেই স্মৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তবে মৃত্যুই একমাত্র চিরন্তন সত্য, যা আমাদের প্রতিটি সম্পর্ককে মূল্য দিতে শেখায়। মৃত্যু হয়তো জীবনের সমাপ্তি ঘটায় কিন্তু সম্পর্কের নয়। যারা আমাদের ছেড়ে চলে যায়, স্মৃতির মাঝে তাঁরা অনন্তকাল বেঁচে থাকে। ভালোবাসা মৃত্যুর চেয়ে অনেক শক্তিশালী, তাই আপনজনেরা কখনো হারায় না। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের শিখিয়ে দেয় জীবন কতটা মূল্যবান এবং সময় কতোটা সীমিত। সব মৃত্যুই মানুষকে নাড়া দেয় তবে কিছু মানুষের মৃত্যু হৃদয়কে ভীষণভাবে ধাক্কা দেয়। একইভাবে আমাকে মানসিকভাবে মর্মাহত করেছে রাজপথের অগ্রজ সতীর্থ সামসুভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ। এতো তাড়াতাড়ি তিনি আমাদের ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে যাবেন, তা কল্পনাও করিনি।
১৩ নভেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ। সকালে ঘুম থেকে ওঠে এক হোয়াটস্অ্যাপ মেসেজ দেখে আমি হতবাক। মেসেজটি পাঠিয়েছেন সামসুভাইয়ের এক ছোটভাই ইস্পাহানি টি লিমিটেডের হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা মো. দিদারুল আলম। মেসেজটি হচ্ছে, ‘দেশের সাবেক প্রধান বিস্ফোরক কর্মকর্তা শামসুল আলম (৬৫) আজ (১৩ নভেম্বর) ভোর সাড়ে ৬টায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি-রাজেউন)।’ মৃত্যুকালে তিনি তিনভাই, দু’বোন, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বাদআছর সীতাকুন্ড পৌরসভার নিজতালুক জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে পাহাড়ের পাদদেশের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। সমাজের সর্বস্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর জানাজায় শরিক হয়।
সামসুভাইয়ের সাথে রয়েছে আমার দীর্ঘ চার দশকের অনেক স্মৃতি- যা সংক্ষেপে লিখে শেষ করা যাবে না। রাজধানীর সেগুনবাগিচার বিস্ফোরক অদিপ্তরের সদর দপ্তর,সীতাকুন্ড কলেজ রোডের স্টুডিও এভারেস্টসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর সাথে বসে সেই ম্যারাথন আড্ডা, ছাত্র-রাজনীতির নানান ঘটনাপ্রবাহ আজও মানসপটে ভেসে ওঠে। নীতি-আদর্শ ও চিন্তা-চেতনায় মিল ছিল বলে সেই আড্ডা সহজে শেষ হতো না। সাবেক ছাত্রনেতা চিরকুমার শামসুভাই একজন প্রথাবিরোধী মানুষ ছিলেন। অত্যন্ত সহজ-সরল, অমায়িক, সজ্জন, মিষ্টভাষী, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রচারবিমুখ এ মানুষটি পরোপকারী ছিলেন; ছিলেন দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে নীরবে সাহায্য- সহযোগিতা করতেন। বর্ণালী, ভ্রাতৃসংঘ, মেঘমল্লার খেলাঘর আসরসহ এলাকার বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনায় তাঁর উল্লেখযোগ্য আর্থিক আনুক‚ল্য থাকতো। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মতো জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের সর্বোচ্চ পদে চাকরি করার পরও তাঁর মধ্যে কোনো অহংবোধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন বন্ধুবৎসল মানুষ। আগাগোড়াই ছিলেন পরিপূর্ণ একজন ভদ্রলোক। পরিশেষে বলতে চাই, হার মেনে নেয়ার নাম মৃত্যু আর লড়াই করে বেঁচে থাকার নাম জীবন। মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়, মৃত্যু জীবনের একটি অংশ। মৃত্যু যদি না থাকতো তাহলে জীবনের মূল্য বোঝা যেতো না। মৃত্যুভয় যিনি জয় করেছেন, তিনি সত্যিকারের মুক্ত মানুষ। জন্ম-মৃত্যু যেনো একই বৃক্ষের দুই শাখা। একটিতে কুঁড়ি ফোটে, অন্যটিতে পাতা ঝরে। মৃত্যুতে থেমে যায় জীবনের সব রঙিন আয়োজন। সামসুভাইকে অভিবাদন জানাই। যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন এবং শান্তিতে ঘুমোন- সেই কামনা করছি।
লেখক : প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটপার বাণী ও চাটগাঁরবাণীডটকম










