প্রকৃতি বাঁচাতে বৃক্ষরোপণ ও অন্যান্য

6

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওটা নতুন কথা নয়। এই আমাদের নীল গ্রহের তাপমাত্রা হ্রাসের জন্য নানা কলা কৌশল আলোচিত হচ্ছে। বিশ্বের সচেতন মানব সমাজ উষ্ণতা বৃদ্ধি ও তাপদাহ থেকে বাঁচার তাগিদে প্রকৃতি বাঁচাও আন্দোলনে সোচ্চার। এ আন্দোলনের ঢেউয়ের মাত্রা উন্নত ও অনুন্নত দেশে এক নয়। বিশেষ করে অনুন্নত দেশও ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের আর্তি ভিন্ন মাত্রার। বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের অন্যতম একটি। যদিও জাতিসংঘ বিশ্ববাসীর উদ্বেগ কমাতে বেশ কটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন করেছে। বলা চলে এই সম্মেলনগুলো সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে ফলপ্রসু অবদান রাখতে সক্ষম হয় নি। এর প্রধান কারণ বিশ্ব মোড়ল দেশগুলোর আন্তরিকতার অভাব। তারপরও এ কথা সত্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বের মানব সমাজ এখন যথেষ্ট সচেতন। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই সচেতনতার কারণে পরিবেশবাদীদের প্রধান দাবি হচ্ছে জীবাস্ম জ্বালানি হ্রাস করা। পাশাপাশি তারা বনবনানী ও জলাশয় রক্ষার দাবিতেও সোচ্চার। বাংলাদেশেও প্রকৃতি বাঁচাও আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচি সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালিত হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে প্রকৃতি কতটুকু বাঁচবে তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তার কারণ হচ্ছে বন/প্রকৃতি, পাহাড় ও জলাশয় খেকোদের দৌরাত্ব্য ও দুর্বৃত্তায়ন দিন দিন বেড়েই চলেছে। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা না থাকায় তাকে দমন করা কঠিন। বলা যায়, দেশে এ টু জেড সকলেই এখন দুর্নীতির জোয়ারে ভাসছে। এরাই আবার দলবদ্ধভাবে দেশের কষ্টার্জিত অর্থ বিদেশে পাচারে তৎপর। প্রকৃতি বাঁচাও আন্দোলনের নামে এরা প্রতি বছর কোটি কোটি বৃক্ষরোপণের নামে পুকুর চুরি করছেন। স›দ্বীপের এক প্রয়াত সংসদ সদস্য উপকূল রক্ষার নামে লক্ষ লক্ষ বৃক্ষরোপণের অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন। মূলত তিনি বৃক্ষরোপণ না করে উপকূলীয় অঞ্চলে বাঁশের কঞ্চি রোপণ করেন। তদন্তে গেলে তিনি জানান জোয়ারের পানিতে লক্ষ লক্ষ চারা গাছ মারা যায়। বাঁশের কঞ্চি তার প্রমাণ। এভাবে প্রভাবশালীরা ছয় কে নয় করে দেশের সম্পদ লুট করে চলছে।
বৃক্ষ রোপনের সমস্যা সম্পর্কে কেউ অবগত নয়। প্রতিবছর দেশের লক্ষ লক্ষ বৃক্ষ রোপণ হয়ে থাকে। এই পক্রিয়া চলছে দীর্ঘ দুই দশক। সৃজিত গাছগুলো এতো দিনে মাথা চারা দিয়ে ওঠার কথা। বাস্তবে তাদের কয়টি বেঁচে আছে তা শুমার করা প্রয়োজন। বৃক্ষরোপণ করার আগে ভাবতে হবে কোথায় লাগানো হবে। অর্থাৎ জমি নির্বাচন প্রাথমিক কাজ। জমি নির্বাচনের পর আসে সেখানে কোন কোন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ যুক্তিসঙ্গত। অতঃপর আসবে তার নিরাপত্তা ও পরিচর্যা। একটি বৃক্ষরোপণের পর তা বেড়ে উঠার জন্য আমরা কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছি তার হিসাব নিকাশ করার সময় এসে গেছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করা হয়ে থাকে তার পঁচিশ শতাংশ বাঁচে কি না সন্দেহ আছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বনায়ন আছে মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ মাত্র। আমরা উন্নয়নের নামে পাহাড় বনবনানী ও জলাশয় ধ্বংস করছি। আমি উন্নয়নের বিরোধিতা করি না। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আমাদের শিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং অবকাঠামো গত উন্নয়ন জরুরি। তবে আমরা কোন দূরদর্শী পরিকল্পনা করি না। আজ থেকে শত বছর পর কী হতে পারে তা আমরা ভাবি না। মানব জীবন সুন্দর ও পরিবেশবান্ধব হওয়ার জন্য বাস্তুতন্ত্রের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাস্তুতন্ত্রে জীববৈচিত্র্যের অবাধ প্রসার ও জীবনাচরণ মানব জাতির জন্য কল্যাণকর। একথা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।
অতএব আমাদের এই পৃথিবী বিশেষ করে আমাদের মাতৃভূমিকে বাসযোগ্য করার জন্য আমাদের কঠোর পরিকল্পনা ও বাস্তবতার সাথে উন্নয়ন করতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তাকে সততার সাথে বাস্তবায়ন করতে না পারলে ব্যর্থতার দায় আমাদেরই বহন করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতার ভাগ বহন করতে হবে। তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আমাদের নিতে হবে।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব)